গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০১৪, ১৯:০৭
মাধব রায়
সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা)
ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট
বজ্রপাত পর্ব— ১৯
কয়েকদিন আগে চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে বড় রকমের ঝড় বয়ে গেছে। আট নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছিলো। সিলেটের ওপর দিয়েও ঝড় বয়ে গেছে। তবে ততটা তীব্র নয়। কয়েকদিন টানা বৃষ্টি ছিলো। নীলকান্তবাবু সকালে মর্নিংওয়াক করতে যেতে পারেননি। আজকে ছাতা হাতে সবাইকে নিয়ে বেরিয়েছেন। আকাশে মেঘ রয়েছে। একটু পরেই বৃষ্টি নামলো। সেই সাথে বজ্রপাত। কড়মড়, মড়াত্ শব্দে বাজ পড়তে লাগলো। নীলকান্তবাবু সবাইকে বললেন— ছাতাটা বন্ধ করে মাঠে বসে পড়।
ভিজে যাবো তো, বললো অণু।
ভিজলে কিচ্ছু হবে না। কিন্তু ছাতা মাথায় হাঁটলে বাজ পড়ার সম্ভাবনা বেশি।
ছাতা বন্ধ করে মাঠে বসে রইলেন তাঁরা কিছুক্ষণ। এমন সময় নীলকান্তবাবুর মোবাইল ফোন বাজলো, তিনি কেটে দিলেন। বললেন— তোর মামির ফোন।
কেটে দিচ্ছো কেনো? বললো চন্দ্রা।
মোবাইল ফোন অন থাকলে একটি সার্কিটের কাজ করে। ফলে বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে।
আরো একটা বাজ পড়লো বিকট শব্দে। অনেকগুলো বাজ পড়ার শব্দ হলো। নীলকান্তবাবু বললেন পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বার বজ্রপাত হয়, বছরে একশ’ চল্লিশ কোটি বার।
এতো বার ! অবাক হলো চন্দ্রা।
হ্যাঁ, তবে এর মাত্র পঁচিশ ভাগ ভূপৃষ্ঠে আঘাত হানে। আর পৃথিবীতে পৌঁছার আগে বজ্রপাত পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসে।
আরো একটা শব্দ হলো খুব জোরে। চন্দ্রা আর কণিকা কানে আঙ্গুল দিলো। নীলকান্তবাবু বললেন— ভয় পাসনে। যে বজ্রপাতের শব্দ আমরা শুনে ফেলেছি, সেই বজ্রপাত আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না।
কেন মামা? বললো চন্দ্রা।
কারণ এই বজ্র ইতোমধ্যে পৃথিবীতে আঘাত হেনে ফেলেছে, আমরা শুধু এর শব্দ শুনছি। বজ্রপাতের বেগ সেকেন্ডে এক লক্ষ কিলোমিটার আর শব্দের বেগ মাত্র তিনশ চল্লিশ মিটার। ফলে শব্দ দেরিতে পৌঁছায় আমাদের কানে।
বজ্রপাতে তো বিদ্যুত্ উত্পন্ন হয়, তাই না বাবা? বিন্দু বললো।
হ্যাঁ, বজ্রপাতে ত্রিশ হাজার অ্যাম্পিয়ার থেকে তিন লাখ অ্যাম্পিয়ার বিদ্যুত্ উত্পন্ন হতে পারে, যেখানে মাত্র পনেরো অ্যাম্পিয়ার বিদ্যুত্ হলেই আমাদের বাসার সকল বৈদ্যুতিক চাহিদা মেটে। আর বজ্রপাতের প্রতি ইঞ্চিতে দশ হাজার ভোল্ট বিভব পার্থক্য বজায় থাকে।
বজ্রপাত কীভাবে হয় সেটি বুঝিয়ে দাও না মামা —আকাশের দাবি।
বজ্রপাত হলো বায়ুমণ্ডলে ভারসাম্যহীন ইলেকট্রিক চার্জের কারণে ডিসচার্জ হওয়া।
বুঝলাম না, বললো আকাশ।
নীলকান্তবাবু বললেন— জলকণা বাষ্প হয়ে ঊর্ধ্বাকাশে উঠতে থাকলে নিচের দিকের বেশি ঘনীভূত বৃষ্টি বা তুষারকণার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ফলে ঊর্ধ্বমুখী বাষ্প ইলেকট্রন হারায়। এই মুক্ত ইলেকট্রন গুলো মেঘের তলদেশে জমা হয় এবং ইলেকট্রন হারানো ধনাত্মক বাষ্পকণা মেঘের উপরের পৃষ্ঠে চলে যায়। ফলে মেঘগুলো শক্তিশালী ধারক বা ক্যাপাসিটর হয়ে যায়।
ক্যাপাসিটর কী বাবা? বললো অণু।
ক্যাপাসিটর একটা যন্ত্র, যাতে চার্জ ধরে রেখে বিভব বাড়ানো যায়। এখন মেঘের দুইস্তরে চার্জের তারতম্যের কারণে শক্তিশালি তড়িেক্ষত্র সৃষ্টি হয়।
