ইসরাইলের যত ‘যুদ্ধবাজি’

১৯৪৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইল রাষ্ট্রটির জন্ম। জন্মের পর থেকেই দেশটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন সময় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। গত ছয় দশকের এই যুদ্ধের কারণে প্রাণ দিতে হয়েছে অগণিত বেসামরিক নাগরিককে। কিন্তু তারপরও বন্ধ হয়নি। তবে এগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় বর্তমানের হামলা ভয়াবহ আকারে রূপ নিয়েছে। এই হামলায় ইতোমধ্যে প্রাণহানির সংখ্যা দুই সহস্রাধিক ছাড়িয়েছে। পৌনে ৫শ শিশু মারা গেছে। কিন্তু থামছে না এই নৃশংসতা। বেসামরিক নাগরিকদের তুলনায় খুব কমই মারা যাচ্ছে ইসরাইলি সৈন্য কিংবা হামাসের নেতা। মিসর গত শনিবার তাত্ক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতির কথা বললেও বিষয়টি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। মেঘ কাটিয়ে কবে এই আলো গাজাবাসীরা দেখবেন তা এখনো বলা মুশকিল। কেবলই যুদ্ধেরই ছায়া। রাষ্ট্রটির জন্ম যুদ্ধের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে। ইসরাইলের জন্মের পর থেকে ইসরাইলের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক (সিএনএন)। ইসরাইলের স্বাধীনতা যুদ্ধ: ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে মিসরের ওপর আক্রমণ চালায় ইসরাইল। এই যুদ্ধ ১৯৪৭ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চলতে থাকে। ওই সময় আরব সেনাবাহিনী ইসরাইলের এই এলাকায় আক্রমণ চালায়। তখনো ইসরাইল রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই যুদ্ধে মিসর ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা দখল করে। যুদ্ধে ইসরাইলের বিরুদ্ধে মিসর, সিরিয়া, জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব এবং লেবানন ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করে। ফিলিস্তিনের এলাকায় ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরাইল নামের রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার পর এই আক্রমণ চালানো হয়। সাময়িক যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ইসরাইলকে ৭৫ ভাগ এলাকা দিতে হয়, যা আক্রমণের আগের চেয়ে আরো এক-তৃতীয়াংশ বেশি। এরপর ছয় লাখ আরববাসী ইসরাইল থেকে প্রতিবেশী দেশে পালায় এবং শরণার্থীতে পরিণত হয়। ছয় দিনের যুদ্ধ: ১৯৬৭ সালের ৫ জুন থেকে ১০ জুন পর্যন্ত ছয় দিনের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। ইসরাইলই প্রথম মিসর, জর্ডান এবং সিরিয়ায় আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে ইসরাইল মিসরের সিনাই উপদ্বীপ, গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং গোলান মালভূমি দখল করে। এতে ইসরাইলের অধিকৃত এলাকা আরো তিনগুণ বেড়ে যায়। ইসরাইল এবং মিসরের যুদ্ধ: ১৯৭০ সালে ইসরাইল মিসরের সুয়েজ খালে অবস্থান করা মিসরের সেনাবাহিনীর ওপর গোলা নিক্ষেপ করে। জুলাই ১৯৬৭ থেকে আগস্ট ১৯৭০ পর্যন্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পহেলা জুলাই ১৯৬৭ সালে সুয়েজ খালের কাছে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ইসরাইল সুয়েজ খাল থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ইসরাইলের কাছে এই যুদ্ধ ছিল ‘শক্তিক্ষয়ের’ যুদ্ধ। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় তিন মাসের যুদ্ধবিরতি করা হয় এবং পরে সমঝোতা হয়। ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ: মিসর এবং সিরিয়া ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ শুরু করে। এই যুদ্ধ ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। সুয়েজ খালে এবং গোলান মালভূমিতে ইসরাইলি সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা করে মিসর এবং সিরিয়া। এই দুই দেশ চেয়েছিল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে যে এলাকা ইসরাইল দখল করেছিল সেটি পুনরুদ্ধার করা। সৌদি আরব, কুয়েত, লিবিয়া, আলজেরিয়া, তিউনিশিয়া, সুদান, মরক্কো এবং জর্ডান মিসর ও সিরিয়াকে আর্থিক ও সামরিক দিক দিয়ে সহায়তা করে। সোভিয়েত ইউনিয়নও আরব দেশগুলোকে সহায়তা করে। যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দেয় ইসরাইলকে। যুদ্ধ বন্ধে এবং আঞ্চলিক শান্তি রক্ষায় জাতিসংঘ একটি প্রস্তাব পাস করে। দক্ষিণ লেবাননে আক্রমণ ইসরাইলের: ১৯৭৮ সালের ১১ মার্চ ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলের উপকূলীয় মহাসড়কে একটি বাস ছিনতাই করে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএলও)। এই সংগঠনটি তখন লেবানন সীমান্তে অবস্থান করছিল। ইসরাইল লেবাননে হামলা চালায় এবং দেশটির দক্ষিণাংশে ঢুকে পড়ে ও দক্ষিণাংশ দখল করে নেয়। জাতিসংঘ ইসরাইলের এই দখলদারিত্বকে অস্বীকার করে। ইসরাইল সেখান থেকে ওই সময় সৈন্য প্রত্যাহার করে। কিন্তু এলাকাটিকে নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে ব্যবহার করে এবং সেনাবাহিনী সেখানে শাসনকার্য পরিচালনা করে। এরপর ইসরাইল লেবাননের উত্তর সীমান্তেও হামলা করে। তখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ রেজুলেশন-৪২৫ পাস করে; যা এই সংকট থেকে রক্ষা করে। ইসরাইলের লেবানন আক্রমণ: ১৭ জুলাই ১৯৮১ সাল। ইসরাইল লেবাননের পশ্চিম বৈরুতে পিএলও সদর দফতরে বোমাবর্ষণ করে। এতে নিহত হয় ৩শ বেসামরিক নাগরিক। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি হয়। যুদ্ধবিরতির একদিকে ছিল ইসরাইল। অন্যদিকে ছিল সিরিয়া এবং পিএলও। ১৯৮২ সালের ৫ জুন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বলবত্ থাকে। কিন্তু ৬ জুন ইসরাইল ৬০ হাজার সৈন্য নিয়ে লেবাননে আক্রমণ করে। উদ্দেশ্য পিএলওকে ধ্বংস করা। কারণ ছিল ব্রিটেনে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূতকে হত্যার চেষ্টা। এরপর লেবাননের ইসরাইল সমর্থিত এবং নির্বাচনে বিজয়ী প্রেসিডেন্ট বাশির গিমায়েল শপথ নেয়ার কয়েকদিন আগে ১৯৮২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর নিহত হন। এর পরের দিন ইসরাইলি সেনারা পশ্চিম বৈরুতে ঢুকে পড়ে। এর পরের দিন খ্রিস্টান মিলিশিয়ারা লেবাননে ফিলিস্তিনিদের শাবরা ও শাথিলা নামের দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে গণহত্যা চালায়; যাতে ৮শ শরণার্থী নিহত হন। এই হামলা বন্ধে ইসরাইলের কোনো ভূমিকাই ছিল না। এই ঘটনার পর শিয়াপন্থী জঙ্গি সংগঠন হিজবুল্লাহর জন্ম হয়। সংগঠনটি বৈরুত, বেকাআ এবং দক্ষিণ লেবাননে একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই গোষ্ঠীটিকে ইরান এবং সিরিয়া সমর্থন দেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল লেবাননে একটি শিয়াপন্থী সরকার গঠন করা এবং ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ হাসিল করতে না দেয়া। প্রথম ফিলিস্তিন ইন্তিফাদা বা অভ্যুত্থান: ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর এবং গাজায় ইসরাইলি শাসনের প্রতিবাদে ১৯৮৭ সালের ৮ ডিসেম্বর যুবকরা ব্যাপক বিক্ষোভ গড়ে তোলেন। প্রথমদিকে তারা ইসরাইলের সেনাদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ, বিক্ষোভ, দেয়াল লিখন, রাস্তায় অবরোধ দেন। ইসরাইলি সেনাদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বৃদ্ধি এবং অনেকে মারা যান। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলতে থাকে। ১৯৯৪ সালে অসলো চুক্তির আওতায় ইসরাইল পশ্চিম তীর এবং গাজার অধিকাংশ এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। এই এলাকার শাসনভার ফিলিস্তিনের জাতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। দ্বিতীয় ইন্তিফাদা বা অভ্যুত্থান: ফিলিস্তিনিরা ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়েন। কারণ তারা দেখেন আস্তে আস্তে ইসরাইল গাজা এবং পশ্চিম তীরের অনেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে। তারা স্থায়ী একটি শান্তি চুক্তির আশায়ও ছিল। কিন্তু সেই চুক্তিটি হচ্ছিল না। দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয় ২০০০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের পর। এই দিনে ইসরাইলের নেতা অ্যারিয়েল শ্যারন জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ পরিদর্শন করেন। এই মসজিদটি ইহুদি এবং মুসলমানদের পবিত্র কেন্দ্র। শ্যারন ওইদিন ঘোষণা দেন, এই মসজিদটি (ইসরাইলের ভাষায় তাদের উপাসনালয়) তাদের ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এরপরই শুরু হয় সহিংসতা। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে ফিলিস্তিনদের লড়াই চলতে থাকে। দীর্ঘ ৫ বছর ধরে চলতে থাকা এই সহিংসতায় ৩ হাজার ফিলিস্তিন নাগরিক এবং এক হাজার ইসরাইলি মারা যায়। মিসরের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয় এবং ইসরাইল গাজা থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে সব সৈন্য এবং ইহুদি বাসস্থান সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনার কথা জানায়। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর গাজায় ইসরাইলের পতাকা নামিয়ে ফেলা হয়। এর মাধ্যমে সেখানে ৩৮ বছরের ইসরাইলি আধিপত্যের অবসান হয়। তবে ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, ইসরাইল গাজার আকাশপথ, পানিপথ এবং প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ইসরাইল বলছে, নিরাপত্তার স্বার্থেই এটা করা হচ্ছে। ২০০৬ সালের যুদ্ধ: ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনি জঙ্গিদের মধ্যকার স্থানীয় পর্যায়ের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে সীমান্তে। এর সঙ্গে যোগ দেয় লেবাননের হিজবুল্লাহ। ইসরাইলের তিন সৈন্য নিহত এবং দুইজন অপহরণের পর ইসরাইল হিজবুল্লাহর ওপর ব্যাপক আকারে অভিযান চালায়। ইসরাইলি বাহিনী বৈরুতের আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে হামলা চালায়। হিজবুল্লাহ কেবল রকেট হামলা চালায়। অবশেষে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ওই সময়ের সংঘর্ষ বন্ধ হয়। অপারেশন কাস্ট লিড: এরপর ২০০৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর ইসরাইল হামাসের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন কাস্ট লিড’ নামে একটি অভিযান চালায়। বিপরীতে হামাস চালায় রকেট হামলা। প্রথম দিনের হামলায়ই নিহত হয় ফিলিস্তিনের ২শ নাগরিক। পহেলা জানুয়ারি ২০০৯ সালে ইসরাইলি হামলায় হামাসের নেতাসহ আরো অনেকে নিহত হয়। ৩ জানুয়ারি স্থল অভিযান চালায় ইসরাইল। এর মাধ্যমে ইসরাইল গাজার উত্তরাংশ দখল করে নেয়। এই হামলায় ১৩শ ফিলিস্তিনি এবং ১৩ জন ইসরাইলি নিহত হয়। ২০১২ সালের ইসরাইলি হামলায় ১৬৫ জন ফিলিস্তিন নাগরিক নিহত হয়। হামাসের হামলায় ইসরাইলের ছয়জন সৈন্য নিহত হয়। ওই সময় ইসরাইল গাজায় ১৫শ বিমান হামলা চালায় বলে দেশটির সেনাবাহিনী জানায়।