সার্ক উন্নয়ন ব্যাংক দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাবনা
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০১৪, ১৯:২২
ব্রিকস ব্যাংকের সফল যাত্রার পর এবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে উদ্যোগী হয়েছে এ অঞ্চলের দেশগুলো। মূলত: ব্রিকস ব্যাংক-এ ক্ষেত্রে সবার মধ্যে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠার উদ্যম সৃষ্টি করেছে। ব্রিকস ব্যাংক-এর আদলে এবার সার্কভুক্ত দেশগুলোও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে মনোযোগী হয়েছে। এরই অংশ হিসাবে সার্ক অঞ্চলে দেশি মুদ্রার মাধ্যমে বাণিজ্যের প্রস্তাবে একমত হয়েছে সদস্য রাষ্ট্রগুলো। এর পাশাপাশি বাণিজ্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধিতে একটি আঞ্চলিক ব্যাংক গঠনে শুরু হয়েছে ব্যাপক তোড়জোড়। সম্প্রতি ভুটানের থিম্পুতে অনুষ্ঠিত হয়েছে সার্কের বাণিজ্যমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক। আর সেই বৈঠকে এ বিষয়গুলো বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। বর্তমানে সার্কের নেতৃত্বে রয়েছে ভারত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকারী দেশ হিসাবে ভারত এই মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। পাশ্চাত্য এবং এশিয়ায় ভারতের এই উজ্জ্বল অবস্থানকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই।
ভুটানের থিম্পুতে অনুষ্ঠিত সার্কভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্যমন্ত্রীদের বৈঠকের আরো অনেক আগে থেকেই এতদঅঞ্চলের দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে দেশগুলোর অর্থনৈতিক সামাজিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং উন্নয়নের ব্যাপারে বিশেষ তাগিদ অনুভব করছিলেন দেশগুলোর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে আমলা, রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ। থিম্পু বৈঠকে সেই তাগিদেরই প্রকাশ ঘটেছে সার্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে। এই বৈঠকে উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে দেশগুলো। আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন সার্ক ব্যাংক, জানানো হয়েছে বৈঠকে নেপালের বাণিজ্য ও সরবরাহমন্ত্রী সুনীল বাহাদুর থাপা সম্প্রতি বলেছেন, সার্ক উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়টি দ্রুততার সাথে এগিয়ে চলেছে। ভুটানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সার্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলো সার্ক অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে আলোচনা হবে।
বর্তমানে ভারত ও ভুটান নিজস্ব মুদ্রার মাধ্যমে পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করছে। সার্কের অন্য দেশগুলোও তাদের মতো একই পথে হাঁটলে এ অঞ্চলে ডলার বা ইউরোর মতো শক্তিশালী বিদেশি মুদ্রার প্রচলন কমে আসবে। এতে বিশ্ববাজারে মুদ্রার দামের তারতম্যের কারণে এ অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমবে । তবে এটি বাস্তবায়ন করতে গেলে সার্কভুক্ত প্রতিটি দেশে অন্যান্য দেশের মুদ্রার মজুদ রাখতে হবে। ভুটানে অনুষ্ঠিত বাণিজ্যমন্ত্রীদের সাম্প্রতিক বৈঠকে দেশি মুদ্রার মাধ্যমে বাণিজ্য পরিচালনের প্রস্তাব এসেছে। সদস্য দেশগুলোও এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছে। বিষয়টি নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অর্থমন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করবে। সার্কের অর্থমন্ত্রী পর্যায়ের আগামী বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে মূল আলোচনা হবে বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা ও সার্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে সার্ক চেম্বার অব কমার্স একটি উপস্থাপনা বা প্রেজেন্টেশন দিয়েছে। এটি এখনও সম্পূর্ণ প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এ জন্য অনেক কাজ করতে হবে দেশগুলোকে।
