নারী ভোটার কম কেন বুঝতে পারছে না ইসি

ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে ব্যাপক হারে কমেছে নারী ভোটার। সর্বশেষ ১৮ আগষ্ট পর্যন্ত ৪৩৮ উপজেলায় পুরুষের চেয়ে প্রায় ৪ লাখ কম নারী ভোটার নিবন্ধিত হয়েছে। তবে পুরুষের চেয়ে নারী ভোটার অস্বাভাবিকহারে কম হওয়ার কারণ খুঁজে পাচ্ছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নারী-পুরুষের ভোটারের পার্থক্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে কমিশন। মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দেয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করছেন খোদ নির্বাচন কমিশনাররা। চলমান ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে দেখা গেছে, ভোটার হতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না নারীরা। কিছু কিছু উপজেলায় যে হারে পুরুষ ভোটার হয়েছেন, সেখানে নারী ভোটার প্রায় অর্ধেক। মাঠ পর্যায় থেকে সচেতনতার অভাব, পর্দা প্রথা ও বিয়ে না হওয়ার ভীতি নারীদের ভোটার না হওয়ার কারণ হিসাবে চিহ্নিত করলেও তা মানতে নারাজ কমিশন। স্বয়ং ইসির সংশ্লিষ্টরাই বলছেন, নারী ভোটার কমে যাওয়ার এই হার কোনভাবেই ২০০৮ সালের ছবিসহ ভোটার তালিকা, ২০১০ ও ২০১২ সালের হালনাগাদ এবং জনসংখ্যার হিসাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নারী ভোটার কম হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে বের করার জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে ইসি। ভোটার তালিকা হালনাগাদের তথ্য অনুযায়ী, ৪৩৮টি উপজেলায় এ পর্যন্ত ২৬ লাখ ৯১ হাজার ৬৮৮ জন ভোটারের নিবন্ধন করা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৫ লাখ ৩৮ হাজার ৮০১ জন এবং নারী ভোটার ১১ লাখ ৫২ হাজার ৮৮৭ জন। অর্থাত্ পুরুষের চেয়ে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৯১৪ জন নারী ভোটার কম নিবন্ধিত হয়েছে। অথচ দেশের বিদ্যমান ৯ কোটি ১৯ লাখ ৫০ হাজার ৬৪১ জন ভোটারের মধ্যে নারী ও পুরুষের ব্যবধান মাত্র দুই লাখ ৮৫ হাজার। ভোটার তালিকা অনুযায়ী পুরুষ ভোটার আছে ৪ কোটি ৬১ লাখ ১৮ হাজার ২২০ জন এবং নারী ভোটার ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৩২ হাজার ৪২১ জন। বিদ্যমান জনসংখ্যা অনুযায়ী নারী-পুরুষের সংখ্যাও সমানে সমান। সেখানে মাত্র ২৬ লাখ নতুন ভোটারের মধ্যে নারী-পুরুষের এই অস্বাভাবিক ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ভোটারে নারী-পুরুষের অস্বাভাবিক ব্যবধান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। তবে কেন নারী-পুরুষ ভোটারের ক্ষেত্রে এতো ব্যবধান হচ্ছে, তারও সঠিক তথ্য সরবরাহ করতে পারেনি ইসি সচিবালয়। বারবার মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তাগাদা দেয়ার পরও পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। বরং দিন দিন নারী-পুরুষ ভোটারের ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে। প্রতিনিয়ত ভোটার তালিকা হালনাগাদ সমন্বয় কমিটি নারী-পুরুষের ব্যবধান স্বাভাবিক রাখার জন্য নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তারা বলছেন, ভোটার হালনাগাদে পুরুষের চেয়ে নারীদের আগ্রহ বরাবরই কম। সামাজিক কারণে অবিবাহিত যাদের বয়স ১৮ পার হয়েছে তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ ভোটার হননি। কারণে হিসাবে কর্মকর্তারা বলছেন, ভোটারযোগ্য হওয়ার পরও তাড়াতাড়ি বিয়ের পিঁড়িতে বসতে রাজি নন অনেকে। এ কারণে কোন নারী ভোটার হচ্ছেন না। ভোটার হলে তার বয়স বেশি প্রকাশ পাবে-আশংকা আছে নারীদের মধ্যে। আবার ধর্মীয় কারণে অনেকেরই ছবি তোলার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ রয়েছে। এসব যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন নির্বাচন কমিশন। তারা বলছেন, এই কারণ হলেও এর আগে কিভাবে নারীরা ভোটার হয়েছেন। পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নারীরা ভোটার হন। তখনতো ওই সমস্যা ছিল না। কমিশন সচিবালয়-সংশ্লিষ্টদের ধারণা, কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও মূলত তথ্য সংগ্রহকারীদের গাফিলতির কারণেই ভোটার তালিকা থেকে নারী ভোটারদের অনেকেই বাদ পড়েছেন। নারী ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করা হলেও ছবি তুলতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। নারীদের ভোটার করার জন্য আলাদা কোন উদ্যোগও নেয়া হয়নি। অন্যদিকে হালনাগাদ সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, প্রচার-প্রচারণার অভাবেই নারীরা ভোটার হওয়ার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাচ্ছে না। এলাকাভিত্তিক মাইকিং এর জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকলেও অনেক স্থানে মাইকিং করা হয়নি। সিইসি নারী ভোটার কম হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনার জন্য ইসি সচিবালয় সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। নতুন ভোটার হওয়ার যোগ্য ও বাদ পড়াসহ সকলেই যাতে হালনাগাদে ভোটার হতে পারেন তা নিশ্চিত করার জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পুনরায় নির্দেশ দেন সিইসি। ২০১৫ সালের ০১ জানুয়ারি যাদের বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি তাদেরকে ভোটার করার লক্ষ্য নিয়ে গত ১৫ মে থেকে ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ শুরু হয়। সারাদেশে বিদ্যমান ভোটারের ৫ শতাংশ বৃদ্ধি ধরে ৪৬ লাখ নতুন ভোটার বৃদ্ধির পরিকল্পনা করে ইসি। মোট তিন ধাপে ৫১৪টি উপজেলা/থানায় হালনাগাদ কার্যক্রম চলার কথা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ১৮১টি উপজেলায় ১৩ লাখ ১ হাজার ৬২০ জন ভোটারের নিবন্ধিত হয়েছে। নিবন্ধন সম্পন্ন ১৩ লাখ ভোটারের মধ্যে পুরুষের চেয়ে দুই লাখ নারী ভোটার কম ছিল। এই ধাপে ১৮১ উপজেলায় ১৩ লাখ ১ হাজার ৬২০ ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৭৪৮ ও নারী ভোটার ছিল ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৮৭২ জন। এরপর নারী-পুরুষ ভোটারের এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিশন। দ্বিতীয় ধাপ থেকে পরিস্থিতি উন্নতির তাগিদ দেয়া হয়। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপেও পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের এ পর্যন্ত ৪৩৮টি উপজেলায় এখন পুরুষের চেয়ে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৯১৪ জন নারী ভোটার কম নিবন্ধিত হয়েছে। এছাড়াও আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে তৃতীয় ধাপে ভোটার হালনাগাদ কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত রয়েছে। এর আগেই ২১ থেকে ৩০ আগষ্ট পর্যন্ত ঢাকা সিটি সংলগ্ন ১৬টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা শুরু হচ্ছে। নারীদের ভোটার করার ব্যাপারে বিশেষ কোন পরিকল্পনা গ্রহণ না করলেও শেষ ধাপেও নারী-পুরুষ ভোটারের ব্যবধান বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।