এক দেশে দুই আইন

মানহানিকর সংবাদ প্রকাশের বিচারের ক্ষেত্রে দেশে দুই ধরনের আইন চালু রয়েছে। সংবাদপত্রের মুদ্রণ সংস্করণে প্রকাশিত কোন প্রতিবেদনের জন্য এক ধরনের এবং অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত একই প্রতিবেদনের জন্য রয়েছে অন্য ধরনের বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা। মুদ্রণ সংস্করণের বিচার হচ্ছে ফৌজদারি আইনে এবং অনলাইন সংস্করণের বিচার হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। একই অপরাধে মুদ্রণ সংস্করণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অনলাইন সংস্করণের শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছরের জেল। মুদ্রণ সংস্করণের ক্ষেত্রে অপরাধের জামিন আছে কিন্তু অনলাইন সংস্করণের ক্ষেত্রে করা হয়েছে জামিন অযোগ্য বিধান। আদালত কর্তৃক ইস্যুকৃত গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া মুদ্রণ সংস্করণে মানহানিকর প্রতিবেদনের জন্য পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে না। অন্যদিকে অনলাইন সংস্করণের অপরাধের ক্ষেত্রে বিনা পরোয়ানায় পুলিশ গ্রেফতার করতে পারবে। আনীত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেও মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জামিন মিলবে না। মুদ্রণ সংস্করণে প্রকাশিত কোন মানহানিকর প্রতিবেদনের জন্য যে কোন নাগরিক আদালতের বিচারপ্রার্থী হতে পারেন। কিন্তু অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত একই প্রতিবেদনের জন্য পুলিশ রিপোর্ট ছাড়া কোন অপরাধ বিচারের জন্য গ্রহণের ক্ষমতা আদালতের নেই। আইনের প্রয়োগও স্বেচ্ছাধীন হয়ে পড়েছে। ফলে সরকার বা পুলিশ চাইলে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিচ্ছে, কারো বিরুদ্ধে নিচ্ছে না। আইন বিশেষজ্ঞরা অভিন্ন অপরাধের বিচার পরিচালনায় ভিন্ন ভিন্ন আইনের প্রয়োগকে সংবিধান পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন। তারা একে সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের সমতার নীতির লংঘন বলে দাবি করেছেন। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ২০০৬ সালের ৮ অক্টোবর জাতীয় সংসদে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ পাস হয়। এই আইন পাসের ২০ দিনের মাথায় বিএনপি ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়। ফলে তাদের শাসনামলে তারা আইনটি প্রয়োগ করে যেতে পারেনি। তবে সেই সময়ের আইনে সর্বনিম্ন কারাদণ্ডের সময়সীমা ছিলো না। অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী যে কোন ধরনের দণ্ড প্রদানের ক্ষমতা আদালতের ছিলো। একইসঙ্গে জামিনের ক্ষমতাও ছিলো আদালতের হাতে। অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী মামলার যে কোন পর্যায়ে আদালত আসামিকে জামিন দিতে পারতো। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর মহাজোট সরকার ২০১৩ সালে এই আইনে সংশোধনী আনে। একইসঙ্গে আইনের প্রয়োগও শুরু হয়। ইতিমধ্যে কয়েকটি সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। ২০১৩ সালের সংশোধিত আইনে এ সংক্রান্ত অপরাধসমূহকে অ-জামিনযোগ্য এবং আমলযোগ্য ঘোষণা করা হয়। ফলে এই আইনে গ্রেফতারকৃত কোন ব্যক্তির মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জামিন মিলছে না। আমলযোগ্য অপরাধ হওয়ায় পরোয়ানা ছাড়াই পুলিশ যে কাউকে গ্রেফতার করতে পারছে। সংবাদপত্রে কারো বিরুদ্ধে কোন মানহানিকর সংবাদ প্রকাশ হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫০০, ৫০১ ও ৫০২ ধারায় মামলা হয়ে থাকে। এই তিনটি ধারার অপরাধ জামিন এবং মীমাংসাযোগ্য। আর সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড। এখন দেশের প্রায় প্রতিটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন সংস্করণ রয়েছে। মুদ্রণ সংখ্যায় যা প্রকাশিত হয় তা অনলাইন সংস্করণেও হুবহু পাওয়া যায়। কিন্তু অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত একই প্রতিবেদনের জন্য আলাদা বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যা সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের লংঘন। ওই অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম আসাদুজ্জামান বলেন, এটি সুস্পষ্টভাবে আইনের সমতার নীতির লংঘন। একই অপরাধের জন্য এক দেশে দুই ধরনের আইন থাকতে পারে না। তিনি বলেন, সম্প্রতি একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা হয়েছে। মূলত সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে মুদ্রণ সংস্করণে। কিন্তু ওই প্রতিবেদনটি অনলাইন সংস্করণে থাকায় পুলিশ সাধারণ আইনে না গিয়ে ওই আইনের আশ্রয় নিয়েছে। এটি একটি কঠোর আইন। এই আইনে মামলা হলে জামিন নেই এবং মীমাংসা করা যায় না। সাধারণত সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয় তার অধিকাংশই