খুলনায় এসএসসি পাস সাত ‘চিকিত্সক’ আটক

রাজধানীসহ সারাদেশে ভুয়া চিকিত্সকরা অপারেশনের নামে অপচিকিত্সা দিয়ে রোগীদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সরকারের স্বাস্থ্য প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ভুয়া চিকিত্সকদের চিকিত্সা বাণিজ্য ঠেকাতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। একইভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় ভুয়া চিকিত্সকদের কারবার। গতকাল বুধবার র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত খুলনা মহানগরের বিভিন্ন ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসিতে অভিযান চালিয়ে সাতজন ভুয়া চিকিত্সককে আটক করেন। পরে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা ভ্রাম্যমাণ আদালতকে জানান, বহু বছর ধরে তারা বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক সেজে সব ধরনের অপারেশন ও চিকিত্সা সেবা দিয়ে আসছিলেন রোগীদের। বেশিরভাগ অপারেশনে রোগী নানা জটিলতায় মারা গেছে। আটককৃতরা জানান, অপারেশনের পর জটিলতা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হত। সেখানে রোগী মারা গেলে দোষ সরকারি হাসপাতালের উপর পড়ে। এ ভাবেই বেঁচে যান তারা। মাঝে মাঝে স্বজনহারারা ঝামেলা করতে আসলে চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিয়ে কিংবা রাজনৈতিক দলের ক্যাডার বাহিনী দিয়ে শাসিয়ে দেয়া হয়। তারা স্বীকার করেন, এভাবে তারা চিকিত্সা সেবার নামে মানুষ মেরে আসছে বহু বছর ধরে। এ পর্যন্ত কতজন রোগী মারা গেছে তারা হিসাব দিতে পারেনি তারা। প্রতিদিন একেকজন ভুয়া চিকিত্সক নিম্নে ২০ থেকে ৫০ জন করে রোগী দেখতেন। প্রতিদিন ৩ থেকে ৪টি অপারেশন করতেন। অপারেশনের পর রোগীরা সরকারি হাসপাতালে গিয়ে বেঁচে গেলেও পঙ্গু হয়ে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। তারা জীবিত থেকে মৃত। বেঁচে যাওয়া রোগীর সংখ্যা কম বলে তারা মোবাইল কোর্টের কর্মকর্তাদের জানান। ভুয়া ডাক্তারদের চিকিত্সা দেয়ার নামে মানুষ মারার লোমহর্ষক কাহিনী শুনে মোবাইল কোর্টের কর্মকর্তারা রীতিমত হতবাক হয়ে যায়। মোবাইল কোর্টের এক কর্মকর্তা বলেন, এই ভুয়া চিকিত্সকদের নামের পর এমবিবিএস, এমডি (মেডিসিন), পিএইচডিসহ বিভিন্ন বিষয়ের উচ্চতর ডিগ্রি লেখা থাকে। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অস্টম শ্রেণী থেকে এসএসসি। তারা নিজেরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ভুয়া এমবিবিএস ও উচ্চতর ডিগ্রি সার্টিফিকেটের বাণিজ্য করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ সারাদেশে আড়াই শতাধিক ভুয়া এমবিবিএস ও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক রয়েছে বলে তারা মোবাইল কোর্টের কর্মকর্তাদের জানান। ঐসব এমবিবিএস ও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের সার্টিফিকেট তারাই প্রদান করেছেন। এর আগে চট্টগ্রামে একই ম্যাজিস্ট্রেট ৮ জন ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সককে গ্রেফতার করে তাদের জেল জরিমানা করে কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তারপরও ভুয়া চিকিত্সকদের দৌরাত্ম্য কমেনি। কোটি কোটি টাকার কসাই বাণিজ্যের টাকার ভাগ সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের পকেটে নিয়মিত যায়। স্থানীয় ক্ষমতাধর নেতাদেরও ভাগ দেয়। খুলনা অফিস জানায়, আটককৃতরা হলেন- গাউসুল আযম, ফেরদৌস রহমান, সৌমেন মিত্র, ইব্রাহিম বাহাদুর, কান্তি লাল, পঞ্চানন মহলী ও অনুপ মিত্র। মোবাইল কোর্টটি পরিচালনা করেন র্যাব-৬ এর ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম আনোয়ার পাশা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন র্যাব-৬ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এনামুল আরিফ ও খুলনা সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার ডা. মো. মাসুদ সাত্তার। র্যাব-৬ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এনামুল আরিফ বলেন, চট্টগ্রামে র্যাবের অভিযানে ৮ জন ভুয়া চিকিত্সককে আটক করা হয়। আটককৃত চিকিত্সকরা জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ বাংলাদেশে ২৫০ জন ভুয়া চিকিত্সক রয়েছে। ওই চিকিত্সকরা তাদের নামের পাশে এমবিবিএস, এমডি, পিএইচডি, পিজিটি প্রভৃতি ডিগ্রি ব্যবহার করে প্রতারণা করে আসছিল। ওই তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল আমরা অভিযান পরিচালনা করি।