পানিবন্দী লাখো মানুষ

‘চারদিন থিকা পানির মদ্দে আছি। কাম কাজ নাই, খাওয়া দাওয়াও নাই। মাইনসের বাইত্তে থিকা রাইন্দা দিনে একবার কইরা খাইয়া থাকা নাকে। এহনও কেউ দেখবারও আইল না। মেম্বার-চেয়ারম্যানগরেকও দেহি না।’ বলছিলেন কুড়িগ্রামের রাজীবপুরে বন্যার পানিতে প্লাবিত উত্তর কোদালকাটি চরের স্বামীহারা নারী লাল বানু (৬০)। গতকাল বুধবার সরেজমিনে ওই চরে গিয়ে দেখা গেছে প্রায় সব বাড়িতেই পানি। লালবানুর পরিবারের মতো ওই চরের অসংখ্য পরিবার পানির মাঝে বসবাস করলেও তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসেনি কেউ। শুধু কুড়িগ্রামই নয়, গত কয়েকদিনের বন্যায় উত্তরের গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়াসহ দেশের আরো কয়েকটি জেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গত ২৪ ঘন্টায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। বানভাসি অসংখ্য পরিবার মালামাল ও গবাদিপশু নিয়ে কলাগাছের ভেলা, বাঁশের মাচা ও উঁচু স্থানে গাদাগাদি করে বাস করছেন। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি, ওষুধ ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। মানুষগুলো মানবেতর জীবনযাপন করলেও অনেক স্থানেই পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পৌঁছায়নি। কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ১৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদ-নদীতে পানি বাড়ায় তলিয়ে গেছে আরও নতুন নতুন এলাকা। প্লাবিত হয়েছে ৯ উপজেলার ৫০ ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী দুই শতাধিক গ্রাম, চর ও দ্বীপচর। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। দেড় শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসক এবিএম আজাদ জানান, বন্যাদুর্গতের জন্য এক লাখ টাকা ও ১৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। জেলার উত্তর কোদালকাটি চর ঘুরে এসে রাজীবপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, এলাকার বন্যাদুর্গতরা খুবই কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। ঘরে বন্যার পানি উঠায় পরিবার নিয়ে মাঁচায় অবস্থান করছেন চরের দিনমজুর জেন্নত আলী। তিনি বলেন, ‘বানের পানিতে আছি তিন দিন থিকা। কোনো মেম্বারও দেখবার আইসে নাই। খাবার পানি নিয়া মসিবতে আছি।’ জেন্নত আলীর স্ত্রী আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘তিনডা বাচ্চা নিয়া বড় বিপদে আছি। আমরা নয় না খাইয়া থাকপার পারি কিন্তু পোলাপান তো মানে না। তাগরে খাওয়া দেওয়াই নাগবো। চাইরপাশেই পানি, ভাত রান্দি কটাই। মেলা দূর যাইয়া রাইন্দা নিয়া আসা নাগে।’ চরের আরেক দিনমজুর খাদেম আলী জানান, সব বাড়িতেই পানি। মানুষজন খুবই কষ্টে জীবনযাপন করছেন। হাসমুরগিগুলো বানের পানিতে ভেসে গেছে। এই চরের মানুষরা এক কিলোমিটার দূর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করছেন। এ অবস্থায় শুকনা খাবার আর বিশুদ্ধ পানির খুবই প্রয়োজন। কোদালকাটি ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম জানান, আমার এলাকা পুরোটাই বন্যা কবলিত। চরের মানুষগুলো যেহেতু দিনমজুর, সে কারণে তাদের মাঝে তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। উলিপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের অনন্তপুর এলাকায় বাঁধ তলিয়ে নতুন করে আরো ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার আমন ক্ষেত এখন পানির নিচে। রাস্তা-ঘাট তলিয়ে যাওয়ায় গ্রামবাসী যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে উপজেলার ৮ ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। এছাড়া ভাঙনের মুখে পড়েছে হাতিয়া ও বজরা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাঁস খাওয়া ব্রিজ। বালির বস্তা ফেলে এলাকাবাসী ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, করতোয়া নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপজেলার বাঙ্গালা, লাহিড়ী, মোহনপুর, বড়পাঙ্গাসী, উধুনিয়া ও সলপ ইউনিয়নের ৮০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। উধুনিয়া ও বড়পাঙ্গাসী ইউনিয়নের ২০ হাজার মানুষ এখন পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এসব এলাকার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র বাহন কলার ভেলা। এছাড়া বন্যার পানিতে উপজেলার প্রায় ১শ হেক্টর জমির উঠতি আউশ ও বোনা আমন ধান ডুবে গেছে। গত ২৪ ঘন্টায় ১০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে করতোয়া নদী এখন বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস সূত্রে জানা