আরো ভয়ংকর আইসিস!

ইরাক ঘিরে ঐ অঞ্চলের রাজনীতি বা সামরিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বেশ নাটকীয়তা পেয়েছে। সামনের দিনগুলোতে হয়তো আরো দ্রুত পরিবর্তন দেখা যাবে সেখানকার পরিস্থিতির। কালো পোশাক ও পতাকাবাহী নিঞ্জা গেরিলারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল অংশ দখলে নেয়ার পরই আঞ্চলিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ইরাকের আইসিস গেরিলাদের রুখতে একদিকে তাদের উপর মার্কিন বিমান অভিযান শুরু হয়। অন্যদিকে, বাগদাদে চলে সরকার পরিবর্তনের কাজ। এরই মধ্যে এক মার্কিন সাংবাদিকের শিরশ্ছেদের ভিডিও চিত্র যেন থমকে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। বিমান হামলা বন্ধ না করলে এরপর কাকে শিরোশ্ছেদ করা হবে, তাও দেখানো হয়েছে ঐ ভিডিও চিত্রে। আর শিয়া-সুন্নি বিরোধ মেটানোর আশা নিয়ে বাগদাদে কাঙ্ক্ষিত সরকার গঠন প্রক্রিয়াও হঠাত্ স্থবির হয়ে গেছে। শিয়া বন্দুকধারীরা দিয়ালা প্রদেশের এক মসজিদে হামলা চালিয়ে অন্তত ৭০ জন সুন্নি মুসল্লিকে হত্যা করলে এ অচলাবস্থা তৈরি হয়। গত বুধবার জেমস ফলি নামের এক ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিককে শিরোশ্ছেদ করার ভিডিও ছবি ইন্টারনেটে ছাড়ে আইসিস জঙ্গিরা। ২০১২ সালের ২২ নভেম্বর তুরস্ক সীমান্তবর্তী সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কোন এক এলাকা থেকে নিখোঁজ হন জেমস ফলি। সিরিয়ার সংঘাতপূর্ণ এলাকার খবর সংগ্রহ করতে তাকে ভাড়া করেছিলো অনলাইন সংবাদ মাধ্যম গ্লোবাল পোস্ট। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সাংবাদিক ফলিকে দেখা গেছে অত্যন্ত নির্ভীক। বিভিন্ন দেশি গোয়েন্দা সূত্রে কেবল অপহরণের কথাই জানতে পেরেছিলেন তার স্বজনরা। কিন্তু কারা ফলিকে অপহরণ করেছে, আর কেনই বা করেছে তা জানা গেছে মাত্র এক সপ্তাহ আগে। গ্লোবাল পোস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফিলিপ বালবোনিকে ই-মেইল করে তা জানিয়ে দেয় খোদ জঙ্গিরা। ই-মেইল জুড়ে ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রচণ্ড আক্রোশ। জেমস ফলিকে শিরোশ্ছেদের পর জঙ্গিদের পরবর্তী শিকারকেও এক ঝলক দেখানো হয়। ৩১ বছর বয়সী ঐ জিম্মির নাম স্টিফেন সটলফ। তিনিও মার্কিন সাংবাদিক। টাইম ম্যাগাজিন, ফরেন পলিসি ও খ্রিশচিয়ান সাইন্স মনিটরে কাজ করতেন সটলফ। এর আগে বিভিন্ন সময়ে মিসর ও লিবিয়ায় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তবে বেশিভাগ সময়ই থাকতেন ইয়েমেনে। সটলফ তাই চোশত আরবিতে কথা বলতে পারেন। সিরিয়ার আলেপ্পোর কাছাকাছি কোন এলাকা থেকে ২০১৩ সালে অপহরণ করা হয় তাকে। ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, কমলা রংয়ের জামা পরিহিত ও পেছনে হাত বাঁধা সটলফের কলার ধরে এক জঙ্গি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ্য করে বলছে, ‘ওবামা, তোমার পরবর্তী পদক্ষেপের উপর নির্ভর করছে এই আমেরিকানের জীবন’। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, আইএস ও অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীর হাতে এমন জিম্মি রয়েছে কয়েক ডজন সাংবাদিক ও বিদেশি নাগরিক। নিজেদের রক্তপাত এড়িয়ে যদি শত্রুদেশে সরকার পতন ঘটানো যায়, তবে তা কেন করবে না যুক্তরাষ্ট্র! আরব বসন্তের সেই শিক্ষা নিয়েই ওবামা প্রশাসন হয়তো বসে ছিল দামেস্কের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের অপেক্ষায়। সিরিয়ার ভেতরে রক্তের বন্যা বয়ে গেলেও সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ইস্যুটি গত তিন বছর ধরে এড়িয়ে গেছে ওয়াশিংটন। কিন্তু সাংবাদিক ফলি হত্যার পর সিরিয়া ভূ-খণ্ডে হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিরিয়ায় আইসিস নেতাদের অবস্থান সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যুক্তি দিয়ে বলা হচ্ছে, আইসিস গেরিলাদের দখলে চলে যাওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সিরিয়ার সীমান্ত বলে এখন আর কিছু নেই। তাই জঙ্গিবিরোধী হামলার জন্য সেদেশের সরকারকে জানানোরও প্রয়োজন নেই। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী চাক হেগেল এবং সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চিফ প্রধান জেনারেল মার্টিন ডেম্পসি দু’জনই জানিয়েছেন, ইসলামিক স্টেট জিহাদিদের রুখতে সিরিয়ায় তাদের মূল ঘাঁটিতে হামলা চালানো জরুরি হয়ে পড়েছে। ইরাকে বিমান হামলা বাড়ানোর পাশাপাশি সিরিয়ায় যথোপযুক্ত অভিযান চালানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা। তারা জানিয়েছেন, একা নয়, বেশ কয়েকটি দেশকে সাথে নিয়ে এই লড়াই শুরু করতে চায় ওবামা প্রশাসন। তাহলে কি ইরাক ও সিরিয়া ইস্যুতে মার্কিন নীতির পরিবর্তন আবারো ঘটতে যাচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট আসাদের পক্ষে কাজ করছে কি-না, সে ব্যাপারেও প্রশ্ন উঠেছে। সিরিয়া ও ইরাক ইস্যুতে বড় ধরনের দোটানায় পড়েছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। কারণ তিনিই ইরাক ও আফগান যুদ্ধের সমালোচনা করে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিলেন। ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইরাক যুদ্ধ শেষ। এখন আবার সেই ওবামাকেই ক্ষমতার শেষ মেয়াদে নামতে হচ্ছে একই যুদ্ধে। তাহলে কি বাকি জিম্মিদের সাংবাদিক ফলির ভাগ্যই বরণ করতে হবে? আইসিস জঙ্গিদের হাতে নিহত সাংবাদিক জেমস ফলি নিহত হবার পর তার ভাই মাইকেল ফলি অভিযোগ করেন, জিম্মিদের মুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আরো অনেক কিছু করার ছিলো। কিন্তু সন্ত্রাস বিরোধী কট্টর মনোভাবের কারণেই ওয়াশিংটন তা করতে পারেনি। এক গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাত্কারে মাইকেল ফলি জানান, জঙ্গিদের আসল দাবি ছিল প্রায় ১৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মুক্তিপণ। তা দিতে পারলে হয়তো বেঁচেই যেতেন ফলি। মুক্তিপণ পেয়ে অনেক ইউরোপীয় জিম্মিকে জঙ্গিরা ছেড়ে দিয়েছে বলেও জানান মাইকেল।