জানা যায়, দারিদ্র্য বিমোচনকে প্রাধান্য দিয়ে আসছে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট। এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৭৫ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। আয় ৪ লাখ ৩৩ হাজার এবং ঘাটতি ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। করোনার কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ লাখ ৯২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। করোনার কারণে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধিও ৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কাটছাঁট করে ৬ দশমিক ১ শতাংশে আনা হয়েছে।
গত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। প্রতি বছর বাজেটের আকার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলেও বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে বাড়েনি। বিনিয়োগ না বাড়ার ফলে কর্মসংস্থান এমনিতেই বাড়েনি; তার ওপর করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান লোক ছাঁটাই এবং বিদেশ থেকে প্রবাসীরা দেশে ফেরায় বেকারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনায় লকডাউনের কারণে নিম্ন-আয়ের মানুষেরা কাজ হারিয়ে আর্থিক সংকটের কারণে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছিল। অর্থনৈতিক সংকট ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠে মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছিল। কিন্তু করোনার তৃতীয় ঢেউ আবার হানা দিয়েছে। করোনার প্রভাবে নতুন করে কর্মহীন হয়ে পড়েছিল প্রায় দেড় কোটি মানুষ। সারা দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ কর্মী কাজ হারিয়েছেন, যারা এখনো পুরোপুরি কাজে ফিরতে পারেননি। ২০১৯ সালে দেশে ২০.৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। কিন্তু বিভিন্ন হিসাবে তা ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। অর্থাত্ করোনার কারণে নতুন করে ১০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। ফলে তাদের ক্রয়ক্ষমতাও কমে গেছে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে অন্তত ৩ কোটি ২৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দারিদ্রে্যর হার ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫-এ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে ১ কোটি ১৩ লাখ। বাস্তবে আদৌ কি তা সম্ভব হবে? মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য তথা দক্ষ জনবল তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। এজন্য এ খাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। ২০২০ সালের প্রথম দিক থেকেই কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে দেখা দেওয়ায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব না হলেও অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে সরকার বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদানের মাধ্যমে অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে করোনাকালে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্হবির থাকলেও জানা যায়, এ সময়ে নতুন কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৪ হাজার। করোনার প্রভাবে দারিদ্রে্যর হার বাড়লেও ধনিক শ্রেণির সংখ্যাও সমহারে বেড়েছে। কিন্তু এসব নব্য ধনীরা তাদের অর্থসম্পদ দেশে বিনিয়োগ না করে দেশ থেকে অর্থ পাচার করছে। ফলে অর্থ পাচারের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। করোনায় শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্ব জুড়ে ধনী-গরিব বৈষম্য বেড়েছে। করোনা মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের জন্য যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সুষ্ঠু বণ্টন হয়নি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প খাতে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল, তার মাত্র ৪০ শতাংশ বিতরণ হয়েছে বলে জানা যায়। অথচ স্বল্প পঁুজিতে এই খাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সব থেকে বেশি। কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বাজেটে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করে বেকারদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মে নিয়োগ করে উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে উত্পাদনপ্রক্রিয়া সচল থাকবে। অর্থনীতি চাঙ্গা হবে এবং প্রবৃদ্ধিও বাড়বে। