প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতি বাড়বে

বাংলাদেশ অর্থনীতির আকার প্রতিবছর ৬ শতাংশের বেশি বাড়ছে। এর ফলে দারিদ্র্যের হার নেমে আসার আশা করা যায়। তবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে উত্পাদনের বড় একটা অংশ ক্ষতি হওয়ায় দারিদ্র্য দূর করতে সময় বেশি লাগবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) ২ শতাংশে পৌঁছাবে। কোন উদ্যোগ নেয়া না হলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ অর্থাত্ ২১০০ সালে এ ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে জিডিপির ৯ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সামষ্টিক উদ্যোগ নেয়া হলে ২১০০ সালের মধ্যে এ ক্ষতির পরিমাণ ২ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব হলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল মঙ্গলবার দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবেলায় ব্যয় নিরূপণ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। এতে সভাপতিত্ব করেন এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর কাজুহিকো হিগুচি। অন্যান্যের মাঝে বক্তব্য রাখেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব সফিকুর রহমান পাটোয়ারী, এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট বিন্দু এম লোহানী, এডিবির জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মাহফুজ আহমেদ। প্রকাশনা অনুষ্ঠান শেষে সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে এডিবি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট বিন্দু লোহানী বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে জ্বালানির চাহিদা দ্বিগুণে পৌঁছাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে। বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধিতে দক্ষিণ এশিয়ার সবদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর প্রভাবে বাংলাদেশের ধানের ফলন ২০৮০ সালের মধ্যে ২৩ শতাংশ কমে যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লে দক্ষিণ এশিয়ার সাড়ে ৯ কোটি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর বাইরে আর ১০ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বন্যা জলোচ্ছ্বাসে। জ্বালানি ও পানির চরম সঙ্কট দেখা দিতে পারে। সমুদ্র পৃষ্ঠের এক মিটার বৃদ্ধি পেলে খুলনা ও ঢাকার ১৪ শতাংশ তালিয়ে যেতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এসময় মাহফুজ আহমেদ বলেন, জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলা করা বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রতিবছর ৬ শতাংশের বেশি বাড়ছে। ফলে দারিদ্র্যের হার নেমে আসার আশা করা যায়। তবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে উত্পাদনের বড় একটা অংশ ক্ষতি হওয়ায় দারিদ্র্য দূর করতে সময় বেশি লাগবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাব এবং তা মোকাবেলায় কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে তা বিশ্বসম্প্রদায়ের নেয়া পদক্ষেপের উপর নির্ভর করে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে এ খাতে ৭ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হবে। অর্থাত্ ২১০০ সালে মধ্যে প্রতিবছর দেশগুলোকে জিডিপি’র শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ হারে অর্থ ব্যয় করতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ বাবদ। অন্যদিকে বিশ্বের সবগুলো দেশ যদি তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার দুই শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে তবে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ জিডিপি’র ১ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে থাকবে। আর ২১০০ সালের মধ্যে তা সার্বোচ্চ আড়াই শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার ৬টি দেশ বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলংকা নাম উল্লেখ করে বলা হয়, বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল পর্যন্ত সময়ে এ দেশগুলো গড়ে জিডিপিতে ১ দশমিক ৮ শতাংশ হারে ক্ষতি হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা না করা হলে ২১০০ সাল নাগাদ জিডিপিতে এই ক্ষতির পরিমাণ ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৪ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে,, জলবায়ু পরিবর্তনে মালদ্বীপ ও নেপাল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। চলতি শতাব্দী শেষে দেশ দুটির অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১২ দশমিক ৬ শতাংশ ও ৯ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। এই ক্ষতি বাংলাদেশের ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, ভারতের ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, ভুটানের ৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শ্রীলংকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে।