তোবা গ্রুপের পাঁচটি কারখানা বন্ধের পর বিপাকে শ্রমিকরা
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০১৪, ২২:৪৪
এখন কী করবে তোবা গ্রুপের ৫ কারখানার দেড় হাজার শ্রমিক? এতদিন প্রাপ্য বেতনের জন্য আন্দোলন করলেও এখন কাজের সংস্থান করতে নতুন লড়াই করতে হচ্ছে তাদের।
শ্রমিক সংগঠনের নেতা এবং তোবা’র শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দুই একজন ছাড়া বাদবাকী শ্রমিকরা এখনো নতুন করে কাজের সংস্থান করতে পারেননি। অনেক শ্রমিক ঢাকার জীবনযাত্রার ব্যয়ভার নির্বাহ করতে না পেরে গ্রামে বাড়িতে চলে গেছেন, নতুন করে কাজের সংস্থান হলে আবার ঢাকায় আসবেন।
হঠাত্ নোটিস টানিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেয়ায় এই কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা শ্রমিকদের সার্ভিস বেনিফিটসহ অন্যান্য পাওনাদি অনিশ্চিত হয়ে গেছে। মালিক পক্ষের সংগঠন বিজিএমইএ’র একাধিক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বর্তমান বাস্তবতায় কারখানাগুলো আর চালু হচ্ছে না। কারখানাটি ১৩ (১) ধারা অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের নোটিস দেয়া হয়েছে। নোটিসে বলা হয়েছে, বন্ধের ঘোষণা জুনের ১০ তারিখ থেকে কার্যকর হবে। সেই বিবেচনায় শ্রমিকরা ঈদ বোনাস থেকে বঞ্চিত হবে। শ্রম আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিকদের সার্ভিস বেনিফিট, বোনাস, নোটিস পে’র অর্থসহ প্রায় ২ কোটি টাকা থেকেও বঞ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
কারখানা বন্ধের পূর্বাপর এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে চলতি সপ্তাহে গণমাধ্যমের কাছে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন বলে ‘ইত্তেফাক’কে জানিয়েছেন তোবা’র মালিক দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, শ্রমিকরা জুন মাসের ১০ তারিখ থেকে কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। তারা মে মাসের বেতনের জন্য একটা সপ্তাহ ধৈর্য ধরতে পারলেন না। অথচ তখনো কারখানায় কাজ ছিল। এখন ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ করা ছাড়া আমার আর কোন রাস্তা খোলা নেই।
তোবার কারখানা বন্ধের নোটিসের প্রতিবাদে গতকালও রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে কয়েকটি গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠন। এ সব সমাবেশ থেকে কারখানা বন্ধের নোটিসকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে কারখানা খুলে দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। অন্যথায় লে-অফ ঘোষণা করলে আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের সব পাওনা পরিশোধের দাবি জানানো হয়েছে। সেইসঙ্গে চলতি আগস্ট মাসের বেতন দেয়ার দাবিও জানানো হয়েছে।
কারখানাগুলোর কাছে রক্ষিত শ্রমিকদের তালিকা অনুযায়ী ১ হাজার ৪৫৬ জন শ্রমিক কাজ করতো। তিন মাসের বেতনের দাবিতে আন্দোলন পরবর্তীতে আমরণ অনশনে রূপ নেয়। ঈদের দিনও অনশন করে কাটাতে হয়েছে এসব শ্রমিকদের। নানা নাটকীয়তার পর তারা তিন মাসের বেতন পান। এরপর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়েছে তোবা’র ৫ কারখানা বুকশান গার্মেন্টস, তোবা ফ্যাশন, তোবা টেক্সটাইল, তাইফ ডিজাইন ও মিতা টেক্সটাইল।
