আত্মস্মৃতি

ছোট জায়গার একজন বড় মাপের মানুষের গল্প

বাবার নাম ছিল সোহারু প্রধান। দাদার (বাবার বাবা) নাম ছিল গবু প্রধান। অথচ নিজের নাম থেকে তিনি ‘প্রধান’ পদবিটা বাদ দিলেন। আবার বড় ছেলের ঘরে প্রথম পুত্র সন্তানের জন্ম হলে তার নাম রাখলেন আবু ইলিয়াস প্রধান। এই ইলিয়াস আমার বন্ধু। এখন সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে পঞ্চগড় জেলার বোদায় বসবাস করছেন। ডাক্তার ইলিয়াসকে বোদার মানুষের না-চেনার কথা নয়। আজ যার কথা, যার পরিবারের কথা লিখব, তিনি হলেন মরহুম সিরাজউদ্দিন আহমেদ, সিরাজ সরকার নামেই যিনি ছোট-বড় সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। তিনি ‘সরকার’ উপাধি কিভাবে পেলেন, তিনি কেমন মানুষ ছিলেন, কেন তাঁকে ও তাঁর পরিবার নিয়ে কিছু বলার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না, সবই সংক্ষেপে বলছি।

সিরাজ সরকারের সঙ্গে আমার পরিচয়ের একাধিক কারণ। প্রথমত ষাটের দশকে বোদা বাজারে আমাদের একটি দোকান ছিল, সেই দোকান ঘরের মালিক ছিলেন তিনি। আমরা, অর্থাত্ আমার ছোট কাকা ছিলেন তাঁর ভাড়াটে। খুব ছোট বয়সেই আমি দোকানে বসতাম। আমার ছাত্রজীবন এবং দোকানদারির জীবন সম্ভবত একসঙ্গেই শুরু হয়েছিল। সেজন্য অন্য পরিচয়ের আগে সিরাজ সরকার আমাকে চিনতেন তাঁর ভাড়াটের ভাতিজা হিসেবে।

দ্বিতীয়ত, তাঁর এক মেয়ে জুলেখা আমার সঙ্গে পড়ত। অত্যন্ত নরম স্বভাবের শান্তশিষ্ট অথচ রূপবতী জুলেখা সঙ্গত কারণেই আমার এবং বলা ভালো অন্য সব বন্ধুরও পছন্দের ছিল।

তৃতীয়ত, সিরাজ সরকারের বড় নাতি ইলিয়াসও ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই আমার বন্ধু হয় এবং বলা যায়, এখনো আমাদের সেই ঘনিষ্ঠতা বজায় আছে। অনেক সুসময়-দুঃসময়ে আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি।

বোদায় আমার দেখা সবচেয়ে বড় পরিবার সিরাজ দাদার। আগে তাঁকে চাচা বললেও ইলিয়াসের কারণে তিনি একসময় আমারও দাদা হয়ে যান। তেমনি তাঁর ছেলেমেয়েরা হয়ে যান চাচা ও ফুফু। জুলেখাকেও ফুফু বলে খেপাতাম।

সিরাজ দাদা চার বিয়ে করেছিলেন। প্রথম স্ত্রীর তিন কন্যা সন্তান। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে চার পুত্র সন্তান। তৃতীয় স্ত্রীর চার ছেলে ও তিন মেয়ে। চতুর্থ স্ত্রীর এক পুত্র ও তিন কন্যা। মোট ছেলেমেয়ের সংখ্যা ১৮ জন। দাদাকে একবার ফাজলামো করে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘সব ছেলেমেয়ের নাম মনে থাকে দাদা?’

