আবুবকর সিদ্দিক
জন্মরোমান্টিক কবি
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৪, ১৮:৫৫
১৯ আগস্ট ছিল কবি-কথাশিল্পী আবুবকর সিদ্দিকের ৮১তম জন্মদিন। কবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা
শিকড় মাটির গভীরেই শিরাতন্তুজাল ছড়িয়ে দেয় কিংবা বলা যায় সে-সব ছড়ানোই থাকে, বাইরে থেকে তা দেখা যায় না। এই শিকড় হলো শব্দ : অভিধানের, আটপৌরে। আকাশের দিকে তার কোনো অভিপ্রায় থাকে না। কেবল একজন লেখক সেই তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলেন শব্দের পর শব্দের গ্রন্থনায়, পরস্পর সম্পৃক্তিতে। বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে আবুবকর সিদ্দিক (জ. ১৯৩৪) তেমনই একজন সব্যসাচী লেখক, যিনি পাঠকের মননে, বোধে ও অনুভবে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন দেশজ মৃত্তিকালগ্ন অস্তিত্ব, বাঁচন-মরণ ও মনুষ্যজন্মের মহিমা। বাংলাদেশের সাহিত্যাকাশের এমন একজন ঋদ্ধ কবি, কথাশিল্পী, নির্ভেজাল গদ্যকার, গণসংগীত রচয়িতার ৮০ বছর পূর্ণ হওয়া তাঁর পাঠকের জন্যে নিঃসন্দেহে বড় প্রাপ্তি। ‘ধবল দুধের স্বরগ্রাম’ থেকে ‘এ এক অন্যমানবিক কবিতা’ পর্যন্ত আবুবকর সিদ্দিকের কবিতাগ্রন্থের সংখ্যা ২০, গল্পগ্রন্থের সংখ্যা ১৩, উপন্যাস ৪ প্রবন্ধের বই ৩, স্মৃতিকথা ৩, গণসংগীতের সংকলন ১, কবিতাসমগ্র—দুই খণ্ড এবং রচনা সমগ্র ১ম খণ্ড।
’৫০-এর দশকে যাত্রা শুরু করেছিলেন আবুবকর সিদ্দিক প্রথমত কবিতা ও ছোটগল্পের ভেতর দিয়ে। সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় ধরে তাঁর সাহিত্যচর্চা এবং বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির উত্থানপতনময় মুহূর্তে আবুবকর সিদ্দিকের লেখনীশক্তিও বাঁক নিয়েছে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির বিচিত্র পথে ও পন্থায়। আবুবকর সিদ্দিক প্রধানত কবি, তারপরে কথাসাহিত্যিক। মননশীল প্রবন্ধও লিখেছেন অনেক, এর ভেতরে বিশিষ্টজনকে নিয়ে লেখা তাঁর স্মৃতিকথা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে নিঃসন্দেহে। এমনকি গণসংগীত আবুবকর সিদ্দিকের স্বাতন্ত্র্য পরিচয়ের একটি ব্যতিক্রম মাধ্যম। সুতরাং এত বিচিত্র ধারায় যাঁর লেখনীশক্তি সমপ্রসারিত হয়েছে, তাঁকে সম্পূর্ণরূপে জানতে হলে পাঠককে তাঁর রচনাসমগ্রর কাছে ফিরে যেতে হবে বার বার, এটাই তো সত্যি।
