সম্রাটের মঞ্চ

ছোটবেলা থেকেই মঞ্চের বাতাসেই বেড়ে ওঠেন ড. মোহাম্মদ আব্দুল হালিম পারমানিক। সেই থেকেই মঞ্চের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা। আর ভালোবাসার জায়গা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগ থেকে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে পেশাদার জীবনেও বেছে নিয়েছেন মঞ্চ ও শিক্ষকতাকে। শিক্ষকতা করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত ও নাট্যকলা বিভাগে। পাশাপাশি কাজ করছেন মঞ্চ নাটকে। ড. মোহাম্মদ আব্দুল হালিম পারমানিকের ডাক নাম সম্রাট। একজন সম্রাট যেমন সকল বিপদ থেকে তার রাজ্য, তার প্রজাদেরকে আগলে রাখতে চেষ্টা করেন ড. মোহাম্মদ আব্দুল হালিম পারমানিকও যেন সম্রাটের মতো তার স্বপ্নের রাজ্যকে আগলে রাখতে চান। সম্রাটের জন্মস্থান কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়িতে। ছেলেবেলা থেকেই সম্রাটের ভালোবাসা মঞ্চকে ঘিরেই। তৃতীয় শ্রেণীতে পড়া অবস্থাতেই গ্রামের একটি নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে যান। ‘মুঘলে আজম’ শিরোনামের নাটকটির পরিচালনায় ছিলেন তার আপন বড় ভাই। সেই যে শুরু এরপর থেকে কেবলই এগিয়ে যাওয়া। আর তার গ্রামে মঞ্চ নাটকের পরিবেশও ছিল দারুণ। গ্রামে প্রায় প্রতিবছরেই মঞ্চ নাটকের আসর বসত। আর সুযোগ পেলেই সম্রাট অভিনয় করতেন নাটকে। নিজে বেড়ে ওঠার সাথে সাথে বেড়ে উঠেছে তার স্বপ্নের পরিসর। আর সেই জায়গা থেকেই কাজ করেছেন এবং এখনো করছেন। মঞ্চ নিয়েই যে জীবন সেই জীবনে তার আছে অনেক স্মৃতি। অনেক স্মরণীয় ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় একবার ভারতের দিল্লিতে গিয়েছিলেন একটি মঞ্চ নাটকের কাজ করতে। ‘বেহুলার ভাষান’ নামক নাটকটির ভাষা ছিল যথারীতি বাংলা। সুতরাং দিল্লির দর্শকদেরও তা বুঝতে পারার কথা নয়। কিন্তু তারপরেও নিজের সেরাটা ঢেলে দিয়েই কাজ করছিলেন সম্রাট। কিন্তু অভিনয়ের একপর্যায়ে তিনি উপলব্ধি করেন দর্শকরা কাঁদছেন। সবার চোখে পানি। সম্রাটের অভিনয় যেন সার্থক হলো। দিল্লির সেই স্মৃতি এখনো সম্রাটের মনে অম্লান হয়ে আছে। এখন তো অনেক চ্যানেল। নাটক, সিনেমা মিলিয়ে কাজের অনেক সুযোগ। আর মঞ্চের থেকে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় খ্যাতিও পাওয়া যায় তুলনামূলক সহজে। কিন্তু তারপরেও তরুণেরা মঞ্চে আগ্রহী হচ্ছে কেন জানতে চাওয়া হলে নাট্যকলার এই শিক্ষক বলেন, ‘আসলে থিয়েটারে যারা কাজ করেন আর টিভিতে যারা কাজ করেন তাদের উভয়েরই কাজের ক্ষেত্রটা আলাদা। যে যেখানে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, যে যেখানে কাজ করতে ভালোবাসেন সেখানেই সে থিতু হতে চায়। এখন যেসব তরুণ থিয়েটারে কাজ করছেন বা করতে আসছেন তারাও তাদের ভালোবাসা থেকেই আসছেন এখানে। সুতরাং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় খ্যাতি পাওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও মঞ্চের কর্মীরা ভালোবাসার টানেই এখানে আসবেন।’টিভি চ্যানেলে বা মিডিয়াতে নাটক, চলচ্চিত্র যেভাবে স্থান পায় মঞ্চ সেভাবে পায় না। মানুষের মধ্যে মঞ্চের আগ্রহটা সেভাবে কাজ করে না। এর কারণ জানতে চাওয়া হলে এই গুণী নাট্যশিল্পী জানান, ‘আমাদের দেশে মঞ্চের আগ্রহটা সেভাবে তৈরি হয়নি। এর জন্য আমাদের অগ্রজ আর আমাদের রাজনীতিবিদদেরই আমি দায়ী মনে করি। তারা পারেননি সেভাবে মঞ্চের পৃষ্ঠপোষকতা করতে। আমি তো বলব আমাদের দেশে মঞ্চের পৃষ্ঠপোষকতা একেবারেই নেই। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের কলকাতায় মঞ্চ নাটকের পৃষ্ঠপোষকতা যথেষ্ট ভালো। দিন দিন আরও ভালো হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো তার কিছুই নেই। আমাদের শিল্পীরা যা করছে নিজের প্রচেষ্টাতেই করছে। তারা নিজের কাছে নিজেরাই ঋণী।’ ড. মোহাম্মদ আব্দুল হালিম পারমানিক নিজেই নাটকের শিক্ষক। নিজের শিক্ষার্থীদের মঞ্চে কাজের আগ্রহ প্রসঙ্গে তিনি মনে করেন, ভালোবাসার জায়গা থেকেই তারা এই বিভাগে পড়াশোনা করছে। কাজও করছে যে যেখানে আগ্রহী। এদের অনেকেই হয়তো ঝরে পড়বে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে। গুণী এই নাট্যশিল্পী আপাতত ব্যস্ত রয়েছেন তার দল নাটবাংলার ‘ওয়ারী বটেশ্বর’ নাটক নিয়ে। ধারণা করা হচ্ছে কোরবানি ঈদের পরে নাটকটি মঞ্চস্থ হবে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায়।