স্বপ্ন যার
সেলুলয়েডে
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০১৪, ১৯:৩৪
হিমু আকরাম মানেই ভিন্নধর্মী গল্প অসাধারণ নির্মাণ। এ সময়ের আলোচিত নাট্য নির্মাতাদের মধ্যে হিমু আকরাম অন্যতম। অতি সাধারণ গল্পকে অসাধারণভাবে টিভি পর্দায় উপস্থাপন করেন বলেই হিমুর দর্শকপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। গল্পের ফেরিওয়ালা থেকে নাটকের কারিগর হিমু আকরামের শৈশব-কৈশোর এবং বর্তমান ব্যস্ততা নিয়ে তার সাথে আলাপচারিতায় বসেন অজেয় চৌধুরী
আপনার নিজের সম্পর্কে বলুন?
নিজের সম্পর্কে বলতে গেলে আমি নাটক পাগল মানুষ। নাটকের জন্যই রাত জাগি। ছুটে চলি এখানে ওখানে। আমার কল্পনার চরিত্রগুলো অহর্নিশ ঘুরপাক খায় আমারই আশপাশে। তাদের দীর্ঘ যাত্রা আমারই সাথে। মাঝে মাঝে গভীর ঘোরের ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করি। সেই ঘোরে থাকে না কাছের মানুষ। থাকে না বন্ধু অথবা স্বজন, থাকে কেবল কলম-কাগজ। সেই ঘোরে রাত ভোর হয়। সকালের রোদ এসে টেবিলে পড়লে ঘোর কাটে। আমি আবিষ্কার করি নতুন একটা নাটকের স্ক্রিপ্ট। নতুন একটা স্বপ্ন। নতুন একটা হাসি-কান্নার গল্প।
আপনি কোথায় বড় হয়েছেন?
আমি বড় হয়েছি নোয়াখালীতে। শৈশবের পুরো সময়টাই কেটেছে ছোট শহর, প্রিয় শহর মাইজদীতে। সরকারি আবাসিক এলাকার ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো, মাঠে ফুটবল খেলা আর বিশাল দিঘিতে সাঁতার কাটার স্মৃতি আমার পুরো শৈশব জুড়ে ছড়িয়ে আছে। ছড়িয়ে আছে অভিরামপুরের কথা, আমার গ্রামের কথা। সেখানে পাখির বাসা খুঁজতেই কেটে যেত সারাদিন। সেখানে সন্ধ্যা নামলেই ব্যাঙ আর ঝিঝির ডাকে ভরে উঠত উঠান, বারান্দা অথবা ঘর। সেখানেই আমার বেড়ে উঠা।
আপনার নাট্যজীবনের শুরুর দিকটা জানতে চাই।
আমার শুরুটা লেখালেখি দিয়ে। প্রথম প্রকাশিত গল্পের নাম ‘অপেক্ষা’। ছাপা হয়েছিল ১৫ বছর আগে সাপ্তাহিক যায় যায় দিনে। ‘অপেক্ষা’ থেকেই শুরু হয় গল্পকার হিমু আকরামের অন্য এক জগত্। তারপর দীর্ঘ সময়। একে একে প্রকাশিত হতে থাকে দহন, জলেতে জলতরঙ্গ, শেষ বিকেলে আমি, কেউ কেউ একা, যেও না, ল্যামপোস্টের নিচে, একলা দুপুর, চৈতালি মেঘ, সেদিন আসেনি কেউ, ঘুণপোকার মতো অসংখ্য গল্প। দেশের প্রতিটি জাতীয় পত্রিকার সাহিত্য পাতায় হিমু আকরাম তখন পরিচিত নাম। ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত আমার দুটা বই-ই পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিল তখন। বই দুটির নাম—সে রাতে বৃষ্টি ছিল এবং কিছু জল কিছু শূন্যতা ঘিরে। অতীত ইতিহাসে আমি একজন লেখক, একজন স্বপ্নচারী!
কখন এবং কীভাবে আপনি পরিচালক হয়ে উঠেন?
পরিচালক হিসেবে আমার বাতিঘর ছিল ‘বাসন্তী রঙা শাড়ি’। আমার লেখা প্রথম নাটক এটি। নির্মাণ করেছিলেন এটিএন বাংলার নিজস্ব প্রযোজক। তারপর নির্মাতা বেলাল আহমেদ নির্মাণ করেন উপকূল এক্সপ্রেস। আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প এটি। নিজের লেখা বেশ কিছু নাটক অন্য নির্মাতারা নির্মাণ করার পর আমিও পরিচালক হওয়ার স্বপ্ন দেখি। গল্পের চরিত্রগুলোকে ক্যামেরাবন্দি করার জন্য সেই থেকেই আমার নতুন স্বপ্ন দেখা শুরু হয়। সে স্বপ্নের নাম—নাট্য পরিচালক!
এই ক্ষেত্রে আপনি কি কোনো প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন?
নাটক পরিচালনার আগে আমি বাংলাদেশ ‘ফিল্ম আর্কাইভ’ এবং ‘জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট’ থেকে চমত্কার দুটো কোর্স সম্পন্ন করি। তারপর নাম লেখাই নির্মাতা ফেরদৌস হাসান রানার এডি হিসেবে। মাত্র এগার মাস তার এডি হিসেবে কাজ করার পর আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে তখন সিঙ্গেল এবং ধারাবাহিক মিলিয়ে ২০০’র বেশি নাটক। অবশেষে ছুটে যাই সমুদ্রের কাছে। নির্মাণ করি নিজের লেখা স্বপ্নের এক নাটক ‘সাগর ডাকিছে তারে’। আমার প্রথম স্বপ্ন, প্রথম ভালোবাসা, প্রথম নির্মাণের নাম ‘সাগর ডাকিছে তারে’।
একজন পরিচালকের কাছ থেকে দর্শক কী আশা করতে পারে?
