চন্দনের ছন্দ
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৪, ১৮:৫৫
শোকাঞ্জলি
গত ১৬ আগস্ট শনিবার সকালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে অকালে চলে গেলেন সাংবাদিক ও জনপ্রিয় ছড়াকার ওবায়দুল গনি চন্দন। তাঁর মৃত্যুতে আমাদের শোকাঞ্জলি
আমাদের ছড়াসাহিত্য যাদের হাত দিয়ে সমৃদ্ধ হচ্ছিল ওবায়দুল গনি চন্দন তাদেরই একজন। নির্মল বিনোদন আর বাস্তব জীবনের সমন্বয়ে তার ছড়াগুলো হয়ে উঠেছে অনন্য। একদিকে যেমন শিশুতোষ বিষয়কে তুলে এনেছে অন্যদিকে তেমনি উপজীব্য করে তুলেছে নিগুঢ় বাস্তবতাকেও। তার ছড়া পড়তে পড়তে তাই আমাদের চোখে প্রতিনিয়ত ভাসতে থাকে এই শহরের ইটকাঠ, শ্রমজীবী শিশুদের আর্তনাদ, পরিবেশ বিনষ্টের জন্য মায়াকান্না, ফুটপাতের টোকাইয়ের মলিন মুখ আর সাহেবী দুনিয়ার নিষ্ঠুরতা। জীবন পথের নানা বাঁকে হেঁটে যাওয়া মানুষগুলোর নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়গুলোই পরিবেশন করেছে সে। ছন্দের প্লাটফর্মে সাজিয়ে তুলেছে সারা দুনিয়ার তাবত্ কাণ্ড-কারখানা। ছড়াগুলোর পরতে পরতে লেগে আছে ভিন্নমাত্রা, যা পাঠককে এক ঘেয়েমির নিদারুণ কষ্ট থেকে মুক্তি দিলেও মুক্তি দেয় না বারবার পড়ার বিড়ম্বনা থেকে। আর এখানেই তো চন্দনের স্বকীয়তা। পাঠককে বারবার নিয়ে যেতে পারে তার ছন্দের ভুবনে।
চন্দনকে নিয়ে এখনই এভাবে কলম ধরব আর সেই কলমের কালি ঝরার সঙ্গে সঙ্গে ঝরতে থাকবে আমার অশ্রুধারা—আমি মানতে পারছি না। বাস্তবতার সত্যরূপ মেনে নেয়া ছাড়া কিবা করার আছে আর। ছড়ামহল তো বটেই সাংবাদিকমহল, বন্ধুমহলসহ চেনাজানা আরও যত মহল আছে, প্রায় সবারই জানা আমি আর চন্দন হাত ধরাধরি করে দীর্ঘ সময় পার করেছি। আমার চেয়ে বয়সে ছোট হলেও আমাদের দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বের উজ্জ্বল আলোয় কোনো আঁধারের ছায়া নামেনি।
ওর চেহারা তখনো দেখিনি। নাম দেখতাম। ছড়া পড়তাম। ছড়ার শেষে লেখা থাকত ওবায়দুল গনি চন্দন, বয়স ১২। শিশু ও নবারুণ পত্রিকায় এভাবেই তার লেখা ছাপা হতো। সন তারিখের হিসাব রাখিনি। তবে এটুকু মনে আছে, ’৮৮ সালের কোনো একদিন শিশু একাডেমিতে অনেক ছড়াকারের ভিড়ে সুজন বড়ুয়ার অফিস কক্ষে পরিচয় হয় চন্দনের সাথে। সেই থেকেই এক অদ্ভুত টান অনুভব করলাম। চন্দন হয়ে উঠল আমার ছড়াবন্ধু। শুধু সময়ের সাথে সাথে যে একটা গন্ধ জড়িয়ে থাকে সেই গন্ধটা নাকে ধরে চোখ বন্ধ করলেই এখন স্পষ্ট দেখতে পাই—ওইযে চন্দন হাঁটছে, কথা বলছে, নিজেকে মাতিয়ে রাখছে, অন্যদেরকেও মাতাচ্ছে। একের পর এক দৃশ্য ভেসে উঠছে যার সবটাতেই চন্দন। ওই তো চন্দন শিশু একাডেমির চত্বরে। হাঁটছে বাংলা একাডেমির চত্বরে। কচিকাঁচার আসরে দাদাভাইয়ের সামনে। চন্দনের তারুণ্যভরা গড়ন দেখে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই ওকে ম্যাকগাইভার বলে ডাকতেন। চন্দনের কথা লিখতে গিয়ে দাদাভাইয়ের ওই ডাকটা কানে ভেসে আসছে।
ওই যে দেখতে পাচ্ছি আমাদের আড্ডায় চা খেতে খেতে গল্পকার মাহবুব রেজার সঙ্গে চলছে যুক্তিতর্কের তুমুল উত্তেজনা। মিটিমিটি হাসছে সারওয়ার উল ইসলাম, রোমেন রায়হান, বাকীউল আলম, মনি হায়দার, রহীম শাহ।
চোখ বন্ধ করলেই চন্দনকে দেখতে পাচ্ছি। ওই তো চন্দন ইত্তেফাকের তরুণকণ্ঠের কান্ডারি রেজানুর রহমানের সামনে। কিংবা হলিফ্যামেলির ক্যান্টিনে ডা. সজল আশফাকের সামনে। সঙ্গে আছে ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল, ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার টুটুল। আবার এমন দৃশ্যও ভেসে উঠছে, এই তো চন্দন আমার পাশে রিকশায় বসে আছে। গান ধরেছে উঁচু গলায়। এই তো চন্দন হাঁটছে বইমেলার ধুলোমাখা পথ ধরে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমি আর চন্দন ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্তি ঝরাতে টিকেট কেটে সিনেমা হলে ঢুকে পড়েছি। তারপর কুটুর কুটুর করে এই সেই হাসির কথা বলতে বলতে সিনেমার অ-আ-ক-খ কিছুই না বুঝে হল থেকে বেরিয়ে পড়ছি। এরকম আরও কিছু এবং এরকম অনেক অনেক ঘটনা স্মৃতি হয়ে ঝুলে আছে আমার মগজে। ছড়াকার লুত্ফর রহমান রিটন আর আমীরুল ইসলামের সঙ্গে আড্ডা দিতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে কতবার যে ছুটে গেছে চন্দন। চন্দনকে ঘিরে দারুণ স্নেহে মায়াবী জাল বুনতে দেখেছি লুত্ফর রহমান রিটনকে। ছড়াকার রিটনের প্রতিও চন্দনের ছিল শ্রদ্ধাবোধ। চোখে ভেসে উঠছে সেই দৃশ্য, বেইলী রোডে তুমুল আড্ডায় অভিনেতা মোশাররফ করিম, ফজলুল কবীর তুহিন, এমদাদ, আরিফ বিল্লাহ মিঠু, টিটো, জয়সহ আমরা অনেকেই হো হো করে হাসছি চন্দনের কোনো এক কথায়।
চন্দনের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল মাসিক রম্যম্যাগাজিন ‘কার্টুন’ দিয়ে। নব্বইয়ের শুরুর দিকের কথা। আমিও ওই পত্রিকায় আছি। ছড়া আর কার্টুনের চাকরি আমাদের বন্ধনটাকে আরও পোক্ত করে তুলেছিল। কার্টুন ছেড়ে ‘কিশোর তারকালোক’। তারপর সাময়িক বেকারত্ব। তারপর বাংলাভিশন-বৈশাখি-ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছেড়ে দৈনিক মানবকণ্ঠ। এই হলো তার কর্মজীবন। কর্মজীবনের এই স্রোতধারায় ভাসতে ভাসতে কত বন্ধু কত স্বজনকে যে খুঁজে পেয়েছিল চন্দন তার হিসাব দিতে পারব না। তবে চন্দনের বন্ধু-স্বজনের মধ্যে সবচে’ আলাদাভাবে যিনি নজরদারি করেছেন তিনি আনন্দআলো সম্পাদক রেজানুর রহমান। সে সময় তিনি ইত্তেফাকের তরুণকণ্ঠের দায়িত্বে ছিলেন। তারুণ্যের সুখ-দুঃখ আর সাফল্যের সাতকাহন নিয়ে প্রতি সপ্তাহে তরুণকণ্ঠের নিয়মিত লেখক ছিলাম আমি আর চন্দন। তরুণকণ্ঠের সূত্র ধরে চন্দন একটা সময় ইত্তেফাক ভবনকে করে তুললো দিন কাটানোর প্রধান জায়গা। খুঁজে পেল আরো নতুন বন্ধুদের। যাদের মধ্যে একজন