সাদা কালো জীবন

আমি ভাই-বোনের মাঝে তৃতীয়। আমার বড় দুই ভাই। মায়ের কাছে গল্প শুনেছি, যখন আমার জন্ম সেদিনই আমাদের এক আত্মীয় এসে বলেছিল, ‘এমন কালো মেয়ে? এই মেয়ের বিয়ে দিবেন কি করে? ভাইদের রঙ যদি বোনটা পেত।’ আমার জন্মানোর দিনই আমার বিয়ে এবং আমার মায়ের দুর্ভাগ্য নিয়ে প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে গিয়েছিল। আমার ভাইয়েরা যেমন সুন্দর, তেমনি ফর্সা এবং আমি ছিলাম একেবারে উল্টো, কালো। আমি ভাইদের রঙ কেন পেলাম না, তা নিয়ে ছিল সবার দুঃখ। প্রতিমুহূর্তে আমার স্কুলের বান্ধবী, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন তা আমাকে উপলব্ধি করাতো। বাসায় আমার ছোট বড় ভাই বোনদের মাঝে আমিই ছিলাম সবচেয়ে কালো। আমার মনে হতো নিজেকে সবচেয়ে অসুন্দর। তাই নিজেকে গুটিয়ে রাখতাম। কোনদিন ছবি তুলতে চাইতাম না। ছোটবেলায় আমার ছোট মনটা ছিল খুব দুঃখী। কিন্তু আমার ছোটবেলার একমাত্র বন্ধু ছিল আমার নানী। আমার নানী বলত আমার সব নাতী-নাতনীর মাঝে তুই সবচেয়ে সুন্দর, তোর মন সুন্দর। কারণ সৌন্দর্য মনের, কখনও রঙের হয় না। আমার নানী পড়াশোনা জানত না, কিন্তু মনে হয় নানীই ছিল সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী। আমি নানীর সেই কথা মনে রেখে সব কথা বাদ দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেলাম এবং খুব ভাল ফল করলাম। জ্ঞানের সৌন্দর্য, মনের সৌন্দর্য যে কত বেশি একজনের বাইরের সৌন্দর্যের চেয়ে, তা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করছিলাম। আমার যে জীবনসঙ্গী তার সাথে আমার পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে সময় আমি তাকে একটু এড়িয়েই চলতাম। কারণ সে তখন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে আর আমি এমএ পরীক্ষার্থী। পরীক্ষার পরপর, একদিন সে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের সেই গান, ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ’ গেয়েই শুরু করেছিল আমাদের জীবনের নতুন গান। যেদিন আমি চাকরি পেলাম কলেজে, সেদিন আমাদের সেই আত্মীয়ই বলেছিল, আপনার কি সৌভাগ্য, আপনার মেয়ে কলেজের অধ্যাপক, নিজেই সাবলম্বী, আর জামাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তখন মা বলেছিল দেখো একদিন যার কাছে তুমি ছিলে দুর্ভাগ্য, এখন তার কাছে সেই তুমিই সৌভাগ্য। আমার এখনও মনে হয়, সমাজের সেই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়নি। তাই আমার মত অনেককেই সবসময় সংগ্রাম করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ছোটবেলায় মনের যে আঘাত আমাকে সহ্য করতে হয়েছে, সেরকম আঘাত কেন এখনো আমাদের মতশিক্ষিত মানুষের মেয়েদেরও সহ্য করতে হয়, তা ভাবলে অবাক লাগে। সৌন্দর্য যে বাইরের না, মনের সেই শিক্ষাটুকুই যদি কেউ অর্জন করতে না পারে, তবে তাকে কি শিক্ষিত বলা যায়? এভাবেই যেন তার দুঃখ-সুখে মেশানো জীবনের কথা বলছিলেন অধ্যাপিকা তানিয়া আক্তার। দুঃখজনক কিন্তু সত্য যে, সমাজে এখনও একজন মেয়ে কে সাদা-কালোর জঘন্য খেলায় পুড়ে ছাই হয়ে যেতে হয় জন্ম