এক গাল হাসি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি একটি রেজিমেন্ট চালাই। তাই সবকিছু মনে রাখতে হয়, সবদিকে খেয়াল রাখতে হয়।’

সত্যি অত বড় পরিবারের অভিভাবক হয়ে সবাইকে মানুষ করার পাশাপাশি তিনি যে জনসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন এবং সব দিক অত্যন্ত ভালোভাবে সামাল দিতেন, সেটা খুব সহজ কাজ ছিল না। তাঁর মতো দাপুটে মানুষ আমি কম দেখেছি। অথচ তাঁর চাল-চলন, বেশ-ভূষা ছিল একেবারেই সাধারণ। তাঁর ছিল একটি দরদি মন। শুধু নিজের বিশাল পরিবার নয়, আরো অনেক দরিদ্র পরিবারের অভিভাবক ছিলেন তিনি। কারো কারো সংসারে চাল-ডালের জোগানও দিতেন তিনি। আমি এটা ভালো করে জানি এ কারণে যে, তিনি আমাদের দোকান থেকে মাসকাবারি বাজার করতেন। তাঁর হাতে লেখা স্লিপ দিয়ে কতজনকেই না দরকারি জিনিসপাতি নিতে দেখেছি।

সিরাজ সরকার বোদার আদি বাসিন্দা নন। তবে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার অন্য কোনো জায়গা থেকে বোদার বালাভীড়ে এসে তাঁর বাবা বসতি স্থাপন করেন। বোদা বাজারের বাড়িঘর, জায়গাজমি তাঁর নিজের করা।

সে সময় মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় পরিচিতি নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামানো হতো না। তিনি একজন জনপ্রিয় মানুষ ছিলেন। দুইবার বোদা ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। আমার নিজের ধারণা, তিনি মুসলিম লীগের সমর্থক ছিলেন। তাঁর বয়সী মানুষদের বেশির ভাগই মুসলিম লীগ করতেন। কিন্তু সিরাজ সরকারকে ঝান্ডা হাতে মিছিল-মিটিং করতে দেখিনি কখনো।

জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তাঁকে নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে। যখন যে কাজ করেছেন, নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন। ভালোভাবে করেছেন।

খুব উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন না। সম্ভবত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন। কিন্তু জীবন থেকে পাঠ গ্রহণের অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন একজন মানুষ।

সিরাজউদ্দিন আহমেদ তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন কুচবিহার মহারাজের সেরেস্তায়। তিনি সাইকেল চালিয়ে শিলিগুড়ি গিয়ে মহারাজার সেরেস্তায় কাজ করতেন। সেরেস্তায় যারা কাজ করতেন, তাদের সেরেস্তাদার বলা হতো। কেউ কেউ সেরেস্তাদার কর্মচারী-কর্মকর্তাদের ‘সরকার’ বলে অভিহিত করতেন। মহারাজার সেরেস্তায় কাজের অভিজ্ঞতার কারণে তিনি বোদায় দেবনাথ সাহার জমিদারিতেও একই কাজ পেয়ে যান। আর এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন সিরাজ সরকার।

জমিদারি প্রথা বিলোপের পর তিনি প্রথমে জোতজমি দেখাশোনা করতেন। এমনকি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি কিছুদিন ঠিকাদারিও করেছেন।

সিরাজ সরকার একজন দূরদর্শী ও বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন। বোদা বাজারে অনেক জমিসম্পত্তির মালিক ছিলেন তিনি। জমিতে দোকানের উপযোগী ঘর তুলে সেগুলো ভাড়া দিয়েছিলেন। আবার ভাড়ায় বাসাবাড়ির ব্যবস্থাও বোদায় তিনিই করেছিলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের দোকানদার-ব্যবসায়ীরা দেশত্যাগী হলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটানোর জন্য তিনি পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর ভ্রমণের শখ ছিল। তিনি নোয়াখালী, কুমিল্লা, ঢাকা ইত্যাদি জায়গায় বেড়াতে গেছেন। আর যেখানে গেছেন, সেখান থেকে দু-একজন ব্যবসায়ী মানুষকে বোদায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। বোদা বাজারটি যাতে জমজমাট হয়, সেটাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

