কায়সারের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা যে কোন দিন
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০১৪, ২৩:২৩
সাবেক কৃষি প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টি (জাপা) নেতা সৈয়দ মো. কায়সারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় যেকোনো দিন ঘোষণা করা হবে। বিচারিক কার্যক্রম শেষে গতকাল বুধবার বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। একই সঙ্গে অসুস্থতার কারণে জামিনে থাকা কায়সারের জামিন বাতিল করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এদিকে, ট্রাইব্যুনালে বিচার কাজ শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ মামলার তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। কায়সার বাদে বর্তমানে দুটি ট্রাইব্যুনালে আরো চারটি মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়। একই পরিস্থিতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগেও। জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ের পর আর কোন রায় আপিল বিভাগ থেকে ঘোষিত হয়নি। জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় চার মাস ধরে অপেক্ষমাণ রয়েছে।
মঙ্গলবার আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গতকাল পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তুরিন আফরোজ। তিনি বলেন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কায়সার বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগী বাহিনীর মতো কাজ করেছে। স্থানীয় এই মিলিশিয়ারা পাকিস্তানি সেনাদের অপারেশনে সহায়তা করেছে। তাদের বিভিন্ন জায়গা ও ব্যক্তি চিনিয়ে দিতো কায়সার বাহিনীর সদস্যরা। একাত্তরে ২২ টি গ্রামে প্রায় ১০৮ জনকে হত্যার ঘটনাকে গণহত্যা দাবি করে তিনি বলেন, সেখানে হিন্দুদের সংখ্যা বেশি ছিলো। কায়সারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা ১৬টি অভিযোগই প্রমাণ হয়েছে দাবি করে তিনি ট্রাইব্যুনালে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কামনা করেন।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষের অপর কৌঁসুলি রানা দাসগুপ্ত ট্রাইব্যুনালকে বলেন, একাত্তরে যুবক কায়সার যে গুরুতর অপরাধ করেছে তার ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। ঐ সময় হবিগঞ্জ, মাধবপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে হত্যাকাণ্ডে কায়সার ড্রাগনের মতো ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাই কায়সারের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় না নিয়ে অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে সর্বোচ্চ শাস্তিই কামনা করেন তিনি। একই সঙ্গে কায়সারের কারণে যেসব নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলো তাদের জন্য এবং এই মামলার সাক্ষী এক যুদ্ধশিশুর জন্য ক্ষতিপূরণও দাবি করেন তিনি।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী এস এম শাহজাহান সাংবাদিকদের বলেন, অভিযুক্ত কায়সারের বিরুদ্ধে আনা ১৬ অভিযোগের একটিও রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি। এজন্য আসামিকে সকল অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়ার আহবান জানিয়েছি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় আমরা সাফাই সাক্ষী আনার প্রয়োজন মনে করিনি। আর যে কায়সার বাহিনীর কথা বলা হয়েছে তা প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি।
গত ১০ আগস্ট থেকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করে ১৯ আগস্ট শেষ করে আসামিপক্ষ। এর আগে গত ২৩ জুলাই থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত কায়সারের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। গত ২ ফেব্রুয়ারি ১৬টি অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে সৈয়দ মো. কায়সারের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। ৯ মার্চ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ৩২ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। তবে কায়সারের পক্ষে কেউ সাফাই সাক্ষী দেননি।
মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারাধীন আসামিদের মধ্যে কায়সার দ্বিতীয় ব্যক্তি, যাকে জামিনে রেখে শুনানি চলে। এর আগে বিএনপি নেতা আব্দুল আলীমকে জামিনে রেখে বিচার কাজ চলে।
দীর্ঘ হচ্ছে অপেক্ষার তালিকা:
কায়সারকে নিয়ে পাঁচটি মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রইলো দুই ট্রাইব্যুনালে। এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আছে তিনটি ও ট্রাইব্যুনাল-২ এ আছে দুটি মামলার রায়।
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তৃতীয় দফায় অপেক্ষমাণ রাখার পরও ঘোষণা হচ্ছে না জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়। গত ২৪ জুন রায় ঘোষণার ধার্যকৃত দিনে অসুস্থতার কারণে নিজামীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা যায়নি। পরে স্বাস্থ্যগত প্রতিবেদন চেয়ে নিজামীর মামলার রায় ঘোষণা আবারো অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনাল-১ এ ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র ও বিএনপির নেতা পলাতক এম এ জাহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম গত ১৭ এপ্রিল শেষ হয়। রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখার পর প্রায় চার মাস অতিবাহিত হলেও রায় ঘোষণা হয়নি।
ট্রাইব্যুনাল-১ এ অপেক্ষায় থাকা অপর মামলাটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে।
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে। তিন মাস অতিবাহিত হলেও এখনো রায় ঘোষণা করা হয়নি।
অন্যদিকে, ৫০ কার্যদিবস শুনানি শেষে গত ১৬ এপ্রিল সাঈদীর দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি শেষ হয়। তবে রায় ঘোষণা হয়নি এখনো। বর্তমানে ট্রাইব্যুনাল-১ এ জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের মামলার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে।