গরিবে নেওয়াজ মঈনুদ্দিন চিশিত (রহ.)
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৪, ২০:২৮
ওলিগণের সাহচর্যে তৈরি হয় আলোকিত মানুষ
আল্লাহর ওহী যাঁর ওপর নাজিল হয়েছে তিনি হলেন নবী। আল্লাহর কেতাব যাঁর ওপর নাজিল হয়েছে তিনি হলেন রাসূল। আল্লাহ মানব জাতির কল্যাণে মানব জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য যুগে যুগে নবী-রাসূল পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাঁরা অনেক কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহর বাণী প্রচার করেছেন। হযরত মোহাম্মদ (স.) হচ্ছেন নবী-রাসূলদের মধ্যে সর্ব শ্রেষ্ঠ। তাঁর প্রচারিত ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। হযরত মোহাম্মদ (স.) সর্ব প্রথম মক্কা, মদীনা শরীফ এবং তার আশেপাশের দেশ গুলোতে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পীর আউলিয়া, বুজুর্গ, ফকির, দরবেশদের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে ইসলাম ধর্ম প্রচারিত হয়েছে। এই উপমহাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছেন আউলিয়া বুজুর্গগণ। এই উপমহাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রকৃত অর্থে প্রচারিত এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ৫৮৩ হিজরীর পরে। হযরত মোহাম্মদ (স.) এর ওফাতের পর সাহাবাগণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার করলেও এই উপমহাদেশে পুরোপুরিভাবে ইসলাম ধর্ম প্রচার এবং প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। এই উপমহাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচারে হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশিত (রহ.)-এর নাম বিশেষ ভালে উল্লেখযোগ্য। ইসলাম ধর্ম প্রচারের আগে এখানকার মানুষ চরম অন্ধকারে বসবাস করছিল। চারিদিকে চলছিল শুধু অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার। এই অঞ্চলের মানুষদেরকে এ ধরণের চরম বিপর্যয়ের হাত থেকে উদ্ধার করার জন্য হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশিত (রহ.) ভারত বর্ষে আসেন। বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ ছিলেন আল্লাহর প্রেম-প্রীতি এবং ভালোবাসায় সিক্ত একজন মহান সাধক। মানুষকে সত্য ও সুন্দরের এবং ইসলামের শান্তি বাণীর সন্ধান দেওয়াই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশিত (রহ.)-এর ভারত আগমনের ব্যাপারে জানা গেছে ৫৮৩ হিজরীতে তিনি পবিত্র হজ্ব ব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফ যান। মক্কা শরীফ থেকে তিনি মদীনা শরীফে হযরত মোহাম্মদ (স.)-এর পবিত্র রওজা জিয়ারত করতে যান। কথিত আছে মদীনা শরীফে নবীজী তাঁকে স্বপ্নযোগে হুকুম করেন ভারতের আজমীর নামক স্থানে ইসলাম ধর্ম প্রচার করার জন্য। মহানবী (স.) তাঁকে স্বপ্নযোগে আজমীরের পরিচয় দেন। তারপর তিনি আজমীরের উদ্দেশ্য রওনা হন। তিনি আজমীরে আসার আগে এখানকার মানুষ চরম অন্ধকারে বসবাস করছিল। হিন্দুরাজা পৃথ্বিরাজের দাপটে জনসাধারণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ঠিক সেই মুহুর্তে হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশিত (রহ.) এর আজমীরে আগমন ঘটে। এই মহান বুর্জুগের আগমণে রাজা পৃথ্বিরাজ ক্ষুদ্ধ হয় এবং বিতারিত করার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত খাজা মঈনুদ্দিন চিশিত (রহ.) আজমীরে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য আস্তানা করেন। তাঁর ওপর আল্লাহর সাহায্য এবং হুজুর (স.)