একসময় সিদ্দিক মিয়ার বিস্কুটের দোকান ছিল বোদার ‘কফি হাউজ’। সেখানে চা-টোস্ট বিস্কুট খেয়ে আমরা বড় হয়ে উঠেছি। বিস্কুট কোম্পানি বলে পরিচিত ওই দোকানে আড্ডা না দিলে আমাদের অনেকেরই পেটের ভাত হজম হতো না। আমি ঢাকা আসার পরও ওই চা-বিস্কুটের দোকান অনেকদিন চালু ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে বিস্কুট কোম্পানি ছিল মন্ত্রণাকেন্দ্র। ওখানে বসেই কত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়েছে। অনেক স্মৃতিঘেরা বিস্কুট কোম্পানি এখন আর নেই। সিদ্দিক মিয়াও ঢাকায় বসবাস করেন। এই সিদ্দিক মিয়াকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে বোদায় নিয়ে গিয়েছিলেন সিরাজ সরকার। তার বিস্কুটের দোকান ও আবাসিক ব্যবস্থাও হয়েছিল সিরাজ সরকারের ঘরেই।

ঠিক একইভাবে বোদায় জুতা-সেন্ডেল-খরমের প্রথম দোকান যিনি দিয়েছিলেন, সেই ইয়াকুব মিয়াকেও ঢাকার বিক্রমপুর থেকে বোদায় নিয়ে গিয়েছিলেন সিরাজ সরকার। পরে বোদায় আরো যে দুটি পাদুকা ব্যবসার দোকান হয়েছিল, তারাও ইয়াকুব মিয়ার সূত্রেই বোদা গিয়েছিলেন।

সিরাজ সরকার একদিকে যেমন ছিলেন বৈষয়িক বুদ্ধিসম্পন্ন একজন মানুষ, অন্যদিকে বোদার অগ্রগতি-উন্নতির দিকেও তাঁর মনোযোগ ছিল। বিরাট এক সংসার ও পরিবারের কর্তা হিসেবে তাঁর অন্যদিকে সময় দেওয়ার মতো সময় থাকার কথা নয়। কিন্তু ঘর ও পরের মধ্যে তিনি একটি সমন্বয় সাধন করতে পেরেছিলেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কিছুটা ব্যাকফুটে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল না। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থকও ছিলেন না। তবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে বিরোধী ভূমিকা পালন করছেন, তারও কোনো প্রমাণ নেই। বরং দেশত্যাগী হিন্দু সম্প্রদায়ের কারো কারো জীবন ও সম্পদ রক্ষায় তিনি ভূমিকা রেখেছেন বলেই শোনা যায়। তাঁর এক ছেলে শওকত আলী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, এই অভিযোগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গ্রেপ্তারও করেছিল। শওকত ইপিআরে চাকরিরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের সময় পালিয়েছিল বলে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়েছিল যে সে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। শওকতের জন্যই তাঁর বাবাকে জেলে যেতে হয়েছিল।

শওকত আলী তাহলে কী করেছিল, কোথায় গিয়েছিল, সিরাজ সরকারই কিভাবে মুক্তি পেলেন?

সিরাজ সরকারের ৯ পুত্র সন্তানের মধ্যে সবার বড় তসলিমউদ্দিন আহমেদ। আমার বন্ধু ডা. ইলিয়াসের বাবা। সাদাসিধা ধরনের মানুষ ছিলেন। তিনি মূলত গ্রামের বাড়ি বালাভীড়েই থাকতেন। সাইকেলে চেপে নিয়মিত বোদা আসা-যাওয়া করতেন। সে সময় সাইকেলটাই ছিল অনেকেরই প্রধান বাহন। চেয়ারম্যান দাদাও সাইকেলেই চড়তেন। ইলিয়াস বেশ কিছুদিন বালাভীড় থেকে এসে ক্লাস করলেও পরে বোদায় চেয়ারম্যান দাদার বাসায় বসবাস শুরু করে। তসলিম চাচা পেশায় ছিলেন ভেন্ডার বা দলিল লেখক। আগেই বলেছি, তিনি কিছুটা নির্বিরোধ মানুষ ছিলেন। ইলিয়াসের কারণেই সম্ভবত তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। প্রথম দিকে তিনি আমাকে ‘বাউ’ বলে সম্বোধন করতেন। আমাদের এলাকায় ছোট ছেলেদের ‘বাউ’ আর মেয়েদের ‘মাই’ বলে ডাকা হতো। এখনো তাই বলে কি না আমি জানি না। ক্লাস এইটে পড়ার সময় থেকে সম্ভবত আমি ‘বাউ’ থেকে আমার আসল নামে প্রমোশন পেয়েছিলাম তসলিম চাচার কাছে।

