আঁধার ঘরে চাঁদের আলো
কাউনিয়া (রংপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০১৪, ২১:২৭
শতবাধা ও দরিদ্রতা দমাতে পারেনি রংপুরের কাউনিয়ার ৬ অদম্য মেধাবীকে। দরিদ্রতাকে জয় করে এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে ওরা তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ওরা কেউ দিনমজুর, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও পান দোকানদারের সন্তান। তাদের এ সাফল্যে দুচোখে এখন এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন থাকলেও অর্থাভাবে ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় সমাজের বিত্তবানরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেই ওদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ সম্ভব।
ব্যাংক কর্মকর্তা হতে চান সেলিম ইসলাম
কাউনিয়া ডিগ্রী কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে অংশ নিয়ে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে মোঃ সেলিম ইসলাম। উপজেলার নিজপাড়া গ্রামের দিনমজুর আজিম উদ্দিনের পুত্র সে। দিনমজুর পিতার আয়ে সংসারের খরচ যোগানোই যেখানে কষ্টকর সেখানে সেলিমের উচ্চশিক্ষার খরচ জুটবে কিভাবে এ চিন্তায় বিভোর তার বাব-মা। সেলিম এতোদিন তার পড়াশুনার খরচ চালিয়েছে প্রাইভেট ও মাঝে মাঝে বাবার সাথে দিনমজুরির কাজ করে। ব্যাংকের পদস্থ কর্মকর্তা হতে চায় সেলিম, কিন্তু দরিদ্র পরিবারের পক্ষে কিভাবে সম্ভব তা তারা জানে না।
ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখেন রিপন মিয়া
তিস্তা ডিগ্রী কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে মোঃ রিপন মিয়া। সে লালমনিরহাট জেলার রাজপুর গ্রামের কৃষি শ্রমিক মনসুর আলীর পুত্র। দিনমজুরের কাজ করে ২ ছেলে ৩ মেয়ের পড়াশোনা করাচ্ছেন। অর্ধাহার-অনাহারসহ সব প্রতিবন্ধকতাকে পদদলিত করে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রিপন মিয়া। মা রেজুনা বেগম ছেলের সাফল্যে খুশি হলেও ভবিষ্যত্ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। ছেলে চায় ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা হতে কিন্তু দরিদ্র পরিবারের পক্ষে কিভাবে তা সম্ভব।
ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন দিনমজুর কন্যা তামান্না
কাউনিয়ার পূর্ব চাঁন্দঘাট গ্রামের দিনমজুর সিরাজুল ইসলামের কন্যা তামান্না। সে নিজপাড়া আহমাদিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে বিজ্ঞান শাখায় এবার আলিম পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। মা রোকেয়া বেগম টুপি সেলাইয়ের কাজ ও বাবা দিনমজুরি করে ২ ছেলে ও ২ মেয়ের পড়ার খরচসহ ৭ জনের সংসার অতিকষ্টে চালিয়ে আসছেন। মা রোকেয়া বেগম জানান, মেয়ের স্বপ্ন ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু দিনমজুরির কাজ করে তা কি সম্ভব?
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন মমিনা আক্তারের
পক্ষাঘাতগ্রস্ত পিতার কন্যা প্রমাণ করেছে ইচ্ছা আর অধ্যবসায় থাকলে সাফল্যের শীর্ষে ওঠা যায়। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মডেল কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। মায়া বাজার আদর্শ পাড়া গ্রামের মতিয়ার রহমান ও মাতা সাজেদা বেগমের কন্যা সে। নিজস্ব বসতভিটা ছাড়া আর কিছু নেই তাদের। মমিনা আক্তারের মা সাজেদা বেগম জানায়, তার মেয়ের স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। কিন্তু পক্ষাঘাতগ্রস্থ পিতার পক্ষে মেয়ের স্বপ্ন পূরণ সম্ভব কি?
প্রভাতী রানীর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন কি পূরণ হবে
কাউনিয়া কলেজ থেকে বিজ্ঞান শাখায় জিপিএ-৫ পেয়েছে প্রভাতী রানী। সিবু ভেবারঝাড় গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রভাশ চন্দ্র ও মা শ্রীমতি ভদ্রা রানীর বড় মেয়ে প্রভাতী। বাড়ি থেকে প্রতিদিন ৬-৭ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হতো কলেজে। বাবা গ্রামে পান দোকান ও মা সেলাইয়ের কাজ করে কোনমতে তাদের ৪ জনের সংসার চালায়। দরিদ্র পিতা এতোদিন অতিকষ্টে দুই বোনের পড়ার খরচ জোগালেও এবারে পিতা সাফ জানিয়ে দিয়েছে তার পড়াশুনার খরচ আর দিতে পারবে না। প্রভাতীর স্বপ্ন ডাক্তার হবার। কিন্তু দরিদ্র পিতার অভাব-অনটনের সংসারে সে স্বপ্ন কি পূরণ হবে?
দরিদ্রতা দমাতে পারেনি দিনমজুর কন্যা শরিফাকে
দরিদ্রতা ও অর্থ সংকট দমিয়ে রাখতে পারেনি লালমনিরহাট সদর উপজেলার সেকুর টারী গ্রামের দিনমজুর ওয়াজেদ আলীর কন্যা শরিফা বেগমকে। চরম অর্থ সংকটের মাঝেও শরিফা তিস্তা ডিগ্রী কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষা নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় শরিফা। মা আফরোজা বেগম জানান, মেয়ে চায় ব্যাংক কর্মকর্তা হতে, কিন্তু দরিদ্র পরিবারের পক্ষে কিভাবে তা সম্ভব। তিনি মেয়ের জন্য সকলের দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেন।