ভেজাল প্যারাসিটামল মামলা নিষ্পত্তিতে ১১ বছরই অপব্যয়

ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে ৭৬ শিশুর মৃত্যুর মামলার বিচার-নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণ অনুসন্ধান করেছে আইন কমিশন। কমিশনের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, মামলা দায়েরের পর তা নিষ্পত্তি হতে ২১ বছর লেগেছে। এই ২১ বছরের মধ্যে ১৯ বছর ২ মাস অহেতুক অপব্যয় গেছে বলে আইন কমিশন মনে করে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাইকোর্ট বিভাগ রুল ইস্যুর মাধ্যমে বিচারিক আদালতের নথি তলব করার কারণে ১৪ বছর ৩ মাস, ফৌজদারি রিভিশন নিষ্পত্তির পর নথি বিচারিক আদালতের সেরেস্তা সহকারী বিচারকের সামনে উপস্থাপন না করে আলমারিতে রেখে দেয়ার কারণে ১ বছর ১১ মাস, প্রসিকিউশন কর্তৃক সাক্ষী হাজির না করায় ২ বছর ১ মাস, আসামি পক্ষে সময় প্রার্থনা করে যুক্তিতর্ক মুলতবি করায় ১১ মাস সময় ব্যয় হয়েছে। কমিশন মনে করে অহেতুক কালক্ষেপণ না হলে দুই বা আড়াই বত্সরের মধ্যে অর্থাত্ ১৯৯৫ সনের মধ্যে মামলাটির রায় তথা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে পারত। কিন্তু আমাদের দেশের সার্বিক বিচার ব্যবস্থা বিশেষ করে হাইকোর্ট বিভাগে বিচার ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতার কারণে এদেশের ভিকটিম বা তাদের আত্মীয়-স্বজন দেড় যুগ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। মামলার বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হতে যে পরিমাণ সময় এ পর্যন্ত লেগেছে তাতে এই মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে আরও কত বছর লাগতে পারে তা অনিশ্চিত। এটা নগ্ন সত্য এই বিচার ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশের মালিক জনগণের নিকট লজ্জায় মুখ লুকানো ছাড়া আমাদের আর গত্যন্তর নেই। এ ধরনের অসহনীয় বিচারিক পরিস্থিতির পরিবর্তন দেশ ও জাতির স্বার্থে একান্ত প্রয়োজন। যদিও এ ধরনের সংস্কার তাত্ক্ষণিকভাবে করা সম্ভব নয়, কিন্তু এখনই এর সূচনা করা আবশ্যক। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা নিরসনে কিছু সুপারিশও করেছে আইন কমিশন। হাইকোর্টে কোন মামলার রুল ও স্থগিতাদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করার সুপারিশ করা হয়। রুল জারি করা হলেও সর্বোচ্চ ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি না হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ হবার বিধান করা যেতে পারে বলে মনে করে কমিশন। অহেতুক রুল জারি নিরুত্সাহিত করতে প্রধান বিচারপতিকে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৪ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে, বিচারপতিগণের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মামলার সংখ্যা হ্রাসের পরিবর্তে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিটির মাধ্যমে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের বিচারপতি পদে নিয়োগ দেয়া দরকার। আইনজীবী হিসাবে ২০ বছরের প্রকৃত অভিজ্ঞতা অথবা বিচার বিভাগে অন্তত কুড়ি বছর প্রকৃত বিচারিক দায়িত্ব পালন এবং অন্তত তিন বছর জেলা জজের প্রকৃত দায়িত্ব পালনের বিষয়ে শর্ত আরোপ করে বিচারক নিয়োগ করা প্রয়োজন। এছাড়া বিচারক নিয়োগে ন্যূনতম বয়স ৫০ এবং অবসরের বয়স ৭৫ করার সুপারিশ করেছে কমিশন। এটি করা হলে, এতে অভিজ্ঞ বিচারক দক্ষতার সাথে অধিক সময় বিচারিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন এবং জাতি উপকৃত হবে। এই বিধান কেবল নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে হবে।