সিরাজ দাদার দ্বিতীয় পুত্র ডা. ফয়জুল করিম। সেসময় বোদায় এলএমএফ পাস করা যে কজন ডাক্তার ছিলেন, তারমধ্যে ফয়জুল চাচা অন্যতম। তিনি নানা ধরনের গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি বোদার একজন নামকরা ফুটবল প্লেয়ার ছিলেন। আমরাও তাঁকে মাঠে নামতে দেখেছি। ডাক্তার চাচা অত্যন্ত সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। মানুষের সঙ্গে মেলামেশার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর। সহজেই কাউকে আপন করে নিতে পারতেন। এই গুণের কারণেই হয়তো তিনি বোদা ইউনিয়ন পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। চিকিত্সক হিসেবেও তাঁর মোটামুটি সুনাম ছিল। নিজের ডিসপেনসারিতে বসা ছাড়াও সাইকেল চালিয়ে অনেকের বাড়িতে গিয়েও চিকিত্সা সেবা দিয়েছেন। আমি নিজেও বালকবেলায় জ্বরজারি হলে তাঁর ওষুধ খেয়েছি। শিশিতে দাগ কেটে লাল মিকশ্চারের কথা এখনো মনে আছে। ছয় দাগ ওষুধ খেলেই রোগ শেষ। একবার তাড়াতাড়ি ভালো হওয়ার জন্য এক শিশি ওষুধ এক ঢোকে খেয়ে নিয়েছিলাম। তারপর কিছুটা বিরূপ শারীরিক প্রতিক্রিয়া হওয়ায় ডাক্তার চাচার বকুনি খেয়েছিলাম। এছাড়াও দু-একবার তাঁর বকাবাদ্য শুনতে হয়েছে বাজারে বেশি সময় ঘোরাঘুরি করা ও আড্ডা দেওয়ার জন্য। তখনকার দিনে অভিভাবক স্থানীয়রা শুধু নিজের ছেলেমেয়েদেরই শাসন ও নজরদারিতে রাখতেন না, অন্যদেরও একইভাবে দেখতেন। কাজেই ইলিয়াসের চাচা হিসেবে ইলিয়াস কী করে, কোথায় যায়, তার খোঁজখবর যেমন তিনি রাখতেন, তেমনি ওর বন্ধু হিসেবে আমার গতিবিধিও তাঁর নজরের বাইরে থাকত না। তাছাড়া আমার বাবার সঙ্গেও ডাক্তার চাচার ছিল ভাইয়ের মতো সম্পর্ক।

ডাক্তার চাচার বড় ছেলে মশিয়ার রহমানও খুব ভালো মানুষ। ওর অমায়িক আচারব্যবহার সবাকেই মুগ্ধ করে। মশিয়ার ভালো ছাত্র ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে প্রথম শ্রেণিতে মাস্টার্স করেছে। এখন পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনে (PKSF) উচ্চপদে চাকরি করছে। সদা হাসিখুশি মশিয়ারের সঙ্গে ছোট-বড় সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে। ওর অন্য ভাইবোনদের সম্পর্কে আমি অবশ্য তেমন কিছু জানি না। শুনেছি ওর ছোট দুই ভাইও চাকরিজীবী।

