সুখ, সুখ আর সুখের স্মৃতি

ক্যারিবিয়ান সমুদ্রের মাতাল হাওয়া, উচ্ছসিত তরঙ্গ, নয়ন জুড়ানো সবুজ আর দিগন্ত ঢেকে রাখা পাহাড়ের সারি। সারা পৃথিবীর পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকে ক্যারিবিয় অঞ্চল। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা এই ক্যারিবিয় বেসিনের এই ডাকটা একটু বেশিই শুনতে পান। সেটা শুধু এই পাগল করে দেয়া প্রকৃতির ডাক নয়; ডাকটা ক্রিকেটীয় সাফল্যেরও বটে। আজ থেকে সেই ক্যারিবিয় ডাকে সাড়া দিয়ে আরো একবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে লম্বা সিরিজ শুরু করবে বাংলাদেশ দল। শেষ ফলাফল কী হবে, সেটা মাঠের খেলায় ঠিক হবে। তবে বল যতক্ষণ মাঠে না গড়াচ্ছে, ততক্ষণ অন্তত সুখস্মৃতির কারণে বলটা বাংলাদেশের কোর্টে। ওয়েস্ট ইন্ডিজে তিনটি সফর এবং দলটির বিপক্ষে নিজের মাটিতে সর্বশেষ সিরিজ বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অফুরান অনুপ্রেরণা অন্তত জোগাতে পারবে। বিদেশে এমনিতেই বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ সফর খুব কম হয়। তার মধ্যে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকায় যে দু’-চারটা সফর হয়েছে; সেগুলোর দু’-একটা ব্যক্তিগত নৈপুণ্য বাদ দিলে ভুলেই যেতে চাইবেন ক্রিকেটাররা। এই জায়গাতেই বাংলাদেশের জন্য উজ্জ্বল এক ব্যতিক্রম হল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। মজার ব্যাপার হল, সেই ২০০৪ সালে, বাংলাদেশ যখন টেস্ট ক্রিকেটে হাঁটি হাঁটি পা পা করছিল, তখন থেকেই শুরু হয়েছে এই দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সখ্য। তখনকার ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটিকে সেই ক্লাইভ লয়েডের দলের ছায়াও বলা যায় না; তবে বাংলাদেশের তুলনায় তারা দৈত্য বিশেষই বটে। ব্রায়ান লারা, শিবনারায়ণ চন্দরপল, ক্রিস গেইল, রামনরেশ সারওয়ানদের ভয়ানক ব্যাটিং লাইনআপ। টিনো বেস্ট, পেড্রো কলিন্স, জার্মেইন লসন, ফিদেল এডওয়ার্ডস; চার পেসারের ত্রাস বোলিং। বাংলাদেশ দল তখন এই হস্তিতুল্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে পিপীলিকার চেয়েও ক্ষুদ্র বুঝি। সেই সময় পর্যন্ত ২৮টি টেস্ট খেলে বাংলাদেশের ‘অর্জন’ ছিল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুটি বৃষ্টি বিঘ্নিত টেস্ট ড্র! কিন্তু সেই বাংলাদেশই রুখে দাঁড়িয়েছিল। সেই বাংলাদেশই ক্যারিবিয় হাতিকে পাগল বানিয়ে ফেললো সেন্ট লুসিয়া টেস্টে। মোহাম্মদ রফিক ও খালেদ মাসুদের অবিশ্বাস্য দুই সেঞ্চুরি, আশরাফুল-রাজিনদের বুক চেতানো ব্যাটিং এবং ‘মিস্টার ফিফটি’ অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের সেঞ্চুরিতে প্রবল প্রতাপশালী সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কার্যত নিজেদের ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ড্র করে ফেললো বাংলাদেশ! এই গৌরবকে বাংলাদেশ ছাপিয়ে গেল ২০০৭ সালে। একেবারে সামগ্রিক হিসাব করলেও বলা যায় ২০০৭ বিশ্বকাপের চেয়ে সুখের সময় বাংলাদেশের ক্রিকেটে কমই এসেছে। সেটা ছিল বাংলাদেশের সেরা বিশ্বকাপ। প্রথম রাউন্ডে ভারতকে বলে-কয়ে হারালো বাংলাদেশ। সেই এক ম্যাচের স্মৃতিই তো বাংলাদেশের জন্য ইতিহাসের মতো বড়। মাশরাফির সেই নাটকীয় পারফরম্যান্স, মুশফিক-তামিম-সাকিবের উত্থান, তিন বাঁহাতি স্পিনারের দৌরাত্ম্য, ভারতের বিদায়, রাতারাতি বাংলাদেশের ‘বড় দল’ হয়ে যাওয়া; কোন্টা রেখে কোন্টার কথা বলবেন! সেই বিশ্বকাপেই এরপর আরো মহাকাব্যিক অর্জন— তখনকার এক নম্বর দল দক্ষিণ আফ্রিকা বধ। সেই ম্যাচের পর বড় বড় সংবাদ মাধ্যম পরিষ্কার লিখে দিয়েছিল— বাংলাদেশ এখন থেকে আর ‘মিনোস’ নয়। যদিও সে সময়ের অনুমান ও বাংলাদেশকে নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে যে উচ্ছ্বাস, তা বাংলাদেশ নানা কারণেই ধরে রাখতে পারেনি। বরং এর পরপরই আইসিএল ধাক্কাসহ নানাভাবে বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ফেলেছিল। এরপর বাংলাদেশ যে আবার পথে ফিরে এলো, সেটারও এক বড় সাক্ষী এই ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সেটা ২০০৯ সালের ঘটনা। নতুন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার নেতৃত্বে বাংলাদেশ গিয়েছিল ক্যারিবিয় সফরে। কিন্তু প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় দিনেই বাংলাদেশকে হতচকিত করে দিয়ে আবার ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়লেন মাশরাফি; দায়িত্ব নিলেন তরুণ সাকিব। শুরু হল আরেক যুগ। সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ খর্বশক্তির ছিল বটে। কিন্তু তাদের টানা তিন ওয়ানডে ও দুই টেস্টের সবগুলো ম্যাচে উড়িয়ে দেয়ার চিন্তা করাটা একটু কঠিন ছিল। ব্যাটে-বলে সামনে থেকে এই উড়িয়ে দেয়ায় নেতৃত্ব দিলেন সাকিব। সঙ্গে আশরাফুল, মাহমুদউল্লাহ, তামিম, রাজ্জাক, এনামুলদের দুরন্ত পারফরম্যান্স বাংলাদেশকে এনে দিলো আরো একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এই সাফল্যটা যে ‘ফ্লুক’ ছিল না, তার প্রমাণও বাংলাদেশ দিয়েছে। ঘরের মাটিতে সর্বশেষ সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নিয়ে ওয়ানডেতে সে ফ ছেলেখেলা করে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ মানেই যে, বাংলাদেশের ইতিহাস, সেটা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন সাকিবরা। এবার সাকিব নেই, বাকিদের দায় এই ইতিহাসের মশালটা বয়ে নিয়ে যাওয়া।