পাকিস্তানে গণতন্ত্রের ঘাড়ে ‘সামরিক নিঃশ্বাস’
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০১৪, ২১:১২
গল্পের স্ক্রিপ্ট অনেকের কাছে চেনা চেনা লাগছে! ক্ষমতাসীন দলকে টেনে নামানোর জন্য বিরোধী এক বা একাধিক দলের নিরন্তর চেষ্টা। আন্দোলন, বিক্ষোভ, ভাংচুর। রাজপথ দখল-বেদখলের খেলা। জনজীবনে নাভিঃশ্বাস। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ। পরিস্থিতির চরম অবনতি। অবশেষে ‘দেশ বাঁচাতে’ সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ। ক্ষমতা দখল এবং ‘কয়েক বছরের’ মধ্যে নির্বাচন দেয়ার প্রতিশ্রুতি।
দুর্বল গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক এবং সামরিক শাসনের পালাবদলের মাঝখানের গল্পটা মোটামুটি এরকমই। অতি সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো থাইল্যান্ড। একই পরিস্থিতি তৈরি হবার উপক্রম হয়েছে পাকিস্তানে। ২০১৩ সালের মে মাসে সেখানে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশি-বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বলে রায় দেন। বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করে পাকিস্তান মুসলিম লীগ (পিএমএল-এন)। প্রধানমন্ত্রী হন নওয়াজ শরীফ। নওয়াজের দল পিএমএল-এন পায় ১৬৬ আসন যা আগের চেয়ে ৭৭ আসন বেশি। অন্যদিকে তত্কালীন ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পায় মাত্র ৪৫ আসন। আগের চেয়ে ৭৪ আসন কম পায় দলটি। আর বিস্ময়করভাবে জিরো থেকে হিরো হবার মতো একেবারে আগের নির্বাচনে শূন্য আসন থেকে এক লাফে ৩৫ আসন পায় ইমরানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। ইমরানের দাবি, জনগণ তার দলকেই ভোট দিয়েছিল। কিন্তু কয়েকটি প্রদেশে বিশাল কারচুপি করে নওয়াজের দল সেই জয় ছিনিয়ে নিয়েছে।
ভোটের পর ইমরান খান ফল মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু অভিযোগের তদন্ত করবে নির্বাচন কমিশন এমন শর্তে ফল মেনে নেন। ইমরানের দল নির্বাচন কমিশনে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ জমা দেয়। কিন্তু কমিশন কিংবা সরকার সেসব অভিযোগ হিমাগারে পাঠিয়ে দেয় বলে দাবি করে পিটিআই। সেই অনুযায়ী নওয়াজের সরকারের ১ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইমরান খান প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ইমরান খানের পরিকল্পনা ছিল ১০ লাখ লোক নিয়ে রাজধানী অভিমুখে লং মার্চ করবেন। প্রথমে সেই লং মার্চের নাম ঠিক করেছিলেন ‘সুনামি মার্চ’। পরে নাম পরিবর্তন করে প্রস্তাব করা হয় ‘মিলিয়ন মার্চ’। কিন্তু ইমরান পরে সিদ্ধান্ত নেন ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত শোভাযাত্রা এবং সরকার বিরোধী লং মার্চ একইসাথে শুরু করবেন। এ কারণে এই লংমার্চের চূড়ান্ত নাম ঠিক হয় ‘আজাদি মার্চ’। তার এই লংমার্চ ঘোষণার পর পাকিস্তান আওয়ামী তাহরিক (পিএটি) নেতা তাহির-উল-কাদরি একই জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি জানান, ইমরানের কর্মসূচির সমান্তরাল কর্মসূচি হবে তার। একসাথে মিশে আন্দোলন করবেন না। কাদরি তার লংমার্চের নাম দেন ‘ইনকিলাব মার্চ’।
উভয়ের লং মার্চ অনেকটা সফল হয়। এরপর তারা ঘোষণা দেন নওয়াজ শরিফের সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত পাকিস্তানের স্পর্শকাতর রেড জোনে অবস্থান কর্মসূচি গ্রহণ করবেন। রেড জোন হল ইসলামাবাদের সবচেয়ে সুরক্ষিত অঞ্চল। এখানেই রয়েছে পার্লামেন্ট হাউস, সুপ্রিম কোর্ট, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাস। সবসময় নিরাপত্তার ঘেরাটোপে মোড়া থাকে পুরো এলাকা। কোনও ধরনের বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ মিছিল এখানে নিষিদ্ধ।
রেড জোনে কর্মসূচি ঘোষণার সাথে সাথে সরকার নড়েচড়ে বসে। কারণ রেড জোনের সাথে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও সুনাম জড়িত। বিদেশি অতিথিদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেলে পাকিস্তানের সাথে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক টানাপড়েন শুরু হতে পারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর। এ কারণে সেনাবাহিনীর দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয় সরকার। সেনাবাহিনী এই সুযোগটার অপেক্ষায় ছিল। পাকিস্তানের দীর্ঘ সামরিক শাসনের ইতিহাস রয়েছে। বিভিন্ন সময় রক্তাক্ত ও রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশটির ক্ষমতা দখল করেছে সেনাবাহিনী। পিটিআইয়ের আন্দোলনের কারণে সেনাবাহিনীর সামনে এখন সেই সুযোগ এসেছে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কিংবা সরকার সমর্থকদের সঙ্গে যদি ইমরানের দলের বিক্ষোভকারীরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তখন মার্শাল ল জারি হতে পারে বলে পাকিস্তানের