ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাফল্য
আখ চাষ সম্প্রসারণ হচ্ছে পাহাড়ী এলাকায়
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০১৪, ১৯:২২
মেধা শক্তি বিকাশে চিনির বিকল্প নেই। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে— মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ও উপযুক্ত কার্যক্ষমতার জন্য মাথাপিছু বছরে ১৩ কেজি হারে চিনি গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর দেশের বৃহত্ জনগোষ্ঠির চিনির চাহিদা মেটাতে ঈশ্বরদীস্থ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন যাবত্ গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএসআরআই এ যাবত্ ৪১টি ইক্ষু জাত উদ্ভাবন করেছে। এই জাতসমূহ দেশের চিনিকল এলাকার প্রায় ৯৯% এবং চিনিকল বহির্ভূত গুড় এলাকায় প্রায় ৫৭% এলাকা জুড়ে চাষাবাদ হচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য প্রযুক্তির সাথে আখের সাথে সাথী ফসল হিসেবে ৩০টিরও বেশি প্রযুক্তি প্যাকেজ সুপারিশ করা হয়েছে। বিগত সাড়ে চার বছরে কয়েকটি উন্নত ইক্ষুর জাত উদ্ভাবন করা হয়। যার মধ্যে ঈশ্বরদী-৩৯ এবং ঈশ্বরদী-৪০ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই জাতসমূহের গড় ইক্ষুর ফলন হেক্টরপ্রতি ১০০ টনের বেশি এবং আখে চিনির পরিমাণ ১২%-এর বেশি। এই জাত দুটো বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থায় বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় চাষাবাদ উপযোগী। এছাড়া বিএসআরআই আখ-৪১ জাতটি চিনি ছাড়াও গুড়, রস তৈরি এবং চিবিয়ে খাওয়ার জন্য বিশেষ উপযোগী। গড় ফলনও হেক্টরপ্রতি ১৫০ টনের ঊর্ধ্বে। দেশের চিনি ও গুড়ের চাহিদা পূরণকল্পে বর্তমান সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ আগ্রহে আখের পাশাপাশি সুগারবিট ব্যবহার করে চিনি উত্পাদন করার লক্ষ্যে ট্রপিক্যাল সুগারবিট উত্পাদন প্রযুক্তির সুপারিশ করে এবং সুগারবিট হতে গুড় উত্পাদন প্রযুক্তি ও পাল্প থেকে বায়োগ্যাস উত্পাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এছাড়া পার্বত্য এলাকায় আখ চাষ সম্প্রসারণের ফলে এই ইনস্টিটিউটের অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বিগত সাড়ে চার বছরের মধ্যে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি এবং বান্দরবান জেলায় সম্প্রসারিত হয়ে এখন ২,৪৫০ হেক্টর জমিতে আবাদ হচ্ছে বলে জানা গেছে। এই প্রকল্পের অধীনে উল্লেখিত তিনটি জেলায় সাব-স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পের পরিচালক ড. এস ইউ কে ইউসুফ জাই জানান, এখানে চিবিয়ে খাওয়ার ঈশ্বরদী-৪১, রংবিলাস, চায়না ও ভিসিএম জাতের আখ চাষ হচ্ছে। বিঘাপ্রতি কমপক্ষে ৩০ হাজার আখ উত্পাদন হচ্ছে যা অন্য কোন ফসল উত্পাদন করে অর্জন করা সম্ভব নয়।
একজন মানুষের বছরে ১৩ কেজি চিনির প্রয়োজন। জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার পর্যালোচনা করলে ২০২১ সালে ১৭ কোটি ৮৬ লাখ মানুষের জন্য দরকার হবে ২৩ লাখ টন চিনি ও গুড়। এই বিরাট চাহিদার বিপরীতে ১৫টি চিনিকলে বছরে ২ লাখ ১০ হাজার টন আখ মাড়াই করে মাড়াই মৌসুমে মাত্র ৬৯ হাজার ৩০৮ টন চিনি উত্পাদিত হচ্ছে। বাকি চিনির প্রয়োজন বিদেশ থেকে আমদানি করে মেটানো হয়। কেবলমাত্র আখ ব্যবহার করে উত্পাদিত চিনি দ্বারা দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। উপরন্তু আখ দীর্ঘমেয়াদী ফসল হওয়ায় আখ চাষের পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। কারণ কৃষকরা অন্যান্য স্বল্পমেয়াদী ফসল উত্পাদনে বেশি আগ্রহী। এই অবস্থায় দেশের চিনির চাহিদা পূরণ এবং চিনিকলগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য বিকল্প উত্স ‘সুগারবিট’ ব্যবহার করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উপর বিএসআরআই-এর বিজ্ঞানীরা ২০০২-২০০৩ মৌসুম থেকেই গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। জানা যায়, দেশের চিনিশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বর্তমান সরকারের কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সুগারবিট ব্যবহার করে চিনি উত্পাদনের উপর গুরুত্বারোপ করেন। নির্দেশনা অনুযায়ী বিএসআরআই ২০১১-২০১২ মৌসুম থেকেই বাংলাদেশে সুগারবিট চাষাবাদ প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করে গবেষণায় ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে বলে জানা গেছে। এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক বিজ্ঞানী ড. খলিলুর রহমান জানান, ২০১৪ সালে প্রকল্পটি বাংলাদেশে ট্রপিক্যাল সুগারবিট উত্পাদনের প্রযুক্তি প্যাকেজ প্রণয়নের কাজটি সফলভাবে সম্পাদন করে বাণিজ্যিকভাবে এ ফসলটি উত্পাদনের মাধ্যমে দেশের চিনির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।