সিরাজ দাদার তৃতীয় পুত্র মুসলেমউদ্দিন আহমেদ। তিনিও ছিলেন নরমশরম প্রকৃতির একজন মানুষ। বিএসসি পাস করে বোদা গার্লস স্কুলে আজীবন শিক্ষকতা করেছেন। একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও দাপুটে বাবার সন্তান হয়েও মুসেলম চাচারা ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রমী স্বভাবের মানুষ। ‘দাপট’ বলে যে শব্দটা আজকাল বহুল ব্যবহূত, আমরা ছোটবেলায় এটা তেমন কাউকে দেখাতে দেখিনি। সিরাজ দাদার ছেলেরা সবাই যদি পিতৃপরিচয়ের দাপট দেখাতেন, তাহলে এলাকাবাসীর খবর ছিল। কিন্তু তাঁরা হেঁটে গেলে মাটিও টের পেতনা। মুসলেম চাচার বেলায় সেটা ছিল শতভাগ সত্য। তার পরের ভাই গিয়াসউদ্দিন আহমেদ। তিনি আবার বোদায় থাকতেন না। তিনি বাড়ি করেছিলেন আটোয়ারী থানার ভুজারিপাড়ায়। এখন ভুজারীপাড়া বোদা পৌর সভার মধ্যে পড়েছে। গিয়াস চাচাও খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন। পারলে মানুষের উপকার করতেন। তিনি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় মায়ের এই চার ভাইয়ের পর তৃতীয় মায়ের বড় ছেলে হলেন শওকত আলী। শওকত চাচা ছিলেন ভাইদের মধ্যে একটু আলাদা। কিছুটা ভবঘুরে টাইপের। পড়াশোনা ও বাধাধরা জীবন তার ভালো লাগত না। যাত্রাদলেও যোগ দিয়েছিলেন।

সিরাজউদ্দিন সাহেবের ছেলেদের মধ্যে শওকত আলী ছিল একটু বাউণ্ডুলে স্বভাবের। বাড়িতে তার বেশি মন বসত না। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় সম্ভবত ও প্রথম বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। এই বাড়ি-পালানোর অভ্যাস তার বেশ কয়েক বছর ছিল। বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে পাকিস্তান আমলে ইপিআর-এ যোগ দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানিরা ধরে নিয়েছিল যে শওকত মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। তাঁকে খুঁজে না পেয়ে সিরাজ সরকার সাহেবকেই পাকিস্তানিরা গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। পরে অবশ্য ডা. ফয়জুল চাচা শওকতকে খুঁজে ধরে এনে থানায় সোপর্দ করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পিতা-পুত্র একসঙ্গে মুক্তি পান।

শওকত দিনাজপুর গিয়ে বিয়েও করেছিলেন পালিয়ে। সে বিয়েও তাঁর বাবা সহজে মেনে নেননি। শওকত ভালো ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। বিভিন্ন দলের হয়ে বিভিন্ন জায়গায় খেলতে যেতে হতো তাঁকে। শওকত সংসারী হয়ে ওঠার পর আর দীর্ঘ জীবন পাননি। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর অকাল মৃত্যু হয়।

সিরাজ দাদার তৃতীয় পক্ষের শওকত ছাড়াও আরো তিন ছেলে আছেন। এঁরা হলেন সুলতান মোহাম্মদ, মো. শাহজাহান ডাব্লিউ ও শফিকুল আলম দোলন। তাদের তিন বোন। রিজিয়া খাতুন, তৈয়বা খাতুন ও তুলি বেগম।

