কুরআন শিক্ষা বিস্তারে হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৪, ২০:২৮
(পূর্ব প্রকাশের পর)
স্বপ্ন দেখার সময়ে ছদর সাহেব জীবিত ছিলেন না। হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) জীবিত ছিলেন। ছদর সাহেব উপস্থিত লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা কি হাফেজ্জী হুজুরকে চেনো? তিনি হলেন বর্তমান যুগের কুতুবে আলম (ওলীকূলের প্রধান)। আব্বাজান হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) নিজেকে কুরআন ও সুন্নাতে রাসূলের বাস্তব নমুনারূপে গড়ে তোলার সাধনায় জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত ও প্রতিটি অনুক্ষণকে কাজে লাগিয়ে ছিলেন। চতুর্দশ শতাব্দির মহান সংস্কারক হাকীমুল উম্মাত হযরত মাওলানা শাহ আশরাফ আলী থানবী (রহ.) এর সুদীর্ঘ সহচর্যের বরকতে শরীয়তের জ্ঞানের পাশাপাশি তাজকিয়া, সুলূক ও মারিফাতের শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন। ফলে ইসলামী শরীয়তের জ্ঞান তাঁর স্বভাব ও মজ্জার সাথে মিশে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন কুরআন ও হাদীসের গভীর জ্ঞানের অধিকারী। যারা তাঁর জীবনাচার প্রত্যক্ষ করেছেন, তারা অবলীলায় স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, তাঁর জীবন ছিল কুরআন ও সুন্নাতে রাসূলের বাস্তব নমুনা। তিনি ছিলেন এক আলোকিত মানুষ। তাঁর আলোর রোশনাই এ দেশের কুপমন্ডুক সমাজকে সীরাতুল মুস্তাকীমের দিশা দিয়েছিল। সর্বোপরি তিনি ছিলেন সুন্নাতে রাসূলের বিমূর্ত প্রতীক। হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) তাঁর জীবনে বিশেষকরে কুরআনকে সমাজ সংস্কারের মূল উপজীব্য করতে চেয়েছিলেন সর্বাস্তকরণে। এ দেশে যে কুসংস্কারচ্ছন্ন সমাজ কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার মূলে আঘাত হানতে চেয়েছিলেন কুরআন দিয়ে। মানুষের তাহযীব-তামাদ্দুন গড়তে চেয়েছিলেন কুরআনের ঐশীসুধায়। ইতিহাসে হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর নামের সঙ্গে তাওবার রাজনীতির যে তকমা লেগে থাকবে অনন্তকাল, তার প্রাণভোমরা ছিল আল কুরআন। আমার অতি নগন্য বিবেচনায়, হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর মেহনত ও সুদুরপ্রসারী স্বপ্নের ফলে আজ মসজিদভিত্তিক মক্তব-ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে গ্রামে গ্রামে। আবাসিক হয়েছে হেফজখানা। দেশের শাসকরা যখনই তাঁর কাছে দুআর দরখাস্ত পেশ করতেন, তিনি তাদেরকে প্রতিটি গ্রামে মক্তব প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিতেন। আমার মনে আছে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর নিকট অঙ্গীকার করেছিলেন, তিনি মসজিদ-ভিত্তিক মক্তব প্রতিষ্ঠা করবেন। সে কাজের সূচনাও হয়েছিল। কিন্তু তাঁর শাহাদাতের পর কার্যক্রম কিছুটা থমকে যায়। তবে আল্লাহ পাক হাফেজ্জী (রহ.) এর এই মুজাহাদাকে থামিয়ে দেননি। আজ গ্রামে গ্রামে যে সমস্ত মসজিদভিত্তিক মক্তব অবলোকন করি, তাতে হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর স্বপ্ন বিমূর্ত হয়ে আছে। তিনি প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি মানুষের শৈশবকে কুরআনের আলো দিয়ে ঘিরে দিতে চেয়েছিলেন। যাতে কুরআনের প্রতি ভালোবাসা প্রতিটি মানুষের গহীনে গ্রথিত হয়ে যায়। আর এভাবেই তিনি গড়তে চেয়েছিলেন কুরআন ভিত্তিক সমাজ এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের মত ইসলামী রাষ্ট্র। সারকথা হলো, দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে কুরআনের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কিংবদন্তি হয়ে আছেন এবং থাকবেন। তাঁর সম্পর্কে যত বেশী আলোচনা হবে সুঘ্রাণ ততই চারপাশকে মোহিত করে তুলবে। হযরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর এক শাগরেদ আবু হানিফা (রহ.) সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে একটি আরবী কবিতা আবৃতি করেছিলেন। কবিতাটির সারমর্ম হলো, ‘বারবার উস্তাদ নোমানের (আবু হানিফা (রহ.) আলোচনা কর, কারণ তাঁর আলোচনা মিশকের মত। যতবর তাঁর আলোচনা করবে, তত বেশী সুঘ্রাণ ছড়াতে থাকবে।’ হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর জীবনের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট লিখতে গেলে লেখা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। আমার মহান পিতা সম্পর্কে এতটুকুই বলতে চাই যে, আমি তাঁকে দেখেছি শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের বেশে, আমি তাঁকে দেখেছি আধ্যাত্মিকতার আলোকময় ভুবনের এক আলোকিত বাসিন্দার বেশে, আমি তাঁকে দেখেছি হেদায়াতের আলো বিলাতে এবং অন্ধকার হূদয়গুলো আলোয় আলোয় ভরিয়ে দিতে, আমি তাঁকে দেখেছি গ্রামে গ্রামে শহরে শহরে আলোর মিনার প্রতিষ্ঠা করতে, আমি তাঁকে দেখেছি জীবনের একেবারে সন্ধা বেলায় অপবিত্র রাজনীতির ময়দানে এসে পবিত্রতার পরাগ ছড়াতে, বিভ্রান্ত জাতিকে তাওবার রাজনীতির আলোর দিগন্তের সন্ধান দিতে। শুধু মাদরাসা নয়, শুধু খানকায় নয়, দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বত্র ইসলামের পয়গাম পৌঁছে দিতে আমি তাঁকে দেখেছি। তিনি ছিলেন মহান। তাঁর জীবন ছিল ইসলামের মনিমুক্তা খচিত বিপুল বর্ণাঢ্য। অনুকরণ আর অনুসরণের অনুপম আদর্শ ছিলেন তিনি। মৃত্যু-হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) ৯৮ বছর বয়সে ১৯৮৭ সালের ৭ মে ইন্তিকাল করেন। হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। ইমামতি করেন হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর জ্যেষ্ঠ পুত্র ক্বারী শাহ আহমাদুল্লাহ আশরাফ (বড় ভাই)। জানাযায় দেশের বিভিন্ন স্থান ও অঞ্চল থেকে লক্ষ লক্ষ শোকার্ত জনতা অংশগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সব মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার পাত্র, যা এ যুগে খুবই বিরল। ঢাকার সাবেক মেয়র মরহুম মুহাম্মাদ হানিফ উদ্যোগী হয়ে নগর ভবন সংলগ্ন ফিনিক্স রোডের নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করেন ‘মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) রোড’। আল্লাহ তাআলা তাঁর কবরকে জান্নাতের বাগিচায় পরিণত করুন, তাঁকে পরকালে মর্যাদার উচ্চ আসন এবং জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমাদেরকে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে জান্নাতি পথ অবলম্বন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক :হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর ছোট সাহেবজাদা,
ইমাম ও খতীব, আম্বরশাহ শাহী জামে মসজিদ, কাওরান বাজার, ঢাকা।