কম্বোডিয়ার শ্রমশক্তি চলে যাচ্ছে থাইল্যান্ডে!
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০১৪, ১৯:২৩
দূর থেকে দেখলে পউ প্লাং গ্রামটি কম্বোডিয়ার অন্য দশটি গ্রামের মতোই। সবদিকেই ধানক্ষেত, ধূলিময় রাস্তা এবং বাড়িগুলো সব কাঠের। কিন্তু একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই সিম রিপ প্রদেশের এ গ্রামটির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যটি উঠে আসে। পউ প্লাং গ্রামে সুস্থ-সবল শ্রমিক পাওয়াই দায়। এরা সবাই চলে যায় প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডে। গতমাসের গোড়ায় গণ-বহিষ্কারের আগ পর্যন্ত এ গ্রামের এক-চতুর্থাংশ লোকই কাজ করত থাইল্যান্ডে। সেখানকার কাজের প্রাচুর্য কম্বোডীয়দের কাছে টানে চুম্বকের মতো। এ প্রসঙ্গে গ্রামপ্রধান চউন রথ বলছিলেন, ‘কম্বোডিয়ায় আমরা সবাইকে কাজ দিতে পারি না। যাদেরকে দিতে পারি, তাদেরকে পর্যাপ্ত বেতন দিতে পারি না। কিন্তু কম্বোডিয়ার অধিকাংশ লোকই খুব গরীব। তারা পরিবারের খাওয়া-পরা ঠিকভাবে চালাতে পারে না। সেজন্যই তারা বিদেশে চলে যায় কাজ করতে, যাতে করে দেশে অর্থ পাঠাতে পারে। আগে বাবা-মা সন্তানদের সেবাযত্ন করতো, কিন্তু এখন সে কাজটি আমরা দাদা-দাদীরা করি। আমাদের গ্রামে বুড়োবুড়ি ও শিশুরাই কেবল পড়ে রয়েছি।
বর্তমান সামরিক সরকার অবৈধ অভিবাসী শ্রমিকদের উপর দমন-পীড়ন চালাবে, সম্প্রতি এমন গুজব ছড়িয়ে পড়াতে কমপক্ষে ২ লাখ ২৫ হাজার লোক থাইল্যান্ড থেকে কম্বোডিয়ায় ফেরত এসেছে। পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হলে তারা আবার ফেরত যেতে চায়। তবে কয়েক লাখ অবৈধ শ্রমিক সব হুমকি উপেক্ষা করে এখন পর্যন্ত থাইল্যান্ডে অবস্থান করছে। সেখানকার অনানুষ্ঠানিক কাজ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, তা সত্ত্বেও তুলনামূলকভাবে অধিক মজুরির লোভে পঙ্গপালের মতো ছুটে যায় কম্বোডীয় শ্রমিকরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তারা যে দালালের মাধ্যমে পাচার হয়, তাদের হাতে তুলে দিতে হয় মজুরির একটা অংশ। মাছ ধরার নৌকাগুলোয় আধুনিক দাসের জীবনযাপন করছে কম্বোডীয় শ্রমিকরা, এমন খবর মিডিয়ায় আসে প্রায়ই। নির্মাণ সাইটগুলোতে যারা কাজ করে, তারা অপেক্ষাকৃত ভাল থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্যানুসারে থাইল্যান্ডে লোক কেনাবেচা হয় অবাধে। বেশিরভাগ লোককেই যে কাজের কথা বলে নিয়ে আসা হয়, সে কাজ তাকে দেয়া হয় না। কম্বোডিয়া থেকে অবৈধভাবে আসা শ্রমিকদের বড় অংশই মাছ ধরে কিংবা মত্স্য-সংশ্লিষ্ট শিল্পে কাজ করে। অনেকে বেছে নেয় নিম্ন মজুরিতে পোশাক তৈরি কিংবা গৃহস্থালীর কাজ। কম্বোডিয়া থেকে আসা তরুণীদের দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যায় মাঝেমধ্যেই। এতসব ঝুঁকি