সিরাজ দাদার চতুর্থ স্ত্রীর ঘরের এক পুত্র আমিনুর রহমান এবং তিন কন্যা শামসুন্নাহার, জীবুন্নাহার ও জুলেখা। এই পরিবারের ছোট সন্তানদের মধ্যে ডাব্লিউ এখন লন্ডনে আছেন। ডাব্লিউ কমিউনিস্ট পার্টির বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন। কম্পিউটার বিজ্ঞানে ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে কিছুদিন পর লন্ডনে চলে যান এবং এখনো সেখানেই আছেন। দোলন এখন বোদায় ‘সূচনা’ নামের একটি এনজিওর নির্বাহী প্রধান। আমিনুর বোদায় কাপড়ের ব্যবসা করেন। আমিনুরও একসময় ফুটবল খেলে নাম করেছিলেন।

মেয়েদের ব্যাপারে তেমন খোঁজখবর আমি জানি না। রিজিয়া ফুফু শিক্ষকতা করতেন। পরের খবর জানি না। জুলেখা আমার সঙ্গে পড়লেও কত বছর ধরে তার কোনো খবর রাখি না।

সিরাজ দাদা যে একজন দরদি মনের মানুষ ছিলেন সেটা আগেই বলেছে। নিজের পরিবারের বাইরেও বহু পরিবারের তিনি অভিভাবক ছিলেন। পরোপকার ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। কত মানুষ যে কতভাবে তাঁকে দিয়ে উপকৃত হয়েছেন, তাঁর তথ্য এখন হয়তো অনেকেরই অজানা।

তিনি ছিলেন মুসলিম লীগ রাজনীতির সমর্থক ছিলেন, কিন্তু তাঁর মধ্যে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ছিল না। তিনি নিজের বড় ছেলে তসলিম চাচার সঙ্গে বালাভীড়ের প্রফুল্ল ঘোষের ‘সখি’ পাতিয়ে দিয়েছিলেন ধুমধাম করে, আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে। তসলিম চাচা ও প্রফুল্ল বাবু (আমার বোনের শ্বশুর) পরস্পরকে ‘সখি’ বলেই সম্বোধন করতেন।

এই পরিবারের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার বড় যোগসূত্র বন্ধু ইলিয়াস।

আমাদের সময় বোদায় বাম রাজনীতির প্রভাব ছিল বেশি। যারা স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করতেন, অর্থাত্ ছাত্র, তাদের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী-সমর্থক ছিলেন বেশি। ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থক ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন।

একটা বিষয় ছিল লক্ষ করার মতো। বাবা করেন মুসলিম লীগ, অথচ ছেলে করেন ছাত্র ইউনিয়ন। বাবা আপত্তি করেননি। প্রসঙ্গত একটি তথ্য উল্লেখ না করলেই নয়। আমাদের স্কুলের একজন শিক্ষক শ্রদ্ধেয় আইনুদ্দিন স্যার জামায়াতের রাজনীতি করতেন। তাঁর পাঞ্জাবির পকেটে সবসময় মওদুদীর বই থাকত। আইনুদ্দিন স্যারের দুই ছেলে মুসা ও ঈশা আমাদের সঙ্গে পড়ত। তারা আমার কারণে ছাত্র ইউনিয়নও করত। স্যার একদিন আফসোস করে বলেছিলেন, ‘কী করলাম, নিজ হাতে সব কমিউনিস্ট তৈরি করলাম!’

ছাত্র ইউনিয়নের প্রভাব কিভাবে এতটা হয়েছিল? আমার ধারণা, তেভাগা আন্দোলনের একটা ইতিবাচক প্রভাব ছাত্র-তরুণদের মধ্যে পড়েছিল। আর ষাটের দশকের শুরু থেকে ছাত্র ইউনিয়ন হওয়ার কারণ এলাকার কৃতী সন্তান মোহাম্মদ ফরহাদ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। অল্প বয়সে তিনি নিজে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। এমনকি ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম হওয়ার আগেই তিনি মহান ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, জেলে গিয়েছিলেন। সংগঠন করার ছিল তাঁর অসাধারণ দক্ষতা। ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পর দ্রুততম সময়ে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলায় ছাত্র ইউনিয়ন এক নম্বর সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। এটা সম্ভব হয়েছিল মোহাম্মদ ফরহাদের সাংগঠনিক দক্ষতার কারণেই। আমাদের কাছে তিনি ‘বাদল ভাই’ নামেই পরিচিত ছিলেন।

