সিপিবি সমাবেশে হামলার ১৩ বছর পর বিচার শুরু
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৪, ২২:৫৩
রাজধানীর পল্টন ময়দানে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলায় হরকাতুল জিহাদ নেতা (হুজি) মুফতি হান্নানসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে আদালত। একই সঙ্গে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়ে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে। গতকাল ঢাকার তৃতীয় মহানগর দায়রা জজ ইমরুল কায়েস এই আদেশ দেন। মামলা দায়েরের সাড়ে ১৩ বছর পর মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে চাঞ্চ্যলকর এ মামলার বিচার শুরু হলো বলে জানান আইনজীবীরা। এছাড়া বিস্ফোরক মামলায় অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আংশিক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। অধিকতর শুনানির জন্য ৪ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছে আদালত।
২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। এতে ঘটনাস্থলে চারজন এবং একজন হাসপাতালে মারা যান। সিপিবির তত্কালীন সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান মতিঝিল থানায় মামলা করার দুই বছর পর ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মোমিন হোসেন।
তিনি আদালতকে বলেন, তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার সঙ্গে যোগসূত্র পেয়ে ২০০৫ সালে আবার মামলার তদন্ত শুরু হয়। সাত তদন্ত কর্মকর্তার হাত ঘুরে অবশেষে গত বছর নভেম্বরে অভিযোগপত্র আদালতে জমা পড়ে। মামলা দায়েরের ১৩ বছর পর গত বছর ২৭ নভেম্বর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক মৃণাল কান্তি সাহা ১৩ আসামির বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন। আসামিদের মধ্যে মাইনুদ্দিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষী করা হয়েছে ১০৭ জনকে।
গতকাল এ মামলার অভিযোগ গঠনের জন্য দিন ধার্য ছিলো। মুফতি হান্নান (রমনা বটমূল বোমা হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত), মাইনুদ্দিন শেখ, মাওলানা সাব্বির, শওকত ওসমান ও মশিউর রহমানকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। আসামিদের উপস্থিতিতে ঢাকার তৃতীয় মহানগর দায়রা জজ অভিযোগ গঠনের পূর্বে তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ পড়ে শোনান। উপস্থিত আসামিরা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায় বিচার প্রার্থনা করেন। একই সঙ্গে আসামিদেরকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য তাদের আইনজীবীরা আদালতে আবেদন জানান।
অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে দিয়ে ১৩ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বিচারক। ১৩ আসামির মধ্যে আব্দুল হাই, শফিকুর রহমান, নূর ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম, মুহিবুল্লাহ মুত্তাকীন, আনিসুল ইসলাম মোরসালীন, রফিকুল ইসলাম মিরাজ পলাতক রয়েছেন। একমাত্র আসামি আরিফ হাসান সুমন জামিনে থেকে আদালতে হাজির ছিলেন। তবে এ মামলায় জামিনে থাকলেও রমনা বটমূলে বোমা হামলার মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ হওয়ায় মুফতি হান্নানকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।
আদালতে আসামিপক্ষে আইনজীবী ফারুক আহমেদ ও রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী পিপি সালাউদ্দিন আহমেদ শুনানি করেন।
অভিযোগপত্র
অভিযোগপত্রে বলা হয়, মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মুফতি শফিকুর রহমান। টাইম বোমা বানানোর দায়িত্ব দেয়া হয় মুফতি আব্দুল হান্নানকে। ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু আসামিরা ইসলামের অপব্যাখ্যা করে সিপিবি নেতাদেরকে ‘কাফের’ আখ্যায়িত করেন। আর তাদের নিশ্চিহ্ন করাই ছিল হামলার মূল উদ্দেশ্য।
মূল অভিযোগপত্রের ৩৪ পাতাসহ মোট ১০৯ পাতার মামলার ডায়েরি (কেসডকেট) আদালতে দাখিল করেন তিনি। ৪৬ ধরনের আলামত জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩০ জনকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
এ মামলায় মুফতি মঈন উদ্দিন শেখ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আসামি মশিউর রহমান অপর এক মামলায় স্বীকারোক্তি করে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
মঈন উদ্দীন স্বীকারোক্তিতে বলেন, তিনি মুফতি হান্নানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। মাওলানা আব্দুস সালাম, মাওলানা আব্দুল হাই, শফিকুর রহমান, শেখ ফরিদ, জাহাঙ্গীর বদর ওরফে আবু জান্দাল প্রমুখ জঙ্গিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। ২০০১ সালের ১৯ জানুয়ারি হরকাতুল জিহাদের কার্যালয়ে গেলে তিনি জানতে পারেন, পরের দিন অর্থাত্ ২০ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে সিপিবির জনসভা আছে। সেখানেই সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার সিদ্ধান্ত হয়।
২০০১ সালে সিপিবির ডাকা লাল পতাকার সমাবেশে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। ওই মঞ্চে ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাস, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী সরদার ফজলুল করিম, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর তত্কালীন সভাপতি সৈয়দ হাসান ইমাম, কমিউনিস্ট পার্টির তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ছিলেন।
এ হামলায় খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার সিপিবি নেতা হিমাংশু মণ্ডল, খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার সিপিবি নেতা ও দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা আব্দুল মজিদ, ঢাকার ডেমরা থানার লতিফ বাওয়ানি জুটমিলের শ্রমিক নেতা আবুল হাশেম ও মাদারীপুরের মুক্তার হোসেন ঘটনাস্থলে এবং খুলনা বিএল কলেজের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বিপ্রদাস আহত হয়ে ঢাকা বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ওই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি মারা যান। বোমা হামলায় আহত হন সিপিবির শতাধিক কর্মী।