ডাক্তাররা কাজ করেন মর্জি মাফিক
আবুল খায়ের ও গোলাম কিবরিয়া জীবন
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০১৪, ২২:২৯
চাঁদপুরে চিকিত্সকরা চাকরি করেন তাদের মর্জিমতো। ঢাকা থেকে চাঁদপুর যেতে সময় লাগে মাত্র আড়াই থেকে তিন ঘন্টা। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় তারা কর্মস্থলে থাকেন না। জেলায় শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক আছে। তবে সেখানে বসতে ঠিকই তারা ঢাকা থেকে চাঁদপুর যাচ্ছে। জেলার সবক’টি উপজেলায় চিকিত্সকদের থাকার ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। তারপরও চিকিত্সকরা সেখানে থাকেন না। ঢাকা থেকে সপ্তাহ ২/১ দিন গিয়ে খাতায় স্বাক্ষর করে বেতন নিয়ে চলে আসে।
জেলায় অপারেশন থিয়েটার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে নানা অজুহাতে অপারেশন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ রাখা হয়। রোগীরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দালালদের মাধ্যমে এক শ্রেণীর চিকিত্সক ও কর্মচারী রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ক্লিনিকগুলোতে গর্ভবতী মহিলাদের সিজারিয়ান অপারেশনের নামে চলে ব্যবসা। রোগী গেলেই বলা হয় স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসব সম্ভব না, অপারেশন করতে হবে। ভুল চিকিত্সায় মা ও শিশুর মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে অহরহ।
প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করে। অপারেশন পরবর্তী ঝুঁকি এড়ানোর ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট কিংবা পোস্ট অপারেটিভ ব্যবস্থা নেই।
অভিযোগ আছে, সরকারের স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের এক শ্রেণী কর্মকর্তা ঐ ক্লিনিক থেকে নিয়মিত মাসোহারা পেয়ে থাকেন। এ কারণে জেলায় চিকিত্সকদের স্বেচ্ছাচারিতা চরম আকার ধারণ করেছে।
একটি জেলা সদর হাসপাতাল ছাড়াও ৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ১টি টিবি হাসপাতাল, ২০টি সাবসেন্টার, ৭৯টি পরিবার-পরিকল্পনা কেন্দ্র ও ১৯৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে জেলায়। চাঁদপুরে ২৮ লাখ লোকের জন্য ১৯৮ জন চিকিত্সক। এরমধ্যে কর্মরত আছেন ১১৫ জন।
২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল
এই হাসপাতালে চিকিত্সক পদ ৬৫টি। কর্মরত আছেন ৪২ জন। বাকী ২৩টি পদ শূন্য প্রথম থেকেই। এছাড়া নার্স থাকার কথা ৮২ জন, আছে ৭১ জন। কর্মচারী থাকার কথা ৩৫ জন, আছে ২৬ জন। এই হাসপাতালে দীর্ঘ কয়েক বছর তত্ত্বাবধায়ক নেই। এছাড়া সিনিয়র কনসালটেন্ট গাইনি, সিনিয়র কনসালটেন্ট শিশু, সিনিয়র অর্থোপেডিক, কার্ডিওলজিস্ট, জুনিয়র অর্থোপেডিক, জুনিয়র কনসালটেন্ট ডেন্টাল, আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার, অ্যানেসথেটিস্ট, প্যাথলজিস্ট, সহকারী সার্জন ৫ জন, বিষয়ভিত্তিক মেডিক্যাল অফিসার ৪ জনসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘ কয়েক বছর যাবত্ শূন্য। আবার এই হাসপাতালে যে ক’জন ডাক্তার আছেন তাদের বেশ ক’জন নিজের ইচ্ছামাফিক অফিসে আসেন, যান। কয়েকজন কোন মাসে ২/১ দিনের জন্যও অফিসে আসেন না। আবার অনেকে গত কয়েক যুগ একই স্থানে বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাচ্ছেন।
প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার
জেলায় সরকার অনুমোদিত ৩৯টি প্রাইভেট হাসপাতাল রয়েছে। অনুমতি নেই এমন হাসপাতালের সংখ্যা এর দ্বিগুণ। এর মধ্যে চাঁদপুর পৌরসভায় ১৯টি, শাহরাস্তিতে ৫টি, হাজীগঞ্জে ৪টি, ফরিদগঞ্জে ৩টি, কচুয়ায় ৪টি, মতলব উত্তরে ৪টি ও মতলব দক্ষিণে ২টি। ডায়াগনস্টিক সেন্টার চাঁদপুর সদরে ৬টি, চাঁদপুর পৌরসভায় ৫৩টি, ফরিদগঞ্জে ২৮টি, কচুয়ায় ২৫টি, শাহরাস্তিতে ১৪টি, মতলব উত্তরে ৭টি, মতলব দক্ষিণে ১৭টি, হাজীগঞ্জে ২১টি এবং হাইমচরে ২টি। এসব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত টেকনেশিয়ান নেই। নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। তারপরও ব্যাঙের ছাতার ন্যায় দিন দিন এগুলো বেড়েই চলছে।
উপজেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন আমাদের সংবাদদাতাগণ
মতলব দক্ষিণ উপজেলা
৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টাকা ছাড়া রোগী দেখা হয় না। সময়মত ডাক্তারদের পাওয়া যায় না। ১০ জন ডাক্তারের মধ্যে ৫ জন কর্মরত আছেন। স্বাস্থ্য সহকারী ৫০ জনের মধ্যে ১৬টি পদ শূন্য পড়ে আছে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নেই। অ্যাম্বুলেন্স নেই, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম এসব কথা স্বীকার করেছেন।
মতলব উত্তর উপজেলা
৩১ শয্যার সরকারি হাসপাতালে ১১ জনের মধ্যে ৯ জন ডাক্তার আছেন। কিন্তু তাদের সবসময় পাওয়া যায় না। এখানে রোগী আসলে না দেখেই প্রাইভেট হাসপাতালে কিংবা জেলা সদরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এখানে জেনারেটর আছে কিন্তু তা নষ্ট। সন্ধ্যার পর কারেন্ট চলে গেলে পুরো এলাকা অন্ধকার থাক। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শাহআলম মোল্লা বলেন, সবকিছু নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
হাজীগঞ্জ উপজেলা
৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তারদের দেখা মেলে না সব সময়। অনেকে রোগীদের সাথে ভাল আচরণ করেন না। ২১ জনের মধ্যে ১২ জন ডাক্তার আছেন। এক্সরে মেশিন আছে, কিন্তু কাজ করে না। প্রায়ই বলা হয় ওষুধ নেই, সরবরাহ নেই। কোন অপারেশন করা হয় না। একশ্রেণীর দালাল সারাক্ষণ ডাক্তারদের চেম্বার ও আশপাশে ঘোরাফেরা করেন। তারা রোগীদের নিয়ে যান বেসরকারি হাসপাতালে।
কচুয়া উপজেলা
৫০ শয্যার এই হাসপাতালে গুরুত্বপূর্ণ কনসালটেন্ট পদগুলো শূন্য পড়ে আছে বহুদিন ধরে। অনেক স্টাফ নার্স ও নৈশপ্রহরী নেই। প্রায় প্রতিটি বেড এর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এক্সরে মেশিন আছে, টেকনেশিয়ান নেই, প্যাথলজিক্যাল বিশেষজ্ঞ নেই। ৭/৮ বছর থেকে একটি নতুন জেনারেটর আছে অথচ নষ্ট অজুহাতে চালানো হচ্ছে না। দালাল চক্রের সদস্যরা রোগীদের প্রায়ই টানাটানি করতে দেখা যায়। প্লেট নেই এই অজুহাতে পলিথিনে ভাত দেয়া হয়। যে সমস্ত খাবার দেয়া হয় তা খুবই নিম্নমানের এবং কম দেয়ার কারণে খেয়ে রোগীদের পেট ভরে না বলে রোগীরা অভিযোগ করেছেন। আলো, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা খুবই নাজুক এবং অধিকাংশ টয়লেটগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা
৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ডাক্তার, স্টাফসহ ৭০টি পদ শূন্য পড়ে আছে। পুরাতন ভবনটি খুবই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এক্সরে মেশিন থাকা সত্ত্বেও প্রায় একযুগ ধরে কাজ করছে না। কারণ টেকনেশিয়ান নেই। ডাক্তারদের সময় মত পাওয়া যায় না। প্যাথলজিস্ট নেই। দালাল চক্র এখানে এতোটাই সক্রিয় যে তারা ডাক্তারদের হাত থেকেই প্রেসক্রিপসান টেনে নিয়ে যায়। এখানে সার্বিক চিকিত্সা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ চিকিত্সকদের উপর নির্ভর করে চলছে।
হাইমচর উপজেলা
৩১ শয্যার একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও আগত রোগীরা চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এক্সরে মেশিন আছে, টেকনেশিয়ান নেই। ডাক্তারদের অনেককে ২/৩ মাসেও একবার দেখা যায় না। রোগী আসলে যন্ত্রপাতি নেই, ওষুধ নেই, বেড নেই, লোকজন নেই ইত্যাদি বলে তাদের প্রাইভেট বা জেলা সদরে রেফার করা হয়ে থাকে।
শাহরাস্তি উপজেলা
এখানে প্রচুর ডাক্তার আছেন কিন্তু তাদের পাওয়া কষ্ট। দালাল চক্রের উপদ্রবে রোগীরা অতিষ্ঠ। বড় ধরনের কোন অপারেশন করা হয় না।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডা. মোঃ রুস্তম আলী জানান, অন্যান্য জেলার তুলনায় চাঁদপুর জেলায় স্বাস্থ্য সেবার সার্বিক চিত্র খুবই সন্তোষজনক। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম আছে; যা কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগবে। বিষয়টি আমরা আন্তরিকতার সাথে দেখছি।