তীরেই কেন তরী ডুবছে!

লোকেরা বলে, পরিসংখ্যান হল মুর্খের হাতিয়ার। তবে পরিসংখ্যানে বিশ্বাস করলে মানতেই হবে যে—বাংলাদেশের সময়টা খুব খারাপ যাচ্ছে। চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশ কোন টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে কোন ফরম্যাটের ক্রিকেটে জয় পায়নি। এই বছর বাংলাদেশ ১১টি ওয়ানডে খেলে ১০টিতেই হেরেছে; একটি পরিত্যক্ত হয়েছিল। কিন্তু এই পরিসংখ্যানকে একটু বিরতি দিয়ে এর ভেতরে চোখ বুলালে অন্য একটা ‘সত্যি’ বেরিয়ে আসবে—বাংলাদেশ জিততে জিততে হেরে যাচ্ছে অনেক ম্যাচ। একেবারে পরিষ্কার করে বললে, ১০টি ওয়ানডে ম্যাচের ৭টিতেই এক ইনিংস বা তারও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রেখেও শেষ পর্যন্ত পরাজয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে। এই ঘটনা এখন দফায় দফায় ঘটছে যে, ম্যাচ বাংলাদেশ জিতবে বলে নিশ্চিত মনে হওয়ার পর হঠাত্ই খেলা চলে গেছে বাংলাদেশের হাতের বাইরে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন আসা একটি দল জেতার অভ্যাস না থাকায় এরকম সংকটে পড়তে পারে। সে সংকট একটা সময় মারাত্মকভাবে বাংলাদেশের ওপর থেকে গেছেও। কিন্তু ২০০৬ সাল থেকে যে দলটা অন্তত ওয়ানডে ম্যাচে নিয়মিত জিততে শিখে গেছে, যে দলটা ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কার মতো দলকে বলে কয়ে হারিয়েছে; তারা কেন হঠাত্ এমন জিততে ভুলে গেল? প্রশ্ন করা ভালো, তারা কেন এরকম জয় হাতছাড়া করতে শুরু করলো? এই প্রশ্ন ভাবাচ্ছে দেশের ক্রিকেট ভক্তদের, ভাবাচ্ছে সাবেক ক্রিকেটারদের; এমনকি বোর্ডের নানা দায়িত্বে থাকা সাবেক ক্রিকেটাররাও বিস্মিত দলের এমন বার বার জয়ের কাছে গিয়ে ম্যাচ হারায়। এক একজন সাবেক ক্রিকেটার ব্যাপারটাকে এক এক ভাবে ব্যাখ্যা করতে চাইলেন। তবে কমবেশি সবাই একটা লাইন নিয়ে একমত হলেন যে, হঠাত্ করে আত্মবিশ্বাসের পতনই এই ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে। আত্মবিশ্বাসের এই ব্যাপারটা তুলে ধরেছিলেন সাবেক অধিনায়ক, সাবেক প্রধান নির্বাচক ও বর্তমান বোর্ডের ক্রিকেট অপারেশনস বিভাগের প্রধান আকরাম খান, ‘এই ম্যাচগুলোতে প্রতি ম্যাচেই আমরা ইতিবাচক কিছু পাচ্ছি। গতকালও অনেকগুলো ব্যাপার আছে, যেগুলো দলকে অনুপ্রাণিত করতে পারতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা আরও একটা ক্লোজ ম্যাচ হেরে গেলাম। মাঠের বাইরে থেকে এর কারণ বোঝাটা একটু কঠিন। নিশ্চয়ই অনেককিছু মিলেই এমন হচ্ছে। আমার মনে হয়, সেই অনেক কিছুর মধ্যে আত্মবিশ্বাসটা একটা ব্যাপার। যেহেতু আমরা পরাজয়ের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছি না, আত্মবিশ্বাসটাও ম্যাচ বের করে আনার মতো থাকছে না।’ অবশ্য এই পুরো চক্রটা বছরের শুরুতে যখন শুরু হল, তার আগে বাংলাদেশ জয়ের ধারাতেই ছিল। ২০১৩ সালটা বাংলাদেশের শেষ হয়েছিল নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইট ওয়াশ করার ভেতর দিয়ে। বছরের প্রথম ওয়ানডেতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচেও জয়টা সময়ের ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছিল। মাত্র ১৮১ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশ ১১৪ রান তুলে ফেলেছিল ২ উইকেট হারিয়ে। বিস্ময়করভাবে ওখান থেকে মুশফিকুর রহিমের দল অলআউট হয় ১৬২ রানে। এরপর শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাকী দুই ম্যাচেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। তবে এই জেতা ম্যাচ হারার ব্যাপারটা আবার ফিরে এলো এশিয়া কাপে। এখানে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জিততে জিততে হারালো বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষে আগে ব্যাট করে ২৭৯ রান করেছিল স্বাগতিকরা। জবাব দিতে নেমে ৫৪ রান তুলতে ২ উইকেট হারিয়েও ফেলেছিল ভারত; ওখান থেকে আবার পরাজয়। পাকিস্তানের বিপক্ষে আগে ব্যাট করতে গিয়ে এই বিজয়ের সেঞ্চুরি এবং ইমরুল, মুমিনুল, মুশফিকদের ফিফটিতে ৩২৬ রান তুলেছিল বাংলাদেশ। জবাবে ৪১.২ ওভারে ২২৫ রান তুলতে পেরেছিল পাকিস্তান ৫ উইকেট হারিয়ে; সেখান থেকে আফ্রিদির একটা ঝড় সব শেষ করে দিলো। এরপর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশ করেছিল ২০৪ রান। এই মাঝারি স্কোর পাড়ি দিতেই ৪৭ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল শ্রীলঙ্কা; সেখান থেকে আবার পরাজয়। ভারতের বিপক্ষে এরপর তিন ম্যাচ সিরিজের দুটিতেই নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশের হাতে। প্রথম ম্যাচে আগে ব্যাট করে ২৭২ রান করেও হার এবং দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতকে ১০৫ রানে অলআউট করেও হার। সর্বশেষ এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে দেড় ইনিংস ধরে ছড়ি ঘুরিয়ে পরাজয়। মানে, প্রথম পারফরম্যান্স যাই হোক, হারবে বাংলাদেশ! এই ব্যাপারটায় হতাশ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রধান নির্বাচক ও সাবেক অধিনায়ক ফারুক আহমেদ বলছিলেন, ‘এটা হতাশার। আমরা ছয়-সাতটা ম্যাচ কেন এভাবে ক্লোজে গিয়ে হেরে যাবো, ঠিক বুঝতে পারছি না।’ ফারুক বা আকরাম পদের কারণেই হয়তো কারণ নিয়ে খুব একটা কথা বলতে পারলেন না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক অধিনায়ক পরিষ্কার দায়টা দিলেন, ম্যাচ প্লানিং ও অধিনায়কত্বের ওপর। একাদশ নির্বাচনে দুর্বলতা এবং শেষ মুহূর্তে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে যে ধরনের তত্পরতা দরকার; তা মাঠে না থাকাই এইসব হারের কারণ বলে মনে করছেন তিনি। কারণ শেষ পর্যন্ত যাই হোক এই তীরে তরী ডোবোনো যে বন্ধ করতে হবে, তাতে সন্দেহ নেই।