থেকেই। বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতিতে একজন মেয়ে হয়ে জন্মানোই যেন এক অপরাধ। কেননা সে কারণেই তাকে অনেক বৈষম্যের শিকার হতে হয়। এরপর একজন মেয়ের কালো হয়ে জন্মানো যেন তার চেয়েও অনেক বড় দুর্ভাগ্য এবং ফর্সা হয়ে জন্মানো অনেক বড় সৌভাগ্য। কেননা একজন মেয়ের সার্থকতা বিচার করা হয় এই দেখে যে, কত ভাল ঘরে তার বিয়ে হল। সেটিই যেন বিচারের একমাত্র বিষয়। তার অন্য যোগ্যতা কিছুই না। এখন চিন্তা-ভাবনায় কিছু পরিবর্তন আসলেও সেই ধারণার চলছেই। তাই এখনও একজন মেয়ের গায়ের রঙ নিয়ে নানা কুমন্তব্য, আপত্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। যেমনটি বলছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অদ্রি। আমার টিভি খুললে এখন বেশ রাগই লাগে। কেননা খালি বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন তো থাকবেই কিন্তু এর মাঝে নানা পণ্যের বিজ্ঞাপনে শুনতে হবে- রঙকালো কোন চিন্তা নেই, সাতদিনেই সাদা। এমন সাদা হবার নানা পন্থা এবং ক্রিমের কথা। মেয়েদের গায়ের রঙ ফর্সা করাই যেন একমাত্র কাজ। আমাদের ক্লাসের ছেলেদের মধ্যে যারা কালো তাদের কোন দুঃখ নেই যে সে কালো। কিন্তু আমাদের হলের মেয়েরা ঠিকই চিন্তিত এজন্য যে, সে কালো, তাকে কেউ পছন্দ করবে না। যে মন না দেখে শুধু রঙ দেখে পছন্দ করে, সে রকম মানুষ থেকে দূরে থাকতে পারাই আমি নিজের সৌভাগ্য মনে করি। একবার আমাদের হলে কিছু বিদেশি মেয়ে এসেছিল বেড়াতে। ওদের একজন হঠাত্ আমাকে দেখে খুবই খুশি। আমাকে বলল, আমি কি সুন্দর কালো-শ্যামলা। ওদের কাছে আমার গায়ের রঙই খুব সুন্দর লেগেছিল। ওরা সবাই ফর্সা। তাই ওদের কালোই ভালো লাগে। এটা ওদের পছন্দ। একজন যা, সাধারণত তার অন্যরকমই পছন্দ। তাই যে ফর্সা তার কালো ভালো লাগে, আর যে কালো তার ফর্সা ভালো লাগে। দূরদেশীর কাছে আমার রঙ ভালো লাগলেও, সেই রঙের জন্যই আমার ছোটবেলায় অনেক কষ্ট পেতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। আমার ছোটবেলার স্মৃতি বেশ ভয়াবহ। আমরা এক ভাই এক বোন। আমিই ভাই বোনের মধ্যে বড়। আমার ভাই ধবধবে ফর্সা আর আমি তো কালোই। কখনো এমন প্রশ্নও শুনতে হয়েছে যে, আমি ওর আপন বোন কিনা? সবার দুঃখছিল কেন আমি কালো হলাম। আর তাই জন্ম থেকেই আমার বিয়ের চিন্তা তাদের মাথার বোঝা। যে মেয়েরা স্কুলে বেশ সুন্দর ফর্সা ছিল তারা আমার সাথে কথাও বলত না, মিশতো না। কেননা একজন যখন নিজেকে খুব সুন্দর ভাবা শুরু করে তখন তার ভাব বাড়তে থাকে। নিজেকে অনেক বড় মনে করতে থাকে। সবাই তার জন্য পাগল এমন মনে করে। তাই ধীরে ধীরে মনের দিক থেকে সে অনেক ছোট হতে থাকে। একজন মানুষ যে মনের দিক থেকে বড়, মনের সৌন্দর্যকে জানে, জ্ঞানের সৌন্দর্যকে চেনে, তার কাছে রঙ কোন অর্থ রাখে না। সে ফর্সা হোক আর কালো, তার কাছে তা অর্থহীন। তাই বলতেই হয়, আমাদের প্রচলিত ধারায় সৌন্দর্য মানেই ফর্সা, এটি কোন কথা নয়। আর তার চেয়েও মন খারাপ হয় এই ভেবে যে, এখনও অনেক পড়ালেখা জানা শিক্ষিত মানুষও সেই জ্ঞানের সৌন্দর্য, মনের সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করতে পারে না। ছবিটি প্রতীকি কৃতজ্ঞতায়: কে-ক্রাফট