বিচারক অপসারণ আইন নিয়ে জটিলতা

সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী উচ্চ আদালতের কোন বিচারকের অপসারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতেই। আর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ীই রাষ্ট্রপতি এই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। ফলে সংসদ নেত্রীর (সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন ব্যক্তির) পরামর্শ ছাড়া কোন বিচারক তার পদ থেকে অপসারিত হতে পারেন না। কোন বিচারককে তার পদ থেকে অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের নেই। বর্তমান বিধান অনুযায়ী কোন বিচারকের অসদাচরণের অভিযোগ সম্পর্কে তদন্ত এবং এ সংক্রান্ত সুপারিশ রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণের দায়িত্বই শুধু রয়েছে কাউন্সিলের। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ষোড়শ সংবিধান সংশোধন বিল পাস হলে সুপ্রিম কোর্টের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কোন বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করার ক্ষমতা হারাবে। এ সংক্রান্ত ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের বিধান পুনঃস্থাপিত হলে কোন বিচারকের অসদাচরণের অভিযোগ তদন্তের এবং প্রমাণের জন্য সংসদকে আলাদা আইন প্রণয়ন করতে হবে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই আইন প্রণয়ন নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার যে ক্রম তার তালিকায় প্রধান বিচারপতি রয়েছেন চার নম্বর স্থানে, আপিল বিভাগের বিচারকরা মন্ত্রীর মর্যাদা এবং হাইকোর্টের বিচারকরা প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন। ফলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার ক্রমিকের নিচে থাকা কোন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা বা জাতীয় সংসদ সদস্যদের দিয়ে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা যাবে না। সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে উচ্চ আদালতের কোন বিচারককে অপসারণের পদ্ধতির বর্ণনা রয়েছে। ওই অনুচ্ছেদের ৬ উপ-অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “কাউন্সিল তদন্ত করিবার পর রাষ্ট্রপতির নিকট যদি এইরূপ রিপোর্ট করেন যে, উহার মতে উক্ত বিচারক তাঁহার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে অযোগ্য হইয়া পড়িয়াছেন অথবা গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হইয়াছেন তাহা হইলে রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা উক্ত বিচারককে তাহার পদ হইতে অপসারিত করিবেন।” কিন্তু ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুয়ায়ী কার্য করিবেন:.........। ফলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া কোন বিচারককে অপসারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নেই। এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট এম আসাদুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে ক্ষমতা প্রয়োগ করেন তা সার্বভৌম সংসদের দেয়া ক্ষমতাই। সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ হন সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন ব্যক্তির মধ্য হতে। প্রধানমন্ত্রীকে সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। ফলে বর্তমান বিধান অনুযায়ী উচ্চ আদালতের কোন বিচারককে অপসারণের সঙ্গে পরোক্ষভাবে সংসদই যুক্ত থাকে। এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, বর্তমানে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানের মধ্যে রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের ভারসাম্য রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানে তিনটি বিভাগের মধ্যে যে ভারসাম্য রয়েছে তার কোথাও বিচ্যুতি ঘটলে সব জায়গাতেই বিচ্যুতি দেখা দেবে। প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধন বিলে সংসদের অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে রাষ্ট্রপতির আদেশে বিচারককে অপসারণের কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে কোন বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণের বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইন দ্বারা নির্ধারণ করবে বলে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে এই বিধানটি ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাতিল করে বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সংশোধনী পাশের পূর্বের সাড়ে তিন বছরেও এ সংক্রান্ত কোন আইন প্রণয়ন করতে পারেনি সংসদ। প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধন বিল পাশের পর এই আইন প্রণয়ন নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা আশংকা প্রকাশ করেছেন। উচ্চ আদালতের বিচারকের অসদাচরণের জন্য যে তদন্তের কথা বলা হয়েছে এর আওতায় প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা পড়বেন। ফলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত তাদের চেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি দিয়ে করাতে হবে। বর্তমানে প্রধান বিচারপতির মর্যাদাক্রম অবস্থান রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের স্পিকারের পরে এবং আপিল বিভাগের বিচারপতিরা মন্ত্রীর ও হাইকোর্টের বিচারপতিরা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধন বিল পাশের পক্ষে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের উদাহরণ দেখিয়েছেন। কিন্তু ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যুক্তরাষ্ট্রের অভিশংসন প্রক্রিয়া পুরোপুরি রাজনৈতিক বলে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে ভারতের অভিশংসন প্রক্রিয়া আধা বিচার বিভাগীয়। ওই প্রক্রিয়ায় কোন রাজনৈতিক নেতা বা সংসদ সদস্যের বা কোন আমলার অংশগ্রহণ নেই। ভারত এর আওতায় ১৯৬৮ সালে ‘দ্য জাজেস (ইনকোয়ারি) অ্যাক্ট’ পাস করে। এর বিধান হলো, লোকসভা হলে অন্তত ১০০ সদস্য এবং রাজ্যসভা হলে তার অন্তত ৫০ সদস্যের যৌথ স্বাক্ষরে কারও আচরণ বিষয়ে অপসারণের প্রস্তাব আনা যাবে। প্রাথমিক অনুমোদনের দিনটিতেই স্পিকার তিন সদস্যের জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করবেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারকের মধ্য থেকে একজন এবং হাইকোর্টসমূহের প্রধান বিচারপতিদের মধ্য থেকে একজন এর সদস্য হবেন। আর স্পিকারের স্বীয় বিবেচনায় মনোনীত একজন বিশিষ্ট আইনবিদ এর সভাপতি হবেন। নিয়ম হলো, কাউকে অভিযুক্ত করলে তা দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে পাস হতে হবে। আর অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দিলে ওই অভিশংসন প্রস্তাবের মৃত্যু ঘটবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে জুডিশিয়ারি কমিটির যেকোনো সুপারিশ কংগ্রেস অগ্রাহ্য করতে পারে। প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধন বিল অনুযায়ী কোন বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় কিন্তু অপসারণের সমর্থনে দুই-তৃতীয়াংশের ভোট পাওয়া না যায় তাহলে অভিযোগ যতই গুরুতর হোক ওই বিচারকের অপসারণ করা যাবে না। ফলে গুরুতর অভিযোগ নিয়েও একজন বিচারক তার পদে থেকে যেতে পারেন।