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্প খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বল্প সুদে জামানতবিহীন ঋণের দ্রুত ব্যবস্থা করা; বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা। তাছাড়া শুধু অর্থ বরাদ্দ রাখলেই হবে না, বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে সুষ্ঠুভাবে বণ্টন হয়, সেদিকে কড়া নজরদারি ও সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ না পেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হবে না। কর্মসংস্থান ও উত্পাদন বৃদ্ধি না পেলে চলমান অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হবে। করোনা পরিস্হিতির কারণে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে বেকার, দরিদ্র নারী ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনজীবিকা উন্নয়নের লক্ষ্যে বাজেটে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমাদের দেশে শ্রমবাজারে নারীর সংখ্যা এমনিতেই কম। করোনাকালে নারীরা আরো বেশি কর্মহীন হয়ে পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বাজেটে এসব কর্মহীন বেকার নারীদের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখতে হবে, যাতে করে তারা স্বল্পসুদে ঋণ নিয়ে ঘরে বসেই কুটির শিল্পসামগ্রী তৈরি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রয়ের মাধ্যমে তাদের জীবনজীবিকা নির্বাহ করতে পারে। আশার কথা, জানা যায়, আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচনে ১ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা এবং নারী উন্নয়নে ৭৪৯ কোটি টাকা সম্ভাব্য ব্যয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। এ বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচন ও নারী উন্নয়ন কর্মসূচিও থাকবে যথাক্রমে ৬৮১ ও ২৭৬ কোটি টাকা। বিভিন্ন খাতে সম্ভাব্য বরাদ্দ দেখা গেলেও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথকভাবে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। অথচ দেশে মোট জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ প্রবীণ। বিরাটসংখ্যক এ জনগোষ্ঠীর কথা কেউ তেমন করে ভাবে না। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত বা দরিদ্র শ্রেণির প্রবীণ জনগোষ্ঠী এ করোনাকালে সবচেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এরা পরিবার বা সমাজে একবারেই অপাঙ্ক্তেয়। করোনার অভিঘাতে এ জনগোষ্ঠী সর্বাধিক জর্জরিত। করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রবীণ ব্যক্তিরাই আক্রান্ত হয়েছেন বেশি। ফলে যথাযথ চিকিত্সা ও সেবার অভাবে প্রবীণের মৃতের হার ছিল বেশি। করোনার তৃতীয় ঢেউয়ে এবার সেটি লক্ষ করা যাচ্ছে না। এবারে শিশু থেকে শুরু করে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কেউ বাদ যাচ্ছেন না। যেহেতু প্রবীণরা পরিবার এবং সমাজে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এবং নির্যাতিত, তাই বাজেটে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য, সর্বজনীন স্বাস্হসেবা নিশ্চিত করাসহ তাদের সার্বিক কল্যাণ ও নিরাপত্তা প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্রবীণরা যাতে পরিবার ও সমাজে নির্বিঘ্নে ও সম্মানজনকভাবে বাঁচতে এবং চলাফেরা করতে পারে সেজন্য স্বাস্হ্য খাতে আলাদা বরাদ্দসহ হাসপাতালগুলোতে নির্ধারিত আসন, রেলওয়েসহ গণপরিবহনে সাশ্রয়ী মূল্যে টিকিট সরবরাহ, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সঞ্চয় বু্যরোর দপ্তরসমূহ, অফিস আদালত, রেলওয়েসহ সর্বক্ষেত্রে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য আসন নির্ধারণসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও এর সুব্যবস্থা থাকতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে প্রবীণ জনগোষ্ঠী এ দাবিগুলো জানিয়ে এলেও এর কোনো বাস্তব এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। দেশ ও সমাজের জন্য যারা তাদের মেধা ও শ্রম দিয়ে একসময় বিরাট অবদান রেখেছেন, দেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিয়ে এসেছেন, তাদের সমস্যাসমূহ বিবেচনায় নেওয়ার জন্য বর্তমান প্রবীণবান্ধব সরকারকে বাজেটে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দসহ যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রবীণ জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষকে অনুরোধ জানাচ্ছি।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে প্রণীত প্রবীণ নীতিমালায় এসব সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা বলা হলেও বিগত আট বছরেও এর কোনো বাস্তবায়ন নেই। এ ছাড়াও আমাদের দেশে একটা বিরাট সরকারি-বেসরকারি কর্মজীবী জনগোষ্ঠী অবসর গ্রহণের পর তাদের আর কিছুই করার থাকে না। নিজের এবং পরিবারের জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য তাদের সারা জীবনের আয়ের একটি অংশ দ্বারা সঞ্চয়পত্র ক্রয় করে থাকে। এটাই অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের আর্থিক সক্ষমতার উত্স। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, প্রবীণদের সঞ্চয়ের এই মুনাফা বিগত দুই অর্থবছর থেকে কেটে রাখা হচ্ছে, যা অত্যন্ত অমানবিক। এ নিয়ে বহু আবেদন-নিবেদন, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। আসছে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে উল্লিখিত দিকগুলো বিশেষভাবে ভেবে দেখার জন্য প্রবীণ জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।
লেখক: অর্থনীতি-বিষয়ক বিশ্লেষক, সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক ও নির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান