মীমাংসিত বিষয় নিয়ে সরকার বিতর্ক সৃষ্টি করছে
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৮
সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এম আমীর- উল ইসলাম বলেছেন, বিচারকদের অভিশংসনের বিষয়টি একটি মীমাংসিত বিষয়। এখন সরকার সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে একটি অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, পঞ্চম সংশোধনীর মামলায় এই ইস্যুটির নিষ্পত্তি হয়েছে। তখন সব মত ও পথের আইনজীবীরা ঐক্যমতের ভিত্তিতে অভিমত দিয়েছিলেন বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে না রেখে সুপ্রিম কোর্টের হাতে রাখা উচিত। গতকাল মঙ্গলবার ইত্তেফাককে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় দেশের এই প্রবীণ আইনজীবী একথাগুলো বলেন।
ব্যারিস্টার আমীর বলেন, বর্তমানে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদটি এমনভাবে রয়েছে যে কোনো বিচারকের অদক্ষতা বা অসদাচরণের বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপিত হলে নির্বাহী বিভাগের যে কেউ সেটি রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করতে পারেন। তখন রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে এ বিষয়ে তদন্ত করতে বলতে পারেন। কাউন্সিল তদন্ত করে অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা পেলে তখন রাষ্ট্রপতি ওই বিচারককে অপসারণ করবেন। তখন এটি রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে গেলো না। আইনজীবী মহলে যারা আছেন তারা সকলেই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পক্ষে। যারা সংবিধান ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করেন, তারা মনে করেন রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এই বিষয়টিকে বিবেচনা করা উচিত। যখন সরকারকে নানাভাবে বিতর্কিত ও বিব্রত এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে তখন বিচারকদের অপসারণের এই ধরনের একটি বিল আনা বড্ড অপ্রয়োজনীয় বলে আমি মনে করি। এই বিষয়ে সরকারকে কে উপদেশ দিয়েছে জানি না, তবে এটি সরকারের জন্য একটি অযথা বিতর্ক তৈরি করবে। তাই বিতর্ক না বাড়িয়ে সরকার এই বিলের ব্যাপারে আর অগ্রসর না হলে সেটি সব মহলে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।
ব্যারিস্টার এম আমীর বলেন, সংসদের হাতে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা দেয়া হলে তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে কি-না সেটি নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠবে। আমাদের সংবিধানে ক্ষমতার পৃথকীকরণের কথা বলা হয়েছে, তার ব্যত্যয় ঘটছে কি-না? অতএব আমাদের সংবিধানে তিনটি বিভাগের মধ্যে যে ভারসাম্য রয়েছে তার কোথাও বিচ্যুতি ঘটলে সব জায়গাতেই বিচ্যুতি দেখা দেবে।
তিনি বলেন, আমরা যখন সংবিধান প্রণয়ন করেছিলাম তখন বিচারকদের অপসারণের ভার সংসদের হাতে দিয়েছিলাম। তখন বিচারকদের অভিশংসন নিয়ে এত চিন্তা করা হয়নি। আমরা ভেবেছি এমনভাবে বিচারক নিয়োগ করা হবে যে অভিশংসনের প্রয়োজনই হবে না। যেমন ভারতবর্ষে কখনো বিচারকদের অভিশংসন করা হয়নি। আমাদের দেশেও হয়নি। তিনি বলেন, সংবিধান প্রণয়নের সময় আমরা প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকাই, সেখানে দেখতে পাই এই ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়া রয়েছে। তখন আমরা আমাদের সংবিধানে এটি অন্তর্ভুক্ত করি। তখন আমরা এটাও ভেবেছি যে কখনো এটি ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু এখন ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে এ কারণে যে অযোগ্য ও অদক্ষ লোকদের এখানে ঢোকানোর চেষ্টা হয়েছে এবং এ ব্যাপারে বার ও বিচারকদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে বিচারক নিয়োগের বিষয়ে একটি আইন করার কথা বলা হয়েছে। সেই আইনটি যদি করা হয় এবং সেখানে যোগ্যতার মাপকাঠি উল্লেখ করে দেয়া হয় তাহলে যোগ্য ও দক্ষ বিচারক নিয়োগ করা যাবে। কিন্তু এখন আইন মন্ত্রণালয় থেকে একটি তালিকা পাঠিয়ে দেয়া হয়, ওই তালিকায় স্থান পেতে নানা দেন-দরবার কাজ করে। এই তালিকা আবার প্রধান বিচারপতির কাছে আসে। আগের যুগে প্রধান বিচারপতি এবং বারের নেতৃবৃন্দ ও সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করা হত কাউকে বিচারক নিয়োগ দেয়ার পূর্বে। আর এখন সেই আলোচনা করাই হয় না। এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, তদবির করে বিচারক হচ্ছেন। এতে আমাদের বিচার বিভাগের মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক বিতর্ক রয়েছে। সরকারকে অনুরোধ করছি অযথা কেন বিতর্ক বাড়াচ্ছেন।
এ বিষয়ে আইন কমিশনের সুপারিশ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার এম আমীর বলেন, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হলেই তো এককভাবে এই বিচারকদের অপসারণের বিষয়ে সুপারিশ করার কথা নয়। এই সুপারিশ করার পূর্বে যে কনভেনশন বা চর্চা রয়েছে তা হলো এই বিষয়ের সঙ্গে যারা জড়িত আছেন (প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি/প্রধান বিচারপতি/বারের সিনিয়র আইনজীবী) তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া। আইন কমিশন মানে এই নয় যে, তারা এককভাবে সুপারিশ করবেন, বিশেষ করে সাংবিধানিক বিষয়ে। যদি তা করেন তাহলে তো তারা অ্যাডভাইজার টু পার্লামেন্ট হয়ে গেলেন। তাই কোনো কিছুর ব্যাপারে সুপারিশ করার পূর্বে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান কনভেনশনগুলোর দিকে একটু নজর দেবেন। তিনি বলেন, বিচারক অপসারণের বিষয়টি নিয়ে দায়িত্বহীনভাবে যারা সরকার বিরোধী দলে তারা একটি রাজনৈতিক ইস্যু সৃষ্টি করতে পারেন বলে আমার আশংকা রয়েছে। তাই আমি মনে করি, যারা বুঝে বা না বুঝে সরকারকে এই ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন তা কখনোই শুভ ফল বয়ে আনতে পারে না।