মিডিয়ায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। কারণ মঙ্গলবার বিক্ষোভকারীরা ইসলামাবাদের স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ‘রেড জোনে’ প্রবেশের চেষ্টা করায় সেনাবাহিনী ‘হাই এলার্ট’ জারি করে। দুই নেতা নিজ নিজ সমর্থকদের নেতৃত্ব দিয়ে রেড জোনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার পর সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী সতর্ক হয়ে যায়। এর আগে ধারণা করা হচ্ছিল চলমান এই কর্মসূচিতে সেনাবাহিনী কোনো ভূমিকাই পালন করবে না। হয়তো চুপচাপ থাকবে। কিন্তু সেনাবাহিনী হাই এলার্ট জারি করায় এটা পরিষ্কার, সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা নিয়ে সেনাবাহিনীর যথেষ্ট সন্দেহ আছে। যে কারণে রেড জোনের নিরাপত্তায় তারা হাই এলার্ট জারি করতে বাধ্য হয়।
সেনাবাহিনী আশঙ্কা করে, পিটিআই ও পিএটির কর্মসূচিতে সহিংসতা হতে পারে। তাই লে. জে কামার বাজোয়া ইসলামাবাদে তার বাহিনীকে পুলিশের সাথে সমন্বয় করে সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলেন। তিনি তাদের জানিয়ে দেন, প্রয়োজন হলে তাদের সবাইকে তলব করা হবে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় সংবিধানের ২৪৫ ধারা প্রয়োগ করে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে আগেই সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। তবে একটি সূত্র জানায়, ইসলামাবাদের প্রধান কমিশনার নির্দেশ না দিলে সেনাবাহিনী তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না। সেনাবাহিনীর একটি সূত্র জানায়, সরকারি নির্দেশে ৫০০ সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তবে তারা নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখবে। কিন্তু সেনাবাহিনীর অবস্থান সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা রেড জোনে ঢুকে পড়ে। এখনো পর্যন্ত তারা রেড জোনে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির দল নওয়াজের সরকারের সাথে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। জারদারি শনিবার নওয়াজ শরিফের মধ্যাহ্নভোজে গিয়ে তার পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। ফলে কিছুটা ব্যাকফুটে চলে গেছে ইমরানের আন্দোলন। ইতিমধ্যে তার দলের এমপিরা পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করার জন্য আবেদন জমা দিয়েছেন। যদিও সেই আবেদন এখনো চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়নি।
নওয়াজ শরিফের প্রতি ইমরান এতই ক্ষুব্ধ যে তিনি বলেছেন, নওয়াজকে কিছুতেই তিনি ক্ষমা করবেন না। এমনকি লন্ডনে পালিয়ে গেলেও পিছু ধাওয়া করে সেখানে পৌঁছে যাবার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক এই ক্রিকেট তারকা। অর্থাত্ সংঘাতের ইঙ্গিত মিলছে তার কথায়। এ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী সুযোগের অপেক্ষায় আছে এমন মন্তব্য করছেন অনেকে।
পুলিশ জানিয়েছে, ইমরানের সমর্থনে অন্তত ৫৫ হাজার লোক বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেছে। নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইমরান খান নিজেই। আন্দোলন প্রতিহত করতে পুলিশ পিটিআই ও পিএটির প্রায় দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে বলে জানা গেছে। আর দল দুটি গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দাবি করে বলেছে, হামলা ও গ্রেফতার করে এই আন্দোলন প্রতিহত বা বন্ধ করা যাবে না। নওয়াজের পদত্যাগের পরেই আমরা ঘরে ফিরে যাব।
পাকিস্তানের ৬৭ বছরের ইতিহাসে ৩২ বছরই সরাসরি শাসন করেছে সেনাবাহিনী। আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া, জিয়াউল হক ছাড়াও এই তালিকার সর্বশেষ শাসক হচ্ছেন পারভেজ মোশারফ। ক্ষমতা দখল করলে কিছুই হয় না-বিশ্বের কাছে যেন এ উদাহরণ তৈরি করেছিল পাকিস্তান। তবে চলতি মেয়াদে ক্ষমতায় এসে নওয়াজ শরিফ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের দায়ে কাঠগড়ায় তুলেছেন পারভেজ মোশারফকে। ধারণা করা হয়েছিলো, এবার বুঝি ছেদ পড়ল সেই সেনাশাসনের ধারাবাহিকতায়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আশাও যেনো নিভু নিভু। গণতন্ত্রের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে সেনাবাহিনী। সুযোগ পেলেই উঠে বসবে ঘাড়ের উপর।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে উপমহাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ থেকে এখন পর্যন্ত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয় পায়নি পাকিস্তান। বার বার সামরিক শাসনের কারণে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কখনও শক্তিশালী হয়নি দেশটিতে। আর ইমরান খান যেভাবে নির্বাচিত সরকারের গদি ধরে টানা-হ্যাঁচড়া শুরু করেছেন তাতে সেই সম্ভাবনাও সুদূরপরাহত।