আপোষ-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়ে থাকে। আসাদুজ্জামান বলেন, তথ্য প্রযুক্তি আইনের ফলে সংবাদপত্র একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে। এতে করে তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। তাছাড়া এখানে হবে ‘পিক এন্ড চুজ’ নীতির অবলম্বন। সরকার চাইলে কারো বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ করবে, কারো বিরুদ্ধে করবে না। সরকারের জন্য এক ধরনের ব্যবস্থা আর সাধারণ নাগরিকদের জন্য অন্য ধরনের ব্যবস্থা। সাধারণ নাগরিকদের মানহানি হলে তাদেরকে যেতে হবে ফৌজদারি কার্যবিধি আইনে। আর সরকার করবে তথ্য প্রযুক্তি আইনে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মূল সমস্যা (প্রতিবন্ধকতা) হচ্ছে ৫৭ ধারা। এই আইনে অপরাধ সংঘটনের যে বর্ণনা দেয়া আছে তাতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থাত্ ৫৭ ধারায় এমনভাবে অপরাধ সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যেমন ইন্টারনেটে যে কোন কর্মকাণ্ডকেই এই আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে গণ্য করার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েই আছে। এরকম একটি আইনে এতদিন যে রক্ষাকবচ (সেফগার্ড) ছিলো এই সরকারের আনীত সংশোধনীর ফলে সেটিও উঠে গেছে। অর্থাত্ এতদিন মামলা করতে হলে সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হতো। এখন আর অনুমতির প্রয়োজন লাগবে না। ব্যারিস্টার তানজীব বলেন, মানুষের বাক স্বাধীনতার জায়গাটি সংবিধানে যেটিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে সেই অধিকার হরণ হচ্ছে চরমভাবে। এই আইন আপনাকে বারিত করছে না যে আপনি ইন্টারনেটে ব্লগিং বা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিবেন না। কিন্তু যখন আপনি একাজগুলো করতে যাবেন তখনই আপনার মনে এক ধরনের ভীতিবোধ কাজ করবে। ওই ভীতি কাজ করা বা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করাটাই তো বাক স্বাধীনতার পরিপন্থী। আমি তো মনে করি এই আইনে এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে আছে। যা আমাদের বাক স্বাধীনতাকে খর্ব করছে। যেহেতু বাক স্বাধীনতা খর্ব করছে সেহেতু আইনটি সংবিধান বিরোধী। এক কথায় যদি বলি তাহলে এই আইনের ৫৭ ধারা সংবিধান বিরোধী। এই সংবিধান বিরোধী আইনে পুলিশকে দেয়া হয়েছে ব্যাপক ক্ষমতা। যা মানুষের বাক স্বাধীনতাকে হরণ করবে। প্রসঙ্গত, ৫৭ ধারায় বলা আছে, (১) কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসত্ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ। ব্যারিস্টার তানজীব বলেন, আগের আইনে সর্বোচ্চ সাজার বিষয়টি উল্লেখ ছিলো। কিন্তু ন্যূনতম সাজার বিষয়টি ছিলো না। কারণ জুতা চুরির জন্য তো কারো ফাঁসি হতে পারে না। চুরির অপরাধের জন্য যেই সাজা সেই সাজাই তার প্রাপ্য হবে। কিন্তু এখন যদি আপনি বলেন, ফেসবুকে আপনার দেয়া স্ট্যাটাসের ফলে বা অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ফলে কারো মানহানি হয়েছে তাহলে মানহানির পরিমাণ অনুযায়ী সেই পরিমাণ শাস্তি হতে পারতো। মানহানি কতটুকু হয়েছে সেটি তো আদালতের বিচার্য বিষয়। কিন্তু এই আইনে ন্যূনতম সাজা ৭ বছর উল্লেখ করে দিয়ে কোর্টের হাত-পা বেঁধে দেয়া হয়েছে। কারণ কাউকে যদি সাজা দিতে হয় তাহলে তাকে ৭ বছর সাজা দিতে হবে। ন্যূনতম সাজার বিধান করে নাগরিকদের এক ধরনের অসহায় অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সংশোধনীতে আইনের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইন্টারনেট ব্যবহার বৃদ্ধি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে আরো এগিয়ে নেয়ার জন্য এই আইন। কিন্তু আইনে শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে কিভাবে আপনি এর ব্যবহারকে বৃদ্ধি করবেন? কিভাবে জনগণকে ডিজিটালাইজেশনে উত্সাহিত করবেন? যখন ইন্টারনেট ব্লগিং বা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে শাস্তি হবে তখন কেউ কি আর দ্বিগুণ উত্সাহ নিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করবেন? ব্যারিস্টার তানজীব বলেন, মর্জি মাফিক আইন প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে এই সংশোধনীর ফলে। কারণ আপনার যাকে পছন্দ হলো না তাকে ধরলেন এবং সাজার ব্যবস্থা করলেন আর যাকে পছন্দ হলো তাকে ধরলেন না। এতে করে আপনি নিপীড়নের জন্য আইনটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলেন। কিন্তু আইনের আসল উদ্দেশ্য কখনোই এটি হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, মুক্ত বুদ্ধি ও মুক্ত চিন্তার সমাজ বিনির্মাণে এই আইন একটি বড় বাধা হয়ে দেখা দেবে। পুলিশকে যে অসীম ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তা পুলিশকে আরো বেপরোয়া করবে। পুলিশ চাইলে যে কাউকেই এই আইনে মামলা দিয়ে দীর্ঘকাল কারাগারে রাখতে পারবে।