তথ্য প্রযুক্তি উন্নয়নে প্রয়োজন তরুণদের সহযোগিতা
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০১৪, ২২:২৮
দৈনিক ইত্তেফাকের গোলটেবিল বৈঠকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। তবে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আমাদের আরো বহুদূর যেতে হবে। দেশের তরুণদের এ খাতে প্রচণ্ড আগ্রহ ও মেধা রয়েছে। এ আগ্রহ ও মেধা কাজে লাগাতে তাদের সহযোগিতা করতে হবে। তাদেরকে তথ্য প্রযুক্তিখাতে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সরকারের আর্থিক সুবিধা ও প্রণোদনা বাড়াতে হবে। এ শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকারের বিভিন্ন নীতি ও নিয়মগুলো আরো সহজ ও প্রযুক্তি ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। তরুণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির আদলে সিলিকন বাংলাদেশ নির্মাণ সম্ভব।
গতকাল শনিবার বিকালে রাজধানীতে দৈনিক ইত্তেফাক কার্যালয়ে ‘আমরা কিভাবে সিলিকন বাংলাদেশ গড়তে পারি এবং এটি কিভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে সাহায্য করতে পারে’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। দৈনিক ইত্তেফাক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সহযোগিতা করে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ও স্টার্টআপ ঢাকা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক বলেছেন, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত তথ্য প্রযুক্তি। গত সাড়ে পাঁচ বছরে এ খাতে দেশ কতটুকু এগিয়েছে তার মূল্যায়ন করছে সরকার। পাশাপাশি ২০২১ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশে পরিণত হতে আমাদের করণীয় ও পরিকল্পনা নির্ধারণ করছে। দুর্নীতি রোধ ও মানুষের হয়রানি কমিয়ে জনসেবার জন্য তথ্য প্রযুক্তির বহুল বিস্তার প্রয়োজন। এ কাজটিই আমরা করছি। এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ শুধু একটি স্লোগান নয়, বাস্তবতাও।
জুনায়েদ আহমেদ পলক জানান, সরকার শিগগিরই ৪০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেটের সদ্ব্যবহার সম্পর্কে প্রচারণা ও কর্মশালা পরিচালনা করবে। দেশের প্রায় ৫ লাখ তরুণ এ খাতে কাজ করছে। তরুণদের উত্সাহিত ও সহায়তা করতে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে। আইটি ফ্রিল্যান্সিং খাত থেকে বছরে এক বিলিয়ন ইউএস ডলার আয় করার জন্য তরুণ ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সুযোগ ও সুবিধা তৈরি করা হচ্ছে। শিগগিরই এর প্রতিফলন ঘটবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, উদ্ভাবনের কোন সীমাবদ্ধতা নেই। তথ্য প্রযুক্তি খাতে সরকার সহায়তা বাড়িয়েছে। এটি আরো বাড়বে। তথ্য প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা নিরসনে সরকারের আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টার ঘাটতি নেই। এ খাতে প্রকল্প গ্রহণকারীদের ৫ লাখ টাকা থেকে সরকারি সহায়তা আরো বাড়ানো হবে।
তিনি বলেন, দেশে দুই বছরের মধ্যে ৫০ হাজার আইটি-ফ্রিল্যান্সার তৈরির জন্য আমরা কাজ করছি। তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার লক্ষ্যে প্রাথমিক পুঁজি সংগ্রহের জন্য ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করিয়ে দেয়া হবে। এছাড়াও সম্ভাব্য সব ধরনের সুবিধা প্রদানে সরকার প্রস্তুত। শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ খাতে এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি। প্রশ্ন ফাঁস রোধে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাব্যতা সম্পর্কেও তিনি আলোচনা করেন।
মূল প্রবন্ধে ক্রিশ্চিয়ান প্রকপ বলেন, সিলিকন বাংলাদেশ বলতে বোঝায় এমন একটি ভূ-অবস্থানকে, যেখানে প্রযুক্তিখাতের উদ্যোক্তা, অত্যন্ত দক্ষ ব্যক্তি এবং পুঁজির একসাথে সংযোগ ও সমন্বয় ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন সিটির মত স্থান তৈরির স্বপ্ন বাংলাদেশেরও রয়েছে। বাংলাদেশে এমন ক্ষেত্র গড়তে সবার আগে প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ, পুঁজি এবং অবকাঠামোর জোগান এবং সংযোগ ফলাফল নিশ্চিত করা। এ সংযোগ স্থাপনের জন্য শিল্প প্রতিষ্ঠান, একাডেমিয়া এবং সরকারি সহায়তা এবং বড় বড় ধারণাও দরকার।
তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাংলাদেশিদের কাছে খুবই জনপ্রিয়, এমন নাগরিকদের কাছে সিলিকন বাংলাদেশ নিশ্চয়ই খুবই কাঙ্ক্ষিত। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা-প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়-গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।
প্রকপ বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যকরী এবং যোগ্য সরকারের সাথে মানুষের সংযোগ ঘটায়। সরকারের বিভিন্ন সেবা ও তথ্য প্রাপ্তি সহজ হয়। বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি শিল্পে ১৮ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। ৩০ হাজার মানুষ এ শিল্পে কাজ করে। এ শিল্পের বিকাশের জন্য যথেষ্ট মেধাবী মানুষ বাংলাদেশে রয়েছে। এদের যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, সিলিকন বাংলাদেশ গড়তে নতুন নতুন উদ্ভাবনকে উত্সাহিত করতে হবে। একটি ল্যাপটপ, একটি ধারণা এবং একজন চৌকস ও সাহসী মানুষ অনেক সৃষ্টিশীল কাজ করতে পারে। এ সৃষ্টিশীল মানুষদের সহায়তা করতে হবে, প্রাথমিক পুঁজির জোগান দিতে হবে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে এখনই কাজ করতে হবে।
সিলিকন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনীয় বিষয়ে ধারণা দিয়ে তিনি বলেন, এ জন্য এক থেকে ১০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার প্রয়োজন। সর্বশেষ প্রযুক্তির ধারণা রাখেন এমন ১০ থেকে এক হাজার বিশেষজ্ঞ এবং উন্নত অবকাঠামো দরকার। সিলিকন বাংলাদেশ গড়া কিছুটা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। এজন্য বাংলাদেশি জনশক্তিকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
গুগলের এজেন্সি ডেভেলপমেন্টের প্রধান ভিকি রাসেল বলেন, তথ্য প্রযুক্তি খাতে উন্নয়নের জন্য সবার আগে দরকার প্রশিক্ষিত তরুণদের যত্ন নেয়া। বাংলাদেশের তারুণ্যের বড় শক্তি রয়েছে। তাদেরকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাহসী ও উদ্যোগী করে গড়ে তুলতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে একত্রিত হয়ে বিশেষজ্ঞ ও আগ্রহী উদ্যোক্তাদের বক্তব্য শোনা প্রয়োজন। পরস্পরের ধারণা ও মতের বিনিময় এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে সিলিকন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা যাবে। এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আকৃষ্ট করতে হবে। জনগণকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ মানুষ মোবাইল ব্যবহার করছে। এটি একটি বড় ব্যাপার। এ মোবাইল ব্যবহারকারীদের কাজে লাগিয়ে তথ্য প্রযুক্তিখাতে অনেক বড় উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। এর সম্ভাবনাও অনেক। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে সুপরিকল্পনা দরকার।
বেসিস’র সভাপতি শামীম আহসান বলেন, দেশের সবচেয়ে ভালো মেধাবীদের ৮০ ভাগ বিদেশে চলে যায়। ভারতেও একই অবস্থা। কিন্তু সেদেশে অনাবাসী ভারতীয়দের মেধা ও পুঁজিকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ ব্যাপকভাবে রয়েছে। আমাদের দেশে এটি তেমনভাবে হয়নি। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মেধা ও পুঁজি দেশে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। সংযোগ স্থাপন করে প্রযুক্তি খাতের দেশি বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশে শিল্প স্থাপন কিংবা বিদ্যমান শিল্পে তাদের মেধা প্রয়োগের ব্যবস্থা করা জরুরি। এজন্য সরকারকে আরো উদ্যোগী হতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে অংশীদারিত্ব স্থাপন করা দরকার। এটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
স্টার্টআপ ঢাকার সহ প্রতিষ্ঠাতা ফাইয়াজ তাহের বলেন, প্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উত্সাহিত করতে দেশীয় উদ্যোক্তাদেরও উদ্যোগী হতে হবে। এক্ষেত্রে গল্প ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আমাদের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা। অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, সরকারের বিদ্যমান বিভিন্ন নীতি ও নিয়ম অনুযায়ী এ খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা গ্রহণ ও ব্যবহার করা কঠিন। এ শিল্পে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের জন্য প্রযুক্তি ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে। বিদ্যমান শর্তগুলো আরো সহজ ও শিথিল করতে হবে।
বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মাহফুজুল আরিফ বলেন, বিদেশে অবস্থানরত আমাদের শ্রমিকরা শারীরিক শ্রমের পরিবর্তে যদি প্রাযুক্তিক শ্রম দিতে পারত, তবে আরো অনেক বেশি টাকা আয় করতে পারত। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যায়ে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে আরো জোর দিতে সরকারের প্রতি তিনি আহবান জানান।
ইল্যান্স ওডেস্ক’র কান্ট্রি ম্যানেজার সাইদুর মামুন খান বলেন, দেশের ফ্রিল্যান্সারদের শুধু প্রযুক্তি নয়, ভাষা এবং যোগাযোগ দক্ষতাও বাড়াতে হবে।
দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী পরিচালক তারিন হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিসিসি’র নির্বাহী পরিচালক আশরাফুল ইসলাম, ওকে মোবাইলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুজিবুর রহমান, টিম ইঞ্জিনের প্রতিষ্ঠাতা সামিরা জুবেরি হিমিকা, এটুআই’র যোগাযোগ কর্মকর্তা হাসান বেনাউল ইসলাম।