গেছে। ধুনট (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, গতকাল বিকাল ৪টায় যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৭০ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আকস্মিক এই পানি বৃদ্ধিতে উপজেলার গোসাইবাড়ী ও ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়নের ১৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের প্রায় কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যা কবলিত লোকজন গবাদিপশু ও মালামাল নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেক পরিবার আবার পানিবন্দি ঘরের মধ্যেই বাঁশের চাটাই তৈরি করে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। সেখানে জ্বালানি, খাদ্য, বস্ত্র ও খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত কোন ত্রাণ সহায়তা পাননি বানভাসিরা। এছাড়া বন্যায় কৃষকের রোপা আমন ধান, পাট, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল তলিয়ে গেছে। ৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করায় ওই সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জামালপুর প্রতিনিধি জানান, গতকাল বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনার পানি ৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ২ ইউনিয়ন, ইসলামপুর উপজেলার ১২ ইউনিয়ন, মেলান্দহ উপজেলার ৫ ইউনিয়ন, মাদারগঞ্জ উপজেলার ৪ ইউনিয়ন, সরিষাবাড়ী উপজেলার ৪ ইউনিয়ন, বকশিগঞ্জ উপজেলার ২ ইউনিয়ন এবং জামালপুর সদর উপজেলার ১টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। বন্যা কবলিত মানুষ উচু বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। যমুনার দুর্গম চর হরিণধরা, জিগাতলা, চরবেড়কুশা, মুন্নিয়া, সিন্দুর তলি, চরচেঙ্গানিয়া, প্রজাপতি, চরশিশুয়া ও চর বিশরশির এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বেলগাছা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক। এছাড়া খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি গো-খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। জামালপুরের জেলা প্রশাসক শাহাবউদ্দিন খান জানান, এ পর্যন্ত বন্যা কবলিত ইসলামপুর উপজেলার যমুনা পাড়ের ৬টি ইউনিয়নে ১২মে. টন চাল এবং আড়াই লাখ টাকার শুকনো খাবার (চিড়া-গুড়) বরাদ্দ দিয়েছেন। পর্যাপ্ত ত্রাণ রয়েছে, প্রয়োজন হলে দেয়া হবে বলে তিনি জানান। গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের অর্ধলাখ বন্যাদুর্গত মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। তাদের জন্য সরকারি ত্রাণও অপ্রতুল। এদিকে সাঘাটা উপজেলায় যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বুধবার মূল বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের দেড়শ’ ফুট দেবে গেছে। সাঘাটা ইউপি চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন জানান, বাঁধ দেবে গেলেও এখনো তা উপচে পানি প্রবেশ করেনি। তবে বাঁধ ভেঙে গেলে গোটা উপজেলা তলিয়ে যাবে। এলাকার মানুষ তাই আতঙ্কে আছেন। বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল মিয়া। তিনি আরো জানান, বুধবার গাইবান্ধায় ঘাঘট নদীর পানি ২ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এছাড়া ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, বন্যায় উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জানান, বন্যায় প্লাবিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চলমান পরীক্ষা অন্য প্রতিষ্ঠানে নেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নেত্রকোনা প্রতিনিধি ও খালিয়াজুরী সংবাদদাতা জানান, গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণ ও সিলেট অঞ্চল থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে জেলার খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের নুরালী শিবির গ্রামের ৪২টি বাড়ি ধনু নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এই পরিবারগুলো এখন অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েছে। জেলা প্রশাসন হতে পরিবারগুলোর জন্য তাত্ক্ষণিকভাবে নগদ ৩৫ হাজার টাকা এবং ২ টন জিআর চাল প্রদান করা হয়েছে। এদিকে বৈরী আবহাওয়া এবং উত্তাল ঢেউয়ের কারণে খালিয়াজুরী এবং মোহনগঞ্জসহ কয়েকটি হাওরে ট্রলার ও নৌকা চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে লোকজনের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া নেত্রকোনা সদরের ঠাকুরনাকোনাসহ কয়েকটি গ্রামের নিম্নাঞ্চলের আমন জমি পানিতে তলিয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।