সত্ত্বেও কম্বোডীয়রা ঠিকই বাজি ধরছে। রথ পউ প্লাং গ্রামে বসবাস করছেন ১৯৭৯ সালে খেমাররুজদের পতনের সময় থেকে। পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার চেষ্টা করছেন তিনি। অসহায়ভাবে প্রতিবছরই প্রত্যক্ষ করছেন, লোকজন দলে দলে গ্রাম ছেড়ে যাচ্ছে থাইল্যান্ডে চাকুরি নেয়ার আশায়। ৭১ বছর বয়স্ক রথকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনার গ্রামের কতজন লোক বাইরে কাজ করছে। প্রশ্ন শোনার পর ঘরের ভেতর থেকে একটি রেকর্ড বই নিয়ে এসে দেখিয়ে দেন, ২০০টি পরিবারের ১,০১৮ জন লোকের বাস তাঁর গ্রামে। এরমধ্যে ২৬৩ জন থাইল্যান্ডে কাজ করছে। এদের কারোরই পাসপোর্ট নেই। পউ প্লাং গ্রাম থেকে লোকদের অধিকাংশই দেশে অর্থ পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে ২০ শতাংশ লোক অসফল। তারা দালাল ও বসদের প্রতারণার শিকার। এছাড়া মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। ৬৭ বছর বয়স্ক ভা সউর কাঁদতে কাঁদতে জানান, তাঁর ৩৯ বছর বয়সী পুত্র গতবছর নির্মাণ সাইট থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায়। সে দশ বছর ধরে থাইল্যান্ডে কাজ করছিল। সউর পউ প্লাং গ্রামে বাস করছেন তিন দশক ধরে। তাঁর তিন ছেলের সবাই কোন না কোন সময়ে থাইল্যান্ডে কাজ করেছে। একজন এখনো রয়েছে সেখানে। মেয়ে বছর তিন আগে থাইল্যান্ড থেকে ফিরে আসলেও এখন গ্রামে থাকছে না, অভিবাসিত হয়েছে পাশের রাজ্যে।
কম্বোডিয়ার ঠিক কত লোক অবৈধভাবে থাইল্যান্ডে কাজ করছে, এ সংখ্যাটা কারোরই জানা নেই। তবে কম্বোডীয় সরকার জানিয়েছে, তাদের আনুমানিক সাড়ে চার লাখ লোক অবৈধভাবে সেখানে কাজ করছে আর বৈধ চাকুরের সংখ্যা ৯০ হাজার। কম্বোডিয়ার লোকজন বৈধর চেয়ে অবৈধভাবেই বেশি যেতে চায় থাইল্যান্ডে। আইএলও এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বের করেছে, বৈধভাবে যাওয়ার জন্য খরচ পড়ে ৭০০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বাথ; কিন্তু অবৈধভাবে যাওয়া যায় মাত্র ১০০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বাথ খরচ করে। এ সুযোগটাই ধরছে তরুণ-তরুণীরা। কম্বোডিয়ার ওয়ার্কফোর্সে প্রতিবছর আড়াই লাখেরও বেশি লোক যুক্ত হয়। দুর্বল চাকরির বাজারের কারণে তরুণ-তরুণীদের একটা বড় অংশের কাছে থাইল্যান্ড সেরা অপশন হয়ে দাঁড়ায়। কারো কারো সামনে এছাড়া কোনো উপায়ই থাকে না। তাই বাধ্য হয়ে বেছে নেয় সীমান্ত পাড়ি দেয়ার পথ। তবে সেখানে যাওয়ার পর প্রত্যাশা অনুযায়ী পাঠাতে পারে না রেমিটেন্স। স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় কেউ কেউ ফেরতও আসে এবং অন্যদের যেতে অনুত্সাহিত করে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয় না। কম্বোডীয়দের স্রোত বইছে যেনো থাইল্যান্ডের পানে।
—আল জাজিরা ওয়েবসাইট অনুসরণে