আবুবকর সিদ্দিকের কাব্য-জীবনের উন্মেষকালের কবিতাসমূহে প্রথম যৌবনের রোমান্টিক উষ্ণতা, যন্ত্রণা, স্বপ্ন ও রাজনৈতিক উদ্দীপনা সবই রয়েছে। ষাটের দশকের উত্তাল রাজনীতি ও কবির ব্যক্তিগত প্রেমানুভূতি একান্ত সত্ আবেগে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে তাঁর সে সময়ের কবিতাগুলোতে। ’৪৭-এর দেশভাগের সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের ফলে ব্রিটিশশাসিত বাংলাদেশ পরিণত হলো নতুন উপনিবেশে। সেখানে জন-জীবনের বিচিত্র, জটিল ও বহুভঙ্গিম আবর্ত-সংর্ঘষ-গতি ও সংগ্রামের অভিঘাতে বাংলাদেশের কবিতাও হয়ে উঠল সেই বৈরী বাস্তবতার অনুসঙ্গী। এই প্রেক্ষাপটে কবি আবুবকর সিদ্দিকের কবিতার চেতনা ও প্রকরণও হয়ে উঠেছে রক্তাক্ত, জটিল, দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ অথচ জীবন্ময়।
আবুবকর সিদ্দিক পুরোমাত্রায় রোমান্টিক কবি। কিন্তু তাঁর এই রোমান্টিকতা এক ধরনের পরাবাস্তব কুহকী মোহে আচ্ছন্ন। আয়ুষ্কাল, নিরবধি ও অবিভাজ্য কালবোধ, অস্তিত্বের অনস্বীকার্যতা-অসহায়তা, অবিদীর্ণ ব্রহ্মাণ্ড নিখিল বিস্ময়, এই সব মননজটিল রহস্যপ্রাণতার দার্শনিকতায় আচ্ছন্ন হন একজন অন্তর্মনস্ক কবি। আবুবকর সিদ্দিক অবিভক্ত ও অবিভাজ্য বাংলা কবিতার ধারাকে বহন করেছেন বলেই তাঁর পক্ষে বলা সম্ভব হয়েছে কবিতা প্রেমের, ভালোবাসার, মানবিকতার আবার ঘৃণার, ব্যঙ্গের, প্রত্যাঘাত হানারও। যখন বাস্তবে দেখেন সমূহ ভেঙে পড়ছে, সমুদ্যত হয়ে প্রতিরোধে দাঁড়ায় না, তখন কবিতায় উত্সর্গীত কবিপ্রাণ আবুবকর সিদ্দিকের কবিতায় সময়-বাস্তব-ইতিহাসের হাত ধরে মাটি-মানুষ-নিসর্গ প্রধান হয়ে ওঠে।
আবুবকর সিদ্দিকের কাব্যবৈশিষ্ট্যের প্রধান দিকদর্শন তাঁর বহুমাত্রিকতা। সামাজিক দায়বদ্ধতা, আধুনিকতা, পরিশীলিত কাব্যচিন্তা, ঘূর্ণায়মান জীবনের দৈশিক ও বৈশ্বিক টানাপোড়েন, ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার—এ সব কিছুই কবির কাব্যবৈশিষ্ট্যের অন্যতম চরিত্র। যদিও স্বতন্ত্রভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে ওঠে কবির নিজস্ব প্রতীক ব্যবহার ও শব্দ নির্মাণের সূক্ষ্মতা। আর এর মধ্য দিয়ে তিনি স্বতন্ত্র হয়েছেন ভাষায় ও বিশ্বাসে। কবিতায় আঞ্চলিক শব্দ ও আঞ্চলিক উচ্চারণের ঐশ্বর্যকেও তিনি অঙ্গীকার করেছেন শিল্পের সততায়।
অথচ আবুবকর সিদ্দিক তাঁর কবিসত্তাকে অত্যন্ত সচেতনভাবে কথাশিল্পীসত্তার ওপর প্রভাব আরোপ করা থেকে বিরত রাখতে পেরেছেন, এটা আমাদের কথাসাহিত্যের জন্যে একটা বড় শুভলক্ষণ। আর এ জন্যেই বোধহয় স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের জনজীবনের বহুকৌণিক বাস্তবতার অনন্য রূপকার হয়ে উঠতে পেরেছেন তিনি। গল্প ও উপন্যাসের বিষয় নির্বাচনে, বিচরণে, এমনকি ভূগোলে—সব মিলিয়ে একটা বিশাল ক্যানভাসে কাজ করেছেন লেখক। বিচিত্র বিষয়বৈভবে তাঁর কথাসাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে। দক্ষিণ বাংলার একেবারে প্রত্যন্ত ভূমি সুন্দরবন, অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের কঠিন মাটি বরীন তথা বরেন্দ্র;—একযোগে কয়েক হাজার মাইলের পরিক্রমা। আর বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রেও সেই একই সচলতা। একদিকে নকশাল রাজনীতির পোড় খাওয়া কমরেড, তার পাশেই আবার ভণ্ড মুক্তিযোদ্ধার ঘর গুছিয়ে নেয়ার আয়োজন, আবার অন্যদিকে দেখি একেবারে হাল রাজনীতিতে ভুয়া গণতন্ত্র কায়েমের আত্মপ্রসাদ; বাংলাদেশি রাজনীতির এইসব নখরাবাজি ক্ষমাহীন শ্লেষের ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। আরও আছে আবহমান বাংলার শোষণলাঞ্ছিত কালিগোলা অন্ধকার। ফতোয়াবাজ মৌলবাদীর দোররা কেটে বসে বাংলার অসহায় নারীদেহে। আবার সুন্দরবনের আদিম অরণ্য গহনে নোনা মেয়েমাংসের গন্ধসন্ধানে ঘুরপাক খায় শহরের আধুনিক কর্মজীবী। সামন্ত আমলের বিচিত্র সব বিলাস-ব্যাভিচারের সচিত্র রূপটিও ধরা পড়ে তাঁর গল্প ও উপন্যাসে।
আবুবকর সিদ্দিকের এই গদ্যের অঙ্গাঙ্গি উপকরণগুলো হচ্ছে সংবেদনশীল পর্যবেক্ষণ, আনুবীক্ষণিক বিশ্লেষণ, পটভূমি অনুযায়ী ভাষারীতি, কখনো শ্লেষে-বিদ্রূপে কখনো বা মানবিক মর্মিতায় জীবন্ত, অচিন্তিতপূর্ব ক্ষুরধার সব উপমা-প্রতীকের আধুনিক ব্যবহার এবং আঞ্চলিক সংলাপের জাদুকরী প্রয়োগে মূর্তিমান যত রক্তমাংসের মানুষ। এই দুর্লভ শিল্পসিদ্ধি তখনই সম্ভবপর যখন সম্পূর্ণ ভূগোলভুক্ত ক্যানভাস ও তার জনজীবন সম্বন্ধে সমাজবোধটি গাণিতিক হিসাবে সঠিক মাত্রা পায় এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয় নিরীক্ষাধর্মী ডাইন্যামিক ভাষারীতির ওপর মাস্টারসুলভ অধিকার। বলা যায় তিনি প্রতীকী তাত্পর্যের নিরিখে একটি নতুন ও স্বতন্ত্র পথনির্মাণ করেছেন আমাদের কথাশিল্পে। আবুবকর সিদ্দিকের কথাশিল্পের বিষয়, ভাষাভঙ্গি ও অন্তর্বুনন বাংলা সাহিত্যের এক অসামান্য নিদর্শন। বাংলাদেশের যে ক’জন মুষ্টিমেয় দায়বদ্ধ জীবনশিল্পী কথাকার আছেন, আবুবকর সিদ্দিক তাঁদের শীর্ষ তালিকাভুক্ত।
কবিতা ও কথাসহিত্যের মতোই প্রবন্ধগুলোতেও নিজস্ব অঙ্গীকারের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন আবুবকর সিদ্দিক। শুরু থেকেই তিনি ছিলেন বাম-রাজনীতি ঘরানার লোক। মুক্তবুদ্ধির চর্চা করে গেছেন জীবনভর। তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্মই প্রগতিশীল। এ পর্যায়ে তাঁর প্রবন্ধসাহিত্যের শরীরেও লেগে আছে এই সমস্ত কিছুর বিশ্বস্ত ছাপ। সুতরাং তাঁর প্রবন্ধসাহিত্যের ভেতরেও খুঁজে পওয়া যায় সাহিত্যবিষয়ক বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা, স্বদেশভাবনা এবং আর্থসামাজিক ও রাজনীতির