পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারো অস্থিরতা

ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি শেষে চলতি মাসেই সবাই ফিরেছিল ক্যাম্পাসে। স্বাভাবিকভাবেই চলছিল ক্লাস-পরীক্ষা। ঈদুল আযহার ছুটির আগেই শেষ করতে হবে বেশ কয়েকটি বিভাগের কোর্স। কিন্তু গত রবিবার ছাত্র রাজনীতির কারণে সৃষ্ট অস্থিরতায় বন্ধ হলো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি)। ফলে কয়েকদিনের ব্যবধানে আবারও বাড়ি ফিরতে হলো ইবি শিক্ষার্থীদের। একই দিন ছাত্রলীগ-ছাত্র শিবিরের সংঘর্ষের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ না হলেও ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আতংকে রয়েছেন। যে কোন সময় ফের সংঘর্ষ বাধতে পারে এমন আশংকা তাদের। একই দিনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্মীদের একটি অংশ হামলা চালায় বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদদাতা বা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত শিক্ষার্থীদের ওপর। আর গতকাল সোমবার রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও (রুয়েট) ছাত্রলীগ-শিবির ছিল মুখোমুখি। বলা যায়, সব মিলিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবারও দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। গত বছর আগস্ট মাসেও একই সঙ্গে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা চলছিল। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের হামলা, মার্চে হল উদ্ধারের দাবিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, জুলাইয়ে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দাবিতে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করা, জুনে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াসহ নানা কারণে অস্থির ছিল শিক্ষাঙ্গন। বন্ধ ছিল ক্লাস-পরীক্ষা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করতে হবে। পরীক্ষা ২৩ নভেম্বর। আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুদের আবেদন শুরু হবে ৪ সেপ্টেম্বর। ভর্তি পরীক্ষা ২৭ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত। ভর্তির আবেদনের জন্য সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত না হতে হলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতংক তৈরি হয়েছে। অস্থিরতার মধ্যে অনেকেই পরীক্ষায় অংশ নিতে চাইবে না বা কর্তৃপক্ষকে পরীক্ষা পিছিয়ে দিতে হবে। গত বছর অস্থিরতার কারণে যথাসময়ে পরীক্ষা নিতে পারেনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের হামলার প্রতিবাদে রবিবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে ইবি ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করার চেষ্টা করে ছাত্রশিবির। শিবিরের বিক্ষোভ মিছিল চলাকালে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শিবিরের মিছিলের প্রতিবাদে ছাত্রলীগ পাল্টা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় মিছিলটি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি বাসে ভাংচুর চালায়। ছাত্রলীগ উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের গাড়ি লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা চালালে পুলিশ এতে বাধা দিলে ছাত্রলীগ নেতারা পুলিশের সাথে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। এসময় ছাত্রলীগের হামলায় পুলিশের ৫ সদস্য আহত হন। এ ঘটনার কিছুক্ষণ পরে ছাত্রলীগ নেতারা ডায়না চত্বর থেকে চলে এসে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থানরত আরেক পুলিশ সদস্যকে মারধর করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ সদস্যরা ছাত্রলীগকে লক্ষ্য করে অন্তত ১৫টি গুলি নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ছাত্রলীগের মানববন্ধনে ছবি তোলার সময় এক শিবির কর্মীকে পিটিয়ে পুলিশে দেয়ার জের ধরে রবিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির ও ছাত্রলীগের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি, ককটেল বিস্ফোরণ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় উভয় গ্রুপের মধ্যে অন্তত ৫০ রাউন্ড গুলি বিনিময় এবং ২০টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। রাতে শিবির নিয়ন্ত্রিত সোহরাওয়ার্দী হলে তল্লাশি চালিয়ে ১৩টি পেট্রোল বোমা ও দু’টি ককটেল উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গতকাল এক জরুরি সভায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর মো. সিরাজ উদ্দৌলাহ বলেন, জরুরি সভায় রবিবারের ঘটনা তদন্তের জন্য শামসুন নাহার হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে হলের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কমিটি প্রতিবেদন না দেয়া পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী হলে কোন শিক্ষার্থী থাকতে পারবে না। সেখানে পুলিশ সদস্যরা অবস্থান করবেন। এদিকে রবিবারের ঘটনায় ক্যাম্পাসে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। গতকাল সকালে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রলীগ। এছাড়া সকালে শিবির সন্দেহে দুই শিক্ষার্থী ও এক সংবাদকর্মীকে মারধর করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টের সামনে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী হাসান, দৈনিক ভোরের ডাকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি পরান এবং প্রবাসী কলোনির সামনে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী রাজু মারধরের শিকার হন। ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল রুয়েটের শহীদ লে. সেলিম হলের ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বহিরাগত ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতি নিয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থান নেয়। দুপুর দেড়টার দিকের এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। চলতি বছর জুলাইয়ে চাকরি স্থায়ীকরণ ও বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম নুর-উন-নবীকে অবরুদ্ধ করে ধর্মঘট করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ নিয়ে প্রায় ১৫ দিন অচল ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে বর্ধিত ফি প্রত্যাহারের দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়। এ সময় পুলিশ রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে। এতে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়। এ নিয়ে সপ্তাহজুড়ে আন্দোলন চলে ক্যাম্পাসে। পরে এক মাস ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে দুটি মামলা করা হয়। বেদখল হওয়া হল উদ্ধার ও নতুন হল নির্মাণের দাবিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলে প্রায় পুরো মাস জুড়ে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। এ সময় বেশিরভাগ ক্লাস পরীক্ষা হয়নি। চলতি মাসেই পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ৫ জন আহত হয়েছে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) গত ১৬ জুন আনুমানিক রাত ৮টায় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়। মারামারির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১২ শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।