সুনির্মল বসু

ছোটদের প্রিয় লেখক

বাংলা সাহিত্যের শিশুতোষ শাখাটিতে যারা অজস্র ফুল ফুটিয়েছেন, তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুকুমার রায়, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, সুনির্মল বসু ও শিবরাম চক্রবর্তীর নাম বিশেষভাবে ন্মরণীয়। এঁদের মধ্যে সুনির্মল বসুই সারাজীবন ছোটদের জন্য লিখেছেন। তাঁর রচিত— ‘আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাইরে, কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাইরে। পাহাড় শিখার তাহার সমান হই যেন ভাই মৌন-মহান খোলা মাঠের উপদেশে দিলখোলা হই তাইরে। কিংবা হবুচন্দ্র রাজা বলেন গবু চন্দ্রকে ডেকে ‘আইন জারি করে দিও রাজ্যেতে আজ থেকে, মোর রাজ্যের ভিতর— হোক না ধনী, হোক না গরীব ভদ্র কিংবা ইতর কাঁদতে কেহ পারবে নাক যতই মরুক শোকে হাসবে আমার যতেক প্রজা, হাসবে যত লোকে শাস্ত্রী-সেপাই, প্যায়দা-পাইক, ঘুরবে ছদ্মবেশে, কাঁদলে কেহ, আনবে বেঁধে, শাস্তি হবে শেষে। কবিতা দুটি আমাদের সকলের কাছে সুপরিচিত। এ রকম অনেক কবিতাই তিনি লিখেছেন। ছোটদের জন্য রচিত তাঁর বইগুলো পড়লে এর হদিস মেলবে। সুনির্মল বসু অনেক লিখেছেন। শিশুতোষ সাহিত্য নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেছেন। মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে শিশু-সাহিত্য চর্চা করেছেন। তাঁর সাহিত্য কোথাও ফাঁকি ছিলো না। তাঁর অনেক ছড়া-কবিতা শিশু-কিশোরদের মুখস্ত। শিশু-কিশোরদের পত্রিকা ‘মৌচাক’ তাঁর সম্পর্কে লিখেছে: সুনির্মল বসু ছোটদের কাব্য সাহিত্যে এক বিশেষ আসনের অধিকারী। কাব্য এবং গল্প উপন্যাস ব্যতীত শিশুনাট্য রচনাতেও তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁর সমসাময়িক তিনজন প্রখ্যাত শিশু-সাহিত্যিক খগেন্দ্রনাথ মিত্র, ধীরেন্দ্রনাথ ধর ও বিশু মুখোপাধ্যায় তাঁর লেখার অকুণ্ঠ প্রশংসা করতেন। রাজশেখর বসু, স্বপনবুড়ো (অখিল নিয়োগী), হেমেন্দ্র কুমার রায়, মৌমাছি— (বিমল ঘোষ), ক্ষিতিন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য, নরেন দেব, শিবরাম চক্রবর্তী, গজেন্দ্র মিত্র, প্রবোধ সান্যাল, শৈল চক্রবর্তী, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, তুষারকান্তি ঘোষ প্রমুখের সংগে ছিলো তাঁর সুসম্পর্ক। সুনির্মল বসু বেশি লিখেছেন ছোটদের ছড়া-কবিতা। ছড়া-কবিতা ছাড়া কাহিনী, রূপকথা, ভ্রমণকাহিনী ও কৌতুকনাট্যও রচনা করেছেন। তবে সংখ্যায় তা কম। তাঁর ছড়া-কবিতার বিশেষ-আশয় বিচিত্র। শিশুদের কল্পনা, স্বপ্ন, হাসি-ঠাট্টা, বিদ্রূপ, স্বদেশ প্রেম, প্রকৃতি, ঋতু, ফুল-পাখি ও নদীর নানা বর্ণনা নিটোল ছবি এঁকেছেন। বাংলার বিপ্লবী অমর সন্তানদের নিয়ে রচিত কবিতাগুলো আজো স্মরণীয়। এসব অমর সন্তানদের তালিকায় রয়েছেন শহীদ তিতুমীর, ক্ষুদিরাম রসু, মহারাজ নন্দকুমার, প্রফুল্ল চাকী, যতীন মুখোপাধ্যায়, সত্যেন বসু, সূর্য সেন, ক্ষীতিশ ওয়াদ্দেদার, দীনেশ মজুমদার, যতীন দাস, বিনয় বসু, কনক লতা প্রমুখ। সুনির্মল বসুর শৈশব-কৈশোর নানা ঘটনায় উজ্জ্বল। বিহারের গিরিডির পাহাড়ি গাছপালা, শাল-মহুয়ার বন, উশ্রী নদীর ভরাকূল ও প্রকৃতির গড়া মমতায় মুখর হয়ে উঠেছিলো সুনির্মলের কিশোর হূদয়। এ সময় তিনি ‘আশা’ নামে হাতে লেখা পত্রিকা বের করেন। পত্রিকাটিতে নিজে লিখতেন ও ছবি আঁকতেন। এ সময় তিনি যোগীন্দ্র নাথ সরকার, উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, সীতা দেবী ও শান্তা দেবীর লেখা পড়ে লেখালেখিতে উত্সাহ পান। গিরিডির ব্রাহ্মসমাজে একবার এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই কৈশোরেই সুনির্মল বসু প্রথম বিশ্ব কবিকে প্রথম দেখেন। ১৩২০ বঙ্গাব্দে তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য বছর। এ বছর সন্দেশ পত্রিকার ধাঁধার উত্তরদাতা হিসেবে প্রথম নাম ছাপা হয়। ম্যাট্রিক পাস করে তিনি গিরিডি থেকে কলকাতায় চলে আসেন। এ সময় থেকেই তাঁর লেখা ছাপা হতে শুরু করে। সুনির্মল বসু ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে জুলাই বিহারের গিরিডির মঞ্চত্পুরে মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের বিক্রমপুরের মালাখান নগর গ্রামে। তার বাবা পশুপতি ঠাকুর মালাখান নগরেই থাকতেন। অসুস্থ হয়ে গিরিডিতে চলে যান। এখানেই শিক্ষকতা করতেন। সুনির্মল বসু কলকাতা এসে সেন্টাল কলেজে ভর্তি হন। কিছুদিন পর গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে কলেজ ত্যাগ করেন। কিছুদিন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত আর্ট কলেজে পড়াশোনা করেন। তাঁর ছোটদের জন্য রচিত বইগুলো হলো: ছানাবড়া, বেড়ে মজা, হৈচৈ, হুলুস্থুল, কথা শেখা, পাততাড়ি, মরণের ডাক, ছন্দের টুং টাং, আনন্দ লুডু, শহুরে মামা, কিপটে ঠাকুর্দা, বীর শিকারী, কবিতা শেখা, ছন্দের গোপন কথা, আমার স্বপ্ন, পাহাড়ে-জঙ্গলে, জীবন খাতার কয়েকপাতা ইত্যাদি। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই: হাওয়ার দোলা। প্রথম লেখা শুরু করেছিলেন— ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ছদ্মনাম ঈশ্বরচন্দ্র শর্মার অনুকরণে ‘সুনির্মল শর্মা’ ছদ্মনামে। তিনি ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে ভুবনেশ্বরী পদক লাভ করেন এবং ১৯৭৫ সালে তাঁকে প্রথম বিদ্যাসাগর পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে ফেব্রুয়ারি শিশুদের প্রিয় লেখক সুনির্মল বসু লোকান্তরিত হন।