সার্কভুক্ত দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সার্ক উন্নয়ন তহবিল। সার্ক ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (এসডিএফ) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ৩০০ মিলিয়ন ডলারে। এর মাধ্যমে সার্ক দেশগুলোর অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয়। এ তহবিলে ভারতের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি। যার পরিমাণ ১৮৯ মিলিয়ন ডলার। বিদ্যমান এসডিএফ বেশকিছু বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে সার্কভুক্ত দেশগুলোয় উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তা বাস্তব চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করছে সদস্য রাষ্ট্রগুলো। এ কারণেই তাই সার্ক ব্যাংক গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ অতিদ্রুত সুফল বয়ে আনতে পারে। এক্ষেত্রে সার্ক উন্নয়ন ব্যাংক সকল উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে। এক্ষেত্রে আরো বলা যায়, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি জলবিদ্যুত্সহ অন্যান্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রকল্পে অর্থসংস্থান করতে পারবে সার্ক ব্যাংক। এ ব্যাংক দক্ষিণ এশিয়ার অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্য সহজ করবে। এটা আঞ্চলিক সমন্বয়ের পূর্বশর্ত। তবে চূড়ান্ত পরিকল্পনা এবং এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে অংশীদার দেশগুলোর সরকারের মনোভাব ও সহযোগিতার ওপর। বর্তমানে সার্ক ডেভেলপমেন্ট ফোরামের মাধ্যমে সার্কভুক্ত দেশগুলোয় বেশ কিছু উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সার্ক ডেভেলপমেন্ট ফোরামের অনুমোদিত মূলধন ১০০ কোটি ডলার এবং পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি ডলার। সামাজিক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে এ অর্থ খরচ করার কথা রয়েছে। তবে এ পর্যন্ত শুধু সামাজিক খাতেই অর্থায়ন করতে পেরেছে সার্ক ডেভেলপমেন্ট ফোরাম। বাকি দুটি খাতকে গতিশীল করতে এরই মধ্যে জনবল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সার্ক উন্নয়ন ব্যাংক গঠিত হলে সার্ক ডেভেলপমেন্ট ফোরাম ব্যাংকের আওতায় আসবে। আর এ কারণেই এই ফোরামকে গতিশীল করা হচ্ছে। ওদিকে চীন ইতিমধ্যেই এশিয়া ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগদানের জন্য এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশকে আহ্বান জানিয়েছে। এর মাধ্যমে চীন এশিয়া অঞ্চলে তার রফতানি বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ খুঁজছে নিঃসন্দেহে বলা যায়। ভারত,বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই চীনের উদ্যোগে গঠিত এশিয়া ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগদানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ব্রিকস ব্যাংক গঠন বিশ্ব অর্থনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো এতোদিন অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, আইএসএফ, জাইকা প্রভৃতির সাহায্য, অনুদান, ঋণের ওপর নির্ভরশীল থেকেছে। সড়ক যোগাযোগ, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন থেকে শুরু করে বড় বড় সেতু নির্মাণ, বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন, বিদ্যুত্ সঞ্চালন, গ্রীডলাইন স্থাপন, স্বাস্থ্য-শিক্ষাখাতের উন্নয়ন প্রভৃতি কাজে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল থাকায় তাদের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক চলতে হয়েছে। প্রায় ক্ষেত্রে বিদেশি বিশেষজ্ঞ, পরামর্শদাতা, প্রকৌশলী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেতন ও সম্মানি বাবদ প্রাপ্ত ঋণ, সাহায্য, অনুদানের সিংহভাগ অংশ ব্যয় হতো। এ ক্ষেত্রে দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোলা ছিল না। বর্তমানে বাংলাদেশ এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হতে চাইছে; কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের ওপারে মায়ানমারের আরাকান হয়ে এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে সন্দেহ নেই। রেলপথ ও সড়ক পথে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্তি, ভারত, নেপাল, ভুটান থেকে বিদ্যুত্ আমদানির জন্য বৃহত্ সঞ্চালন গ্রীডলাইন স্থাপন, আধুনিক সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, প্রভৃতি কাজগুলোর জন্য বাংলাদেশের যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন তা সার্ক উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ঋণ হিসাবে পাওয়া গেলে খুব দ্রুত উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যেতে পারবো আমরা।