মেঘের উপরে ধনাত্মক আর নিচে ঋণাত্মক আধানের পরিমাণ বেড়ে গেলে ঋণাত্মক আধান পৃথিবীর ইলেকট্রনকে বিকর্ষণ করে মাটির অনেক গভীরে নিয়ে যায় এবং ঐ এলাকার ভূপৃষ্ঠ ধনাত্মক আধানে পরিণত হয়। শক্তিশালি তড়িেক্ষত্র তখন বাতাসের অপরিবাহী ধর্মকে নষ্ট করে ফেলে এবং বাতাসের মাধ্যমে বিদ্যুত্ ভূপৃষ্ঠে চলে আসে।
বজ্রপাতে মানুষ কীভাবে মারা যায়? চন্দ্রা বললো।
বজ্রপাতে বাতাসের তাপমাত্রা ত্রিশ হাজার থেকে ষাট হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট হয়ে যায় এবং এটি সর্বনিম্ন পথ পরিভ্রমণ করে পৃথিবীতে পৌঁছে। ফলে উচু স্থানেই বজ্রপাত আঘাত হানে। মানুষ এতো টেম্পারেচার আর হাই ভোল্টেজ সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
তাহলে বজ্রপাত থেকে বাঁচবো কীভাবে বাবা? বিন্দু বললো।
নীলকান্তবাবু বললেন— বজ্রপাত শুরু হলে খোলা মাঠে বা উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে না থেকে বসে পড়তে হবে। গাছের নিচে বা বিদ্যুত্ ও টেলিফোনের খুঁটির নিচে আশ্রয় নেয়া যাবে না। ছাতা টানানো থাকলে তা গুটিয়ে ফেলতে হবে। আর টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি যন্ত্রপাতির সাথে বিদ্যুত্ সংযোগ তারটি খুলে ফেলতে হবে। না হলে এগুলো নষ্ট হতে পারে।
চন্দ্রা বললো— আমাদের দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।
হ্যাঁ, বললেন নীলকান্তবাবু। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টস্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির অধ্যাপক ড. টমাস ডব্লিউ স্মিডলিন গবেষণা করে দেখেছেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে প্রতি বর্গকিলোমিটারে চল্লিশটি বজ্রপাত হয়। আর পত্রপত্রিকায় বজ্রপাতে দেড়শো জনের মতো মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। যদিও প্রকৃত সংখ্যা পাঁচশ’ থেকে এক হাজারের মতো।
তাহলে তো বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের দেশ। বললো কণিকা।
না, বললেন নীলকান্তবাবু। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় কঙ্গোর কিফুকা নামক স্থানে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা নয়শ’ পঁচাত্তর মিটার। এখানে বছরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে একশ’ আটান্ন বার বজ্রপাত হয়। এছাড়া ভেনিজুয়েলার ক্যাটাটুম্বু নদী, ব্রাজিলের উত্তরাংশ এবং মধ্য ফ্লোরিডার একটা বিশেষ অংশকে বেশি বজ্রপাত প্রবণ এলাকা হিসেবে ধরা হয়।
বজ্রপাত সম্পর্কে জানতে হলে কী পড়তে হবে বাবা?
বিজ্ঞানের একটা শাখা আছে ফুলমিনোলজি। এতে বজ্রপাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
ব্রাজিলের কথা বলায় অণু আর আকাশ আফসোস করলো। তারা বিশ্বকাপ ফুটবলে ব্রাজিলের ফ্যান ছিলো। ব্রাজিল কাপ না নিতে পারায় এরা হতাশ। কণিকা বললো— এই জন্যই ব্রাজিল কাপ নিতে পারেনি। নীলকান্তবাবু বললেন— এর সাথে বিশ্বকাপ নেয়া না নেয়ার সম্পর্ক নেই। তবে গত বছর আমেরিকার রিয়াল সল্টলেকের ফুটবল খেলা ছিলো কলোরাডোর যাপিডসের বিপক্ষে। খেলার একুশ মিনিটে একটা পেনাল্টি দিয়েছিলেন রেফারি। বাঁশি বাজানোর পর যে বজ্রপাত শুরু হলো, এরপর পেনাল্টি কিক নিতে বাষট্টি মিনিট লেগে গেলো।
হেসে উঠলো সবাই। এর মধ্যে বৃষ্টি আর বজ্রপাত অনেকটা কমে এসেছে। নীলকান্তবাবু জিজ্ঞেস করলেন— তোদের ভয় কেটেছে?
রেখা বললো— ভয় করবো কেন বাবা।
তাহলে গান ধর।
রেখা গান ধরলো— আমরা আকাশ থেকে বজ্র হয়ে ঝরতে জানি, তোমার ভয় নেই মা আমরা প্রতিবাদ করতে জানি।