আমি একেবারে ছোটবেলাতেই ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। আমার কারণে আমার সহপাঠী বন্ধুরাও প্রায় সবাই ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এভাবেই সিরাজ সরকারের বড় নাতি ইলিয়াসও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হয়ে যায়। তার বাড়িতে রাজনীতি প্রবেশ করছে, সেটা দেখেও তিনি বাধা দেননি। সিরাজ দাদা নিজে প্রগতিশীল ধারার মানুষ ছিলেন না, কিন্তু প্রগতির চিন্তার পথে তিনি কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াননি। সবকিছু গ্রহণ করার ক্ষমতা তাঁর ছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন বলে আমার মনে হয় না। আবার তাঁকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির উপকার ছাড়া কোনো অপকারও হয়নি।

একাত্তরে বোদা হানাদারমুক্ত হয়েছিল ১ ডিসেম্বর। ঢাকায় আত্মসমর্পণের ১৫ দিন আগেই। আমি ভারত থেকে বোদায় চলে আসি ডিসেম্বরের ২ তারিখে। সে কাহিনি আলাদা একসময় বলব। বোদায় এসে আমি আশ্রয় নিই ইলিয়াসের কাছে। কারণ আমাদের বাড়িঘর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইলিয়াস আর চেয়ারম্যান দাদার এক ছেলে আমিনুর তখন তাদের মূল বাড়ির বাইরের ঘরে থাকত। আমিও এসে ওখানে জুড়ে গেলাম। থাকা-খাওয়া ফ্রি। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পনের খবর ইলিয়াস ও আমি রেডিওতে শুনেছিলাম ওই ঘরে একসঙ্গে বসেই। ইলিয়াস ডাক্তারি পাস করে চাকরি শুরু করল। কাছাকাছি হওয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বে কখনো ফাটল ধরেনি। বরং আমরা পরস্পর কাছে থাকার চেষ্টা করেছি আমাদের কিছু কিছু ‘আনন্দ বেদনা মিলন বিরহ সংকটে’।

মুক্তিযুদ্ধের অল্প কিছু পরই আমি ঢাকা চলে আসি। বোদায় যেসব পরিবার ও মানুষের সঙ্গে আমার সখ্য ছিল, সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই আলগা হয়ে যেতে থাকে। শুনেছি, চেয়ারম্যান দাদা, একসময় বোদার সবচেয়ে দাপুটে মানুষটি ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন।

আগে যেসব সামাজিক কাজকর্ম করতেন, সেগুলোও হয়তো কমিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ঘটকালিতে পারদর্শী ছিলেন। কারো কারো বিয়েতে ‘উকিল শ্বশুর’ও হয়েছেন। দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁয়ে তাঁর একাধিক জামাই ছিলেন প্রথিতযশা আইনজীবী। এদের দিয়ে পরিচিত অনেকের মামলামোকদ্দমায়ও সহযোগিতা করেছেন। ১৯৭৬ সালে তিনি আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি অনেক কিছুই রেখে গেছেন। তবে তার বংশধরেরা কেউ বোধহয় তাঁর জায়গায় যেতে পারেননি। তিনি যেভাবে অনেককে হাত ধরে পথ চিনিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন, সেরকম আর কেউ করবে না। তাঁর উত্তরাধিকারেরা কি তাঁর স্মরণে বোদায় কিছু একটা করতে পারেন না? সক্ষমতা আছে। দরকার আন্তরিকতা ও যথাযথ পরিকল্পনা।

সিরাজউদ্দিন সরকার, বোদার এক সময়ের মহীরুহ, যার ছায়ায়-মায়ায় অনেকে বেড়ে উঠেছেন, তাঁর প্রতি আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। v