চৌদ্দগ্রামে অপরিকল্পিত ইটভাটায় কমছে ফসলি জমি, বাড়ছে রোগ

কুমিল্লায় প্রশাসনের চোখের সামনে মানুষের বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, হাট-বাজার লাগোয়া এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে অনেক ইটের ভাটা। তিন ফসলের উর্বর জমি ধ্বংস করে ভাটা নির্মাণের কারণে শস্য ভান্ডারখ্যাত এ জেলার কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। ইটের ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে বাড়ছে রোগ-বালাই এবং বিপন্ন হচ্ছে ফল-ফলাদি, গাছগাছালিসহ জীববৈচিত্র্য।

গ্রামীণ পরিবেশের নির্মল বাতাস এখন দূষিত ধোঁয়ায় ধূসর। এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে স্বাস্হ্যঝুঁকি নিয়েই বেড়ে উঠছে শিশুসহ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা এলাকায় ঘুরে অপরিকল্পিত এমন বৈধ-অবৈধ ইটের ভাটার পরিবেশবিনাশী ভয়ানক চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। এ অবস্থায় ঐ উপজেলার ফসলের জমি, কানাইল নদীর মাটি ও পরিবেশ রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও এলাকাবাসী। এ ব্যাপারে প্রতিবাদ জানালেও প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

জানা যায়, ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা। উন্নয়নে অগ্রসর এ উপজেলায় প্রাথমিক থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের ৬৬৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখানে হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ক্লিনিকের সংখ্যা ১৩১টি। এর বাইরেও রয়েছে অনেক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।

জানা গেছে, ৫ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই উপজেলার প্রতিটি এলাকার যেখানে সেখানে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে অন্তত অর্ধশতাধিক ইটের ভাটা রয়েছে। অর্ধেকেরও বেশি ভাটা নবায়ন করা হয়নি। অনেকগুলো ভাটার নেই বিএসটিআই সনদ, নেই কৃষি ও পরিবেশ ছাড়পত্র। অনেকেই মানছেন না ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ও শর্তাবলী। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চোখ মেললেই দেখা মিলে ইটের ভাটা। স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, হাট-বাজার ও গ্রামের ভেতর বসতবাড়ি ঘেরা কৃষি জমিতে ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে। চৌদ্দগ্রাম পৌর এলাকার এমবিসি ব্রিক্স, ধনুসাড়া এলাকার একতা ব্রিক্সসহ বেশ কয়েকটি স্থানে গেলে ইটের ভাটার কারণে জমির ফসল ও পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতার কথা জানান বাসিন্দারা। এ ব্যাপারে বিগত সময়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মিলছে না বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

এতে নিরুপায় হয়ে ফসলি জমি, নদী পাড়ের মাটিসহ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার দাবিতে গত শুক্রবার উপজেলার ধনুসাড়া এলাকায় একতা ব্রিক্সের সামনে চার গ্রামের বাসিন্দারা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। এদিন একই দাবিতে তারা উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দাখিল করেন। 
তারা অভিযোগ করে বলেন, কৃষি ও আবাসিক এলাকায় ভাটা স্থাপনের নিয়ম না থাকলেও কৃষি জমি উজাড় করে প্রশাসনের চোখের সামনে এসব এলাকায় কীভাবে ইটভাটা স্থাপিত হলো এবং তারা ছাড়পত্রই বা পেল কীভাবে? এসব ভাটার জন্য জমির উর্বর টপসয়েল ও স্থানীয় কানাইল নদীর পাড়ের মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে ভাটার মালিকরা লাভবান হলেও দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এলাকার লোকজন এবং হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি। ভাটার ধোঁয়ার দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি তাদের ফল-ফলাদি ও নানা গাছগাছালি মরে যাচ্ছে, পরিবেশ হারাচ্ছে বৈচিত্র্য ও বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন।

অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক আবদুল বাতেন বলেন, এ উপজেলায় ইটের ভাটার ছড়াছড়ি। যে বয়সে লেখাপড়া করার কথা সেই বয়সে এসব ইটের ভাটায় অনেক শিশু-কিশোর শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। ইট তৈরি, কাঁচা ইট রোদে শুকানো, ট্রলিতে করে ইট টেনে ভাটাস্হলে পৌঁছানো, মাটি বহন করাসহ সব কাজে এই শিশু-কিশোররা নিয়োজিত আছে। ধোঁয়ায়-দূষণে তাদের অনেকে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে।

চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস এম মঞ্জুরুল হক জানান, এ বিষয়ে এলাকাবাসীর অভিযোগ পেয়েছি, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লার সভাপতি ও কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, অপরিকল্পিত ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় ফসল, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে, রোগ-বালাই বাড়ছে। তবে প্রশাসনিকভাবে তদারকি তেমন দেখা যায় না। জিরো টলারেন্স দেখিয়ে ক্ষতিকর ভাটাগুলো বন্ধ কিংবা অন্যত্র অপসারণ করতে হবে।

কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. রেজাউল করিম বলেন, বায়ুতে দূষিত উপাদানের উপস্থিতিতে ফুসফুসে ক্যানসার, হার্ট অ্যাটাক ও অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুর হার বেড়ে যাচ্ছে। মানুষ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগের সম্মুখীন হচ্ছে। বিশেষ করে ইটভাটার আশপাশের বাসিন্দাদের শিশু ও নানা বয়সের মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।

গবেষণা তথ্যের বরাত দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম উল্লেখ করেন, ইটভাটা থেকে নির্গত দূষিত উপাদানের মধ্যে পার্টিকুলেট ম্যাটার, কার্বন মনোঅক্সাইড, সালফার অক্সাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইড প্রতিনিয়ত বায়ুমণ্ডলে নির্গত হচ্ছে। এই দূষিত উপাদান মানবদেহে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করলে রেসপিরেটরি সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু উভয়ের জন্য পার্টিকুলেট ম্যাটার স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

কুমিল্লা সিভিল সার্জন ডা. মীর মোবারক হোসাইন বলেন, ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে চোখ, নাক, গলাসহ অ্যাজমাটিক সমস্যা হয়। এছাড়া ত্বক ও নখ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রক্তস্বল্পতা, অ্যাজমা, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ইটভাটার কারণে আবাদি জমি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কৃষি ও আবাসিক এলাকায় ভাটা স্থাপনের নিয়ম না থাকলেও এর তোয়াক্কা করছে না মুনাফালোভী ভাটা ব্যবসায়ীরা। এসব ভাটার মাটির জোগান দিতে জমির উপরি ভাগের মাটি কেটে নেওয়ায় অনেক জমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে।

ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনার বিষয়ে ভাটা মালিকদের অনেকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপপরিচালক শওকত আরা কলি বলেন, আমরা সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকায় পরিদর্শন করে এক্ষেত্রে একটা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। তবে অনুমোদন বা ছাড়পত্র না নিয়ে কিংবা নবায়ন না করে কেউ ইটভাটা পরিচালনা করলে পরিবেশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

কুমিল্লা জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, কৃষিজমি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অবৈধ ও ত্রুটিপূর্ণ ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা করা হয়ে থাকে। এরই মধ্যে কিছু ইটভাটা ধ্বংস করাসহ অনেককে জরিমানা করা হয়েছে। যেসব এলাকায় অবৈধ ভাটা আছে কিংবা কাগজপত্রে বৈধ ভাটার মালিকরা আইন না মেনে পরিবেশের ক্ষতি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।