-এর দোয়া ছিল। যে কারণে অসীম শক্তিশালী অত্যাচারী রাজা পৃথ্বিরাজ তার বিশাল সৈন্য বাহিনী, তান্ত্রিক সাধক এবং আরও অনেক শক্তি প্রয়োগ করেও খাজা গরীরে নেওয়াজের কোন ক্ষতি করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত খাজা বাবা সমস্ত দুষ্ট শক্তিকে দমন করে ভারতে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করেন তাঁর ব্যক্তিগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং আধ্যাত্নিক শক্তির মাধ্যমে মানুষ সহজেই মোহিত হয়ে যেত। তিনি কখনো কাউকে জোর করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করেননি। তিনি ছিলেন খুব উঁচু স্তরের আধ্যাত্মিক সাধক। ছোটবেলা থেকেই তিনি কঠোর এবাদতে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। তিনি বহু পীর আউলিয়ার কাছে আধ্যাত্নিক শিক্ষা লাভ করেছেন। তাঁর পীর সাহেব হযরত খাজা ওসমান হারুনী (রহ.)-এর কাছে আধ্যাত্নিক জগতের শীর্ষ স্থানে পোঁছানোর শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তিনি দুনিয়ার সমস্ত লোভ লালসাকে ত্যাগ করে আল্লাহর এবাদতে নিয়োজিত থাকতেন। তিনি আল্লাহর এবাদতে এতই মশগুল থাকতেন যে, প্রতিদিন আড়াই হাজার রাকাত নফল নামায আদায় করতেন। সারা বছর রোজা রাখতেন। তিনি কোরানে হাফেজ ছিলেন। তিনি প্রায় প্রতিদিন কোরার খতম দিতেন। তরিকত ব্যতীত শরীয়ত স্থায়ী হয় না। তাই খাজা গরীরে নেওয়াজ ইসলামের স্থায়িত্বের জন্য এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য ও রসূল (স.)-এর মোহাব্বত লাভের উদ্দেশ্যে মুসলামানদের জন্য চিশতিয়া তরিকা প্রকাশ এবং প্রচার করেছেন। চিশতিয়া তরিকা মতে মানুষের শরীরে সর্বমোট ১০টি লতিফা আছে। এই লতিফা গুলো দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের শোকর গুজার করতে হয়। নিয়মিত জিকির আজকার করে লতিফাগুলো আল্লাহ তায়ালার রেজামন্দির উপযুক্ত করতে হয়। মৃত্যু যে কোন সময় আসতে পারে তাই জীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে যেয়ে তিনি আল্লাহর পবিত্র নামে জিকির করতেন। নামাজ সম্পর্কে খাজা গরীবে নেওয়াজ বলেন “আল্লাহর প্রেমিকদের তারিকা হচ্ছে ফজরের নামাজ আদায় করার পর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে থাকা এর প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর প্রিয় দোস্তের সুদৃষ্টি লাভ করা। হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, তিনি ৫৩৭ হিজরীতে ইরানের খোরাসানের সন্জর গ্রামে ১৪ রজব তারিখে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর বাবা সৈয়দ গিয়াস উদ্দীন (রহ.) ছিলেন একজন ধনী ব্যবসায়ী এবং বুজুর্গ ব্যক্তি। মায়ের নাম বিবি উম্মুল ওয়ারা (রহ.)। হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশিত (রহ.) মা-বাবা উভয় দিক থেকে হযরত ইমাম হোসেন এবং হযরত ইমাম হাসান (রহ.) এর বংশধর ছিলেন। তিনি ওলীকূল শিরোমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) এর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন। অল্প বয়সে খাজা গরীরে নেওয়াজ তাঁর মা-বাবাকে হারান। ছোটবেলা থেকেই তিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য কঠোর সাধনায় মগ্ন ছিলেন। তিনি তিন পুত্র এবং এক কন্যা সন্তানের গর্বিত পিতা ছিলেন। তিনি সংসারের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতেন। স্ত্রী-সন্তানদের সঠিকভাবে আদর যত্ন করতেন। তিনি আল্লাহর সাধনা এবং দঃস্থদের সেবার মধ্যে সংসারের যাবতীয় কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করতেন। এই মহান বুজুর্গ ব্যক্তি তাঁর দীর্ঘজীবনে আধ্যাত্মিক সাধনা শেষে ৯৭ বছর বয়সে ৬৩২ হিজরীতে ৬ রজব তারিখে ওফাত প্রাপ্ত হন। ভারতের আজমীরে পবিত্র মাজার শরীফ অবস্থিত। তাঁর পবিত্র মাজার শরীফে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত জেয়ারতের উদ্দেশ্যে আসেন। আমাদের বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার ভক্ত জেয়ারতের জন্য খাজা বাবার দরবারে যান। ৬ রজব তারিখে আমাদের বাংলাদেশে যথাযোগ্য মর্যদার সাথে খাজা বাবার ভক্তরা তাঁর ওফাত দিবস পালন করে থাকে। এই মহান ওলীর উসিলায় আমাদের সবার কল্যাণ হোক এই প্রত্যাশা করি।
লেখক :সাংবাদিক