সালমা নামে বুকশান গার্মেন্টসের শ্রমিক ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেনঃ বাড্ডায় দুইটা গার্মেন্টসে চাকরির চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তোবা’র নাম শুনার পর তারা চাকরি দেয় নি। তিনি জানান, তার গ্রামের বাড়ি নীলফামারী জেলায়। কাজ না পেয়ে ইতিমধ্যে তার পরিচিত কয়েকজন বাড়ি চলে গেছে। কোথাও কাজ পেলে তারা আবার ঢাকায় আসবে। আলাপকালে তোবা ফ্যাশনের সুইং অপারেটর আল আমিন বলেন, ‘বাড্ডা ছাড়াও আশুলিয়া এলাকার কয়েকটি কারখানায় কাজের চেষ্ট করেছিলাম। কিন্তু তারা বলছেঃ কাজ নেই। সিজ্ন খারাপ।’ সুমন নামে বুকশান গার্মেন্টসের আরেক শ্রমিক বলেন, যে সব শ্রমিক মিশু আপার (শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু) সাথে আন্দোলনে ছিল তাদের কাজ পাওয়া কঠিন হবে।
শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, যদি আন্দোলনের কারণে শ্রমিকদের কাজে না নেয়া হয় তবে তা হবে ট্রেড ইউনিয়নের মূলনীতির বিরোধী। তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক মোশরেফা মিশু এ প্রসঙ্গে ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, শ্রমিকরা প্রাপ্য বেতনের জন্য আন্দোলন করে ফৌজদারি অপরাধ করেন নি। তারা প্রাপ্য টাকার জন্য আন্দোলন করেছে। এটা তাদের অধিকার। তাদের অন্য কারখানায় চাকরির ব্যবস্থা বিজিএমইএকে করতে হবে। এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, বিজিএমইএ’র উদ্যোগে তোবা’র শ্রমিকদের একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হবে। এসব শ্রমিকদের চাকরি দিতে অন্য কারখানার মালিকদের বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হবে। তবে শ্রমিকদের কাজে নেয়া না নেয়া মালিকের নিজস্ব সিদ্ধান্ত বলে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
২ কোটি টাকা বঞ্চিত হচ্ছেন শ্রমিকরা?
তোবা গ্রুপের কারখানা আর চালু করা সম্ভব হবে না বলে অনেক আগে থেকেই আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল। মালিক দেলোয়ার হোসেন কারখানা বন্ধ করেছেন গত সোমবার। কিন্তু তিনি কৌশল করে গত জুনের ১০ তারিখ থেকে বন্ধের নোটিস দিয়েছেন। ওইদিন থেকে মূলত শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। ওই সময় থেকে বন্ধের নোটিস দেয়ায় শ্রমিকদের ঈদ বোনাস প্রাপ্য হবে না। কিন্তু শ্রম আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারা অনুযায়ী পিছনের তারিখ থেকে বন্ধ ঘোষণা অবৈধ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সহকারী নির্বাহী পরিচালক সুলতান উদ্দিন আহমেদ গতকাল ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, যেই ধারায় মালিক প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করেছেন তা হয় শ্রমিকদের অবৈধ ধর্মঘটের কারণে উত্পাদন ব্যাহত হলে। কিন্তু শ্রমিকরা বেতন না পাওয়ায় কাজ বন্ধ করেছে। সে জন্য তাদের ধর্মঘট অবৈধ নয়। ফলে মালিক অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ করতে পারেন না। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিক শ্রমিকদের সব ধরনের পাওনা দিতে বাধ্য। প্রতিষ্ঠানটিতে দেড় হাজার শ্রমিকের গড়ে তিন বছরের চাকরি কাল ধরে তিনি শ্রমিকদের মোট পাওনার সম্ভাব্য একটি হিসাব দাঁড় করেছেন। তাতে দেখা গেছে, নোটিস পে বাবদ এক মাসের মূল বেতন এবং তিন বছরের জন্য তিন মাসের মূল বেতনের সার্ভিস বেনিফিট শ্রমিকরা প্রাপ্য হবেন। সেই হিসেবে একজন শ্রমিক বর্তমানে মূল বেতন ৩ হাজার টাকা করে চার মাসের মোট ১২ হাজার টাকা পাওনা হন। ১২ হাজার টাকা করে দেড় হাজার শ্রমিকের মোট প্রাপ্য টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর সঙ্গে ঈদ বোনাস ও প্রাপ্য ছুটির অর্থ যোগ করলে এই টাকার পরিমাণ অন্তত ২ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এই টাকা থেকে শ্রমিকদের বঞ্চিত করতেই মালিক দেলোয়ার হোসেন কারো বুদ্ধিতে এই অপকর্ম করেছেন।
আইনী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটি। কমিটির আহ্বায়ক মোশরেফা মিশু বলেন, কারখানা বন্ধের নোটিস চ্যালেঞ্জ করে দুই/একদিনের মধ্যে শ্রম আদালতে মামলা করা হবে। শ্রম আইন অনুযায়ী, লে-অফ ঘোষণার জন্য যেসব শর্ত প্রয়োজন, তোবা এবং মালিক দেলোয়ারের ক্ষেত্রে তা খাটে না। দেলোয়ার গত কয়েক মাসে ৩৭ কোটি টাকার কাজ করেছেন। কেবল বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে অর্ডার সাপ্লাই করেছেন ২৬ কোটি টাকা। অথচ শ্রমিকদের ৪ কোটি টাকার পাওনা দিতে পারছেন না বলা হচ্ছে।
তোবার কারখানা অধিগ্রহণের দাবি
তোবা গ্রুপের ৫টি কারখানা বন্ধের নোটিস বেআইনি হিসাবে আখ্যায়িত করেছে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি শ্রমিকদের টাকা না দেয়ার ষড়যন্ত্র। এসব কারখানা অধিগ্রহণ করে পুনরায় চালু করা হোক।
কারখানা বন্ধের প্রতিবাদে গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশে সংগঠনের পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়। সমাবেশে তোবা গ্রুপের আইনি নোটিস প্রত্যাহার, তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিক হতাহত হওয়ার দায়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিক দেলোয়ার হোসেনের জামিন বাতিল ও শাস্তি দেয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
গার্মেটস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষের সভাপতিত্বে এ সময় বক্তব্য রাখেন সংগঠনের উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খানসহ শ্রমিক নেতারা বক্তব্য রাখেন।
এ সময় মনজুরুল আহসান খান বলেন, তোবা গ্রুপের মালিক দেলোয়ার হোসেন তারই মালিকানাধীন তাজরীন ফ্যাশনেসর ১২৪ জন শ্রমিক হত্যার জন্য দায়ী। ১২৪ জন শ্রমিকের হত্যাকারীকে শাস্তি না দিয়ে সরকার পুরস্কৃত করেছে। অন্যদিকে তোবা গ্রুপের ৫টি কারখানার শ্রমিকদের তিন মাসের বেতন বোনাস ও ওভারটাইমের টাকা না দিয়ে অনাহারী শ্রমিকদের নির্যাতন করা হয়েছে। বক্তারা তোবার ঘটনায় সরকারের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, সরকার মালিকের অন্যায়ের কোন প্রতিকার না করে তার পাহারাদারের ভূমিকা নিয়েছে। শ্রমিকদের ধর্মঘটকে বেআইনি আখ্যা দিয়ে এসব খারখানা বন্ধের নোটিস দেয়া হয়েছে। এটি শ্রমিকদের সকল পাওনা মেরে দেয়ার হীন প্রচেষ্টা। শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে এসব প্রচেষ্টা রুখে দেয়ার দাবি জানান বক্তারা। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন শ্রমিক নেতা কাজী রুহুল আমিন, জিয়াউল কবীর খোকন, জলি তালুকদার, এমএ শাহীন, তাজরীন ফ্যাশনসের আহত শ্রমিক জরিনা বেগম, হেলেনা আক্তার, নিহত শ্রমিক আমেনা বেগমের স্বামী আবুল হোসেন প্রমুখ।