বইমেলা, মেলা বই 

অতিমারির একের পর এক ঢেউ এসে আমাদের ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যে শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, বইশিল্প তাদের সামনের সারিতেই আছে। সেই সময়ে মনের ব্যথা ভোলাতে বই হাতে হাতে পৌঁছে যেতে পারেনি। হাসপাতালে যায়নি, বাড়িতে বাড়িতে যায়নি বই। প্রকাশনার কর্মীরা অসংখ্য ঘরবন্দি মানুষের সঙ্গে গভীর আতঙ্কে দিন কাটিয়েছে। জীবন বাঁচাতে গিয়ে অনেকেরই তখন বইয়ের কথা মনে হয়নি। ধীরে ধীরে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন এসেছে। আবার বসেছে হাট, আবার হয়েছে মিলন। প্রথমে পনেরো দিন এবং পরে তা বর্ধিত হয়ে পূর্ণ মাসব্যাপী বইমেলার আয়োজনে উড়ে বেড়াচ্ছে শত শত বই। উত্সাহী পাঠক একের পর এক বই দু-হাতে আঁকড়ে ধরে ভরে নিচ্ছেন পিঠ বা হাতের ঝোলায়। দুদিন আগেও যা ছিল স্বপ্ন, আজ তা-ই বাস্তব। মনে পড়ে গেল, সৈয়দ মুজতবা আলীর লাখ কথার এক কথা—‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না।’ আনাতোল ফ্রাঁস বলেছিলেন—‘আমার মনের চোখ তো মাত্র একটি কিংবা দুটি নয়...। চোখ বাড়ানো-কমানো পুরোপুরি আমার হাতে। জ্ঞান-বিজ্ঞান যত আয়ত্ত করতে থাকি, তত একটা করে ফুটতে থাকে মনের চোখ।’ বই ছাড়া তো জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা জানার আর কোনো বড় মাধ্যম নেই। বই মনের চোখকে বাড়িয়ে দেয়। ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে স্মৃতি নিয়ে বিখ্যাত একটি সম্পাদকীয় শিরোনাম ছিল ঠিক এমন—‘ইউজ ইট অর লুজ ইট’ অর্থাত্ ‘খরচ করুন অথবা হারান’।

ডিজিটাল বনাম প্রিন্ট বই নিয়ে গত তিন দশক ধরে পশ্চিমা দুনিয়ায় গবেষণা হয়েছে অনেক। ফলাফল বলছে—গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে, স্পর্শ করে পড়তে পড়তে মগজে যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রেখে যায় ছাপা বই, ডিজিটাল মিডিয়ার প্রভাব তার চেয়ে অনেক অনেক স্বল্পমেয়াদি। পিডিএফ-এ বই পড়া আর ছাপা বই পড়ার মধ্যে ফারাক অনেকটাই। তাই পড়ার পিপাসুদের শেষ আশ্রয় ছাপা বই-ই। বই মূলত পড়ার উদ্দেশে পৌঁছে যেতে হয় পাঠকের হাতে। পাঠক সরাসরি তা ক্রয় করেন অথবা লাইব্রেরিতে গিয়ে তা পড়েন। বইমেলা বড় করে সেই কাজটিই করে। সরাসরি পাঠককে নিয়ে আসে বইয়ের কাছে। লাইব্রেরির পৃষ্ঠপোষকদের বইয়ের গন্ধ শুঁকতে সাহাঘ্য করে। বইমেলার এ আয়োজনে ভালো বই-ই আগ্রহ জোগাবে পাঠকের মনে, বই সংগ্রাহকের মনে। মানসম্পন্ন নয় এমন বই ছাপাতে পারলেও তা পাঠককে আগ্রহী করতে পারবে না। কালক্রমে মানহীন বই পড়ে থাকবে লেখকের গোডাউনেই। তাই মানহীন বই প্রকাশিত হলো বলে ভয়ের কতটুকু আছে, তা ভেবে দেখতে হবে। তবে এ কথাও সত্য, অনেক বইয়ের ভিড়ে পাঠক হয়তো ভালো বই এবং মানসম্পন্ন বই বেছে নিতে বিভ্রান্ত হতে পারেন। বইমেলা অন্তত নতুন নতুন লেখকদের প্রাণে লেখার উন্মাদনাটা জাগিয়ে দিয়ে যাক। এর মধ্যে লক্ষণীয় যে, বেশ কিছু প্রকাশনা উঁচুমানের বই প্রকাশ করে চলছে সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও। তাদের অনেক বই-ই হাতে নিলে মন ভরে যায়। কিছু শক্তিসম্পন্ন লেখকদের উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, ভ্রমণসমগ্র এবং গবেষণাধর্মী বই এখনো আমাদের উদ্বেলিত করে যাচ্ছে।

