মশিউর রহমান ওরফে মিশু, রনি দালাল ও নাজিম শেখ। তাদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং। তিন জনই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এর মধ্যে নাজিম শেখ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের দফাদার। এর পাশাপাশি গত বেশ কয়েক বছর ধরে এলাকার মানুষ তাকে চেনে মোটরসাইকেল ব্যবসায়ী হিসেবে। কিন্তু সব মোটরসাইকেল যে ঢাকা থেকে চুরি হওয়া মোটরসাইকেল এ খবর কেউ কেউ জানত না। ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশ তাকে গ্রেফতারের পরই এলাকাবাসী জানতে পারে—নাজিম শেখ চোরাই মোটরসাইকেল কারবারি। সম্প্রতি মহানগর পুলিশ নাজিম শেখ ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করে ১০টি উন্নতমানের চোরাই মোটরসাইকেল। গোয়েন্দা পুলিশ তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছে রাজধানী থেকে কীভাবে মোটরসাইকেল চুরি করে তার বিস্তারিত কাহিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান।
এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, চার চাকার গাড়ি কেনার সামর্থ্য যাদের নেই মোটরসাইকেল তাদের জন্য শুধু একটি দ্বিচক্র যানই নয়, একটি প্রয়োজনীয়তা, বাস্তবতা ও একটি স্বপ্ন। মোটরসাইকেলটি চুরি হয়ে গেলে স্বপ্নটা শুধু ভেঙে যায় না, প্রয়োজনীয়তা এবং বাস্তবতা হয়ে পড়ে রুক্ষ, কঠিন। প্রতিটি চুরির ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা হয় উদাসীন আর চোরেরা হয় অতি চালাক। তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃত নাজিম শেখ দফাদার জানিয়েছেন, তিনি সরাসরি মোটরসাইকেল চুরি করেন না। তবে চোররা মোটরসাইকেল চুরি করে সরাসরি তার কাছে বিক্রি করে। মোটরসাইকেলের মান অনুয়ারী প্রতি মোটরসাইকেল ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় ক্রয় করে। পরে এসব মোটরসাইকেল দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় বিক্রি করে থাকে। যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধরতে না পারে। এলাকার দফাদার বলে, কেউ এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। রাজধানী থেকে যেসব মোটরসাইকেল চুরি হয় তার সিংগভাগই নাজিম ক্রয় করে থাকেন। গত কয়েক বছরে তিনি কম করে হলেও চোরাই দুই শতাধিক মোটরসাইকেল বেচাকেনা করেছেন।
এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, মিশু ও রনি দালাল সরাসরি মোটরসাইকেল চুরির সঙ্গে জড়িত। তারা জানিয়েছেন, একটি মোটরসাইকেল চুরি করতে তাদের দুই জন সদস্য স্পটে থাকে। এক জনের কাজ হচ্ছে মোটরসাইকেল মালিকের গতিবিধি লক্ষ করা, অন্য জন মোটরসাইকেলটি কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করে। মাত্র ৪-৫ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে মাস্টার চাবি দিয়ে মূল তালা খুলে ঘাড়তালা বা লক ভেঙে মোটরসাইকেল চালু করে এবং সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে যায়। তারা চুরি করা মোটরসাইকেল নিয়ে নাজিম শেখের কাছে বিক্রি করত। নাজিম তা কিছুদিন তার নিজের কাছে রেখে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করে আসছিলেন। গ্রেফতারকৃত আসামিরা স্বীকার করে যে তারা দীর্ঘ তিন বছর যাবত্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল, টিএসসি চত্বর, নগর ভবন, গুলিস্তান, ধানমন্ডি লেক, কাঁচপুর, গাউছিয়া, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতি সপ্তাহে দুই-তিনটি করে মোটরসাইকেল চুরি করে। এ ব্যাপারে শাহবাগ থানায় চারটি, বংশাল থানায় একটি, নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় একটি, আড়াইহাজার থানায় একটি ও দোহার থানায় একটি মামলা রয়েছে। এছাড়া এ চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
উপকমিশনার মশিউর রহমান বলেন, আসামিদের তথ্যমতে মুন্সীগঞ্জের মোল্লারচর, সিপাহী পাড়া, বেতকা, মুক্তারপুরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১০টি উন্নতমানের চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।