নির্মাতার কাছে প্রত্যাশা বলতে আমি বুঝি একটা গল্পকে ক্যামেরাবন্দি করে লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই গল্পটি হতে হবে ভালো। শুধু হাসি-কান্না দিয়েই একটি নাটক শেষ হতে পারে না। একজন নির্মাতা তখনই সফলতা পায় যখন নির্মাণ আর গল্প ভাবনার উপর তার আধিপত্য থাকে। সহজ কথায় নাটক বা চলচ্চিত্র পরিচালক তার নিজস্ব ভাবনা থেকে নির্মাণ করলেও দিন শেষে এটা আর তার থাকে না। এটা হয়ে যায় দর্শকের। তাই পরিচালকের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। দর্শকদের না ঠকিয়ে সুন্দর গল্পের অসাধারণ নির্মাণই একজন পরিচালকের টিকে থাকার ম্যাজিক!
আপনার পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজস্বতা কী?
আমি কমেডি নাটক বেশি নির্মাণ করি। আমার নাটকে অতি নাটকীয়তা বা কঠিন সংলাপ কখনোই থাকে না। যার ফলে সব শ্রেণীর মানুষই আমার নাটক বুঝতে পারে, হাসতে পারে। নির্মাণ শৈলীর উত্তরে বলা যায় এমন কিছু লোকেশন আমি নাটকে দেখাই যার কারণে হয়তো দর্শক টিভি চ্যানেলের সামনে বসে। আমার নাটকে চরিত্রগুলোর পাশাপাশি হেটে বেড়ায় আঁকাবাঁকা নদী, মেঠোপথের ধারে তালগাছের সারি, রাস্তায় পাশের চা দোকান, বটতলার হাট। আরও দেখাই পুরান ঢাকার অলিগলি, বাঁদরের লাপঝাঁপ, রিকশা পেইন্টারের মাচা ঘর। দর্শকদের ধরে রাখতে মজার গল্পের পাশাপাশি অদ্ভুত সব লোকেশন ব্যবহার করাই নির্মাতা হিসেবে আমার স্টাইল!
আমাদের মিডিয়া শিল্পে নাটক নির্মাণের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলুন।
নাটক নির্মাণের বর্তমান অবস্থা অবশ্যই ভালো। ভালো বলেই প্রযোজকরা ইনভেস্ট করছে। পরিচালকরা নির্মাণ করছে। আমাদের নতুন-পুরাতন অসংখ্য নির্মাতা আছেন যাদের নাটকের জন্য দর্শক অনেক আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন। আমাদের নাটকে রসবোধ এতটাই প্রবল থাকে যে, বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণা বেশি থাকার পরও দর্শক নাটক দেখে। অনেক শিক্ষিত ছেলেমেয়ে এখন নাটক নির্মাণে আগ্রহী হয়ে আসছেন। তারা ক্যামেরা, লাইট, অ্যাক্টিং, এডিটিং, স্ক্রিপ্টিং—বুঝেই কাজ করতে আসছেন এবং অসাধারণ সব নাটক নির্মাণ করছেন দর্শকদের জন্য।
আপনার উল্লেখযোগ্য কাজ সম্পর্কে বলুন।
আমার উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হচ্ছে একক নাটক—জলছাপ, তাহারা সন্ন্যাসী, রঙের সংসার, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আলাল দুলাল নেপালে, সিনিয়র আর্টিস্ট, কাবাব মে হাড্ডি, ধান্দাবাজ, প্রেম লাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, টিপু সুলতানের হাতি, ৭২ ঘণ্টা, জেন্টেল ম্যান, সুরুজ, পালকি প্রভৃতি। ধারাবাহিকের ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল- গোলমাল, জয়নাল জাদুকর, পঞ্চ প্রেমিক, নজিরবিহীন নজর আলী। নাটকের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনও নির্মাণ করি আমি। কেয়া ওয়াশিং পাউডার, ঝাঁঝ চানাচুর, সফটি টিস্যু, উদয়ন পূর্বাচল সিটি, রেমি, নিউওয়ে, আইসিএল ড্রিংকিং ওয়াটার, প্রাণ জুস, আরএফএল—উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞাপন আমার।
বর্তমান ব্যস্ততা এবং ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলুন।
আরটিভিতে প্রচারিত হচ্ছে আমার মেগা সিরিয়াল ‘নজিরবিহীন নজর আলী’। সপ্তাহে চার দিন এটা প্রচারিত হয়। এছাড়া নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান যুবরাজ ফিল্মস থেকে শুরু করছি ‘মুসকিল আসান কোম্পানি’ ও ‘হাবিলদার টকিজ’ নামে আরও দুটি মেগা সিরিয়াল। আমার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে টিভিসি, এবং ফিল্ম নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রেও আমার প্রযোজনা সংস্থা করেছি। যার নাম JUBARAZ FLIMS USA INC। আমার প্রথম ছবি ‘দুই বাটপার’ এখান থেকেই নির্মাণ হবে।
ছবি শামীম আল নূর