ফাঁসকলে নিস্পেষিত জনজীবনের ক্ষোভ ও দ্রোহ। আবার স্মৃতিকথার ভেতর দিয়ে আবুবকর সিদ্দিক জীবন্ত করে তুলেছেন তাঁর শিক্ষক থেকে শুরু করে বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো ডাকসাঁইটে কবিদের। ‘প্রবন্ধ’-এর শাব্দিক ও আভিধানিক অর্থের ভেতরে যে গুরুগম্ভীর তত্ত্ব ও তথ্য সাধারণ পাঠকের সামনে ধরা দেয়, সেই ধারণাকে পাল্টে দেয় আবুবকর সিদ্দিকের প্রবন্ধ। এ এক নতুন স্টাইল। বিষয়-বিষয়ীর নিরস তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ না করে তার তলাকার জীবনসত্য খুঁজেছেন তিনি। আর সবথেকে বড় কথা তাঁর কথাসাহিত্যের গদ্যরীতি আর প্রবন্ধের গদ্যরীতির মধ্যে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য, যা সহজেই চোখে পড়ে।
অন্যদিকে এক ব্যতিক্রমী স্বাতন্ত্র্য পরিচয় বহন করে আবুবকর সিদ্দিকের গণসংগীত। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের পটভূমিতে ও স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অসংখ্য গণসংগীত গীত হতো এবং সেগুলো জনপ্রিয়তাও অর্জন করেছিল প্রশ্নাতীতভাবে। তাঁর গণসংগীতের প্রকাশভঙ্গি, ভাষার বলিষ্ঠ শব্দচয়ন এবং সুরের উদ্দীপ্ত প্রেরণাই তাঁকে রুদ্র স্বর ও সুরের অঙ্গীকারবদ্ধ কলমসৈনিকের পরিচিতি এনে দিয়েছে। ১৯৪৬ থেকে ২০১৪—প্রায় ৭০ বছরের লেখকজীবনে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—বাঙালির সমাজজীবনে এগুলোর প্রভাবকে আবুবকর সিদ্দিকের লেখকসত্তার ধারাবাহিক উত্তরণের ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই বিষয়টিকে আরো প্রাণবন্ত করে লেখক উপস্থাপন করেছেন তাঁর রচনাসংগ্রহ-১ম খণ্ড ‘সাতরাজার ধন’-এর ভূমিকা ‘পরিপ্রেক্ষিত প্রসঙ্গে’ লিখতে গিয়ে : ‘এই বিপুল বৈভব ভরা অফুরন্ত পুঁজি, অন্য আর কী সম্ভব হতে পারত আমার পক্ষে লেখক না হয়ে উঠে?... সারা জীবন ঘুরেছি, দেখেছি, পড়েছি আর মনের মধ্যে পাহাড় জমিয়ে তুলেছি। আমার ভবিতব্য ছিল লেখক হওয়া। যে সংবেদী সাহিত্যবীজ পশ্চিমবঙ্গ থেকে ধরে এনেছিলাম, দেশে এসে তাই উদ্গত হয়ে উঠতে থাকে।’
স্বভাবের দিক দিয়ে আবুবকর সিদ্দিক জন্মরোমান্টিক। নারী, প্রকৃতি, মানুষ—সবকিছুর ভেতরেই তাঁর সৌন্দর্য সন্ধান অতি তীব্র। বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ যত পরিণত হয়েছে, নিজের দেশীয় জীবন ও সময় অবধারিতভাবে তাঁকে করে তুলেছে রাজনীতি ও সমাজমনস্ক। ফলে জীবনভর দেখে দেখে লিখে লিখেও ক্লান্তি মানে না তাঁর কলম। সুতরাং আমরাও বিশ্বাস করি, শেষ নিঃশ্বাস নেয়া পর্যন্ত নতুনতর প্রেরণায় সচল থাকবে আবুবকর সিদ্দিকের লেখনী, ৮০ বছরের পূর্ণতায় কবির প্রতি এই আমাদের শুভকামনা।