বইমেলায় বইয়ের দাম শুনে অনেকেই আঁতকে উঠেন। মেলা দাম, এত দাম কেন? তাই তো বাংলা বই কিনতে চাই না—বলে বসেন একজন পাঠক। পাঁচ হাজার টাকার জুতা, চার হাজারে কেনা জিন্স আর দামি ব্র্যান্ডের শার্ট পরা ভদ্রলোককে জবাবটা দিতেই হয়। কাগজের দাম, ছাপার খরচ, ভালো বাঁধাই সবকিছুর খরচ বাড়লে বইয়ের দাম তো বাড়বেই! লেখকের চিন্তার ফল বই হলেও রাতের স্বপ্নে লেখক বইকে তো ছাপার বই হিসেবে পান না। তাকে বাজারের মূল্যবৃদ্ধির মুখোমুখি হতেই হচ্ছে। বই বাজারজাতকরণের বিষয়টিও সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে চলে। সেখানে থাকে প্রকাশকের ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত। তাই বইয়ের চড়া দাম দেখে লেখককে দায়ী করার কোনো সুযোগ নেই, অবাক হওয়ারও সুযোগ নেই। তারপরও কিন্তু আজ ২০০-৩০০ টাকায় কিছু বাংলা বই পাওয়া যায়। লেখকের মেধা বা শ্রমের কথা না-ই-বা বললাম। বাচ্চাদের মেধাবিকাশে এবং বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ বাড়াতেও অসংখ্য বই মেলায় সাজানো থাকে। খেলা, রান্না, সমাজ, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য, রম্যরচনা, ধ্র‚পদী সাহিত্যও সেখানে বাদ যায় না। সব মিলিয়ে একুশের এ প্রাণের মেলার আয়োজন বিশাল।

আমরা বুঝি আর না বুঝি, বইমেলা তার দায়িত্বটুকু পালন করেই যাচ্ছে। অতিমারির বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরুতেও ভরসা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা হুমায়ূন আহমেদ— সে কথাই বইমেলা বলে যেতে চায়। মানুষের সঙ্গে মানুষের, অতীতের সঙ্গে বর্তমানের, দূরের সঙ্গে নিকটের অন্তরঙ্গ যোগসাধন সাহিত্য ব্যতীত আর কিছু দ্বারা সম্ভবপর নয়। খুব দায়িত্ব নিয়েই মনে করিয়ে দিতে চাই, যে দেশে সাহিত্যের অভাব, সে দেশের লোক পরস্পর সজীব আর মানবিক বন্ধনে সংযুক্ত থাকতে পারে না; তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আজকের এ সমাজের তীব্র বিষাদ আর চরম বিচ্ছিন্নতা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পেতে নির্ভর করতে হবে সাহিত্যে, বইয়ে। বইয়ের মধ্যেই পাঠক লাভ করতে পারে এক আনন্দময় রসবোধ। একবার সেই রসের সন্ধান পেলে মনের বিষাদ পেরিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় আনন্দধারার কাছে।

লেখক: কলাম লেখক