বর্তমানে অন লাইন নিউজ পোর্টাল জাস্ট নিউজের সম্পাদক মুশফিকুর রহমান, সাপ্তাহিক রোববারে কামাল হোসেন বাবলু, স্পোর্টস রিপোর্টার শামিম, ফটো জার্নালিস্ট ইয়াসিন। বয়সের ব্যবধান ভুলে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে স্বজন হয়ে ছিলেন প্রয়াত মাহাবুবুল হাসান নীরু। চন্দন কিছুকাল ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরের পাতার দায়িত্ব নিয়েছিল।
চন্দন টিভির জন্য নাটক লিখেছে। গান লিখেছে। বিটিভিতে ‘ছন্দে ছন্দে’ নামে ছড়া বিষয়ক অনুষ্ঠান করেছে। আবদুন নূর তুষারের উপস্থাপনায় বিটিভিতে প্রচার হতো ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘শুভেচ্ছা’। শুভেচ্ছার বেশ কয়েকটি পর্বে নিয়মিত ছড়া নিয়ে উপস্থিত থাকতাম আমি, চন্দন আর রোমেন রায়হান। সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরে ওই শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে ওবায়দুল গনি চন্দনের ছিল একটি ছড়াপর্ব। যাতে অভিনয় করতেন বর্তমান চ্যানেল আই-এর কর্মকর্তা ইবনে হাসান।
চন্দনের প্রথম ছড়ার বই ‘হেঁইও’। বেরিয়ে ছিল ১৯৯৫ সালে। বইটি প্রচ্ছদ করেছিলেন অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত। এরপর আরও বই প্রকাশিত হয়। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো—‘হুইটি টুইটি’, ‘সুতরাং ভুতরাং’, ‘কান নিয়েছে চিলে’, ‘থলের বিড়াল’, ‘থাকছি ঢাকায় সবাই ফাইন চারশ বছর চারশ লাইন’। ছড়ার জন্য অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে দু-বার। ছড়াই তার শক্তি। আর এই শক্তির জোরে সামপ্রতিক কালের ছড়াসাহিত্যে যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হতে পেরেছে।
ওবায়দুল গনি চন্দনের জন্ম ৩০ আগস্ট ১৯৭০ সালে ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইলে। বাবার নাম এম ওসমান গনি। সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে স্নাতক পাস। সমাজ, স্বদেশ, মানুষ আর প্রিয় দেশের সুনিপুণ চিত্র এঁকে ওবায়দুল গনি চন্দন তরুণ প্রজন্মকে স্বপ্নাবিষ্ট করে তুলেছিল সুন্দর দেশ গড়ার প্রত্যয়ে। শুধু শিশু-কিশোরদের মনেই দোলা দেয়নি চন্দন, দোলা দিয়েছে সকল বয়সী পাঠকের মনেও। আসছে বইমেলায় ‘চন্দনের ছন্দ নে’ নামে ছড়াসমগ্র বের করার প্রস্তুতি ছিল তার। কিন্তু ১৬ আগস্ট ২০১৪ তাকে নিতে হলো মৃত্যুপুরীতে যাওয়ার প্রস্তুতি। তার প্রস্থান কি কারোর প্রতি অভিমান? কোনো ক্ষোভ? স্বভাবগতভাবে যতই হাসিখুশি থাকুক প্রচণ্ড দুঃখ-কষ্ট চেপে রাখত চন্দন। কষ্টের পাহাড় সরাতে পারেনি বুক থেকে। তাই তো বুকে ব্যথা নিয়ে তাকে চলে যেতে হলো পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। যে হাত ধরে হাঁটছিলাম পাশাপাশি সেই হাত হঠাত্ যেন ফসকে গেল। ছেড়ে দিলো আমার হাত। চন্দন, এখন তুমি কই?