‘ম হানায়ক’ এবং ‘রোলমডেল’ শব্দ দুটি একসঙ্গে সমার্থক হলেও এর মধ্যে তাত্ত্বিক এবং সূক্ষ্ম পার্থক্য করা যায়। ‘মহানায়ক’ শব্দটির সঙ্গে আবেগ এবং ভালোবাসা প্রতিফলিত হয়। আর ‘রোলমডেল’ শব্দটির সঙ্গে অনুকরণ, অনুসরণ এবং দিকনির্দেশনা প্রতিভাত হয়।
তরুণ প্রজন্মের মন-মনন যেমন আবেগনির্ভর ভালোবাসার আধিক্য তাড়িত তেমনিভাবে যথাযথ দিকনির্দেশনামূলক অনুসরণীয় অনুকরণীয় মাত্রা যুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্ববহ। আবেগ ও ভালোবাসার সঙ্গে অনুকরণ, অনুসরণ ও দিকনির্দেশনার মাত্রাযুক্ত করে তরুণ প্রজন্মের যথাযথ ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধন প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু আপামর বাঙালির আবেগ ভালোবাসার স্থাপিত মহানায়ক, অন্যদিকে অনুসরণীয়, অনুকরণীয় দিকনির্দেশক। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম নেওয়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, ব্যক্তিত্ব এবং আমৃত্যু কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দেশপ্রেম, সত্তা, সাহসী, মানবিক, অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনষ্ক, দৃঢ় নেতৃত্বের গুণাবলিসম্পন্ন প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং প্রগতিশীল মন-মানসিকতা সম্পন্ন একজন অসামান্য মানুষ। প্রখর স্মৃতিশক্তি এবং তীক্ষ্ণ দূরদৃষ্টি সম্পন্ন গুণাবলি তাকে করে তুলেছে অসামান্য ব্যক্তিত্বের পূর্ণাঙ্গতায়। প্রাসঙ্গিকভাবে বঙ্গবন্ধুর সাহসিকতা প্রকাশ পায় কিশোর বয়সে মন্ত্রীর সম্মুখে স্কুল সংস্কারের দাবি উপস্থাপনের মধ্যদিয়ে। যৌবনকালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে তার সাংগঠনিক উদ্যোগ মানবিকতা এবং অসাম্প্রদায়িকতার বাস্তব উদাহরণ। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখা যায় তিনি ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী সাংগঠনিক একজন ব্যক্তিত্ব। তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তি আর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তার নেতৃত্বের প্রতি এনে দিয়েছে অবিচল আস্থা। বঙ্গবন্ধুর সাহসী অধিকারবোধ আর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন চিন্তাশক্তি তার ব্যক্তিত্বের গুণাবলির মধ্যে প্রবলভাবে প্রভাবিত যা তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয়, অনুসরণীয়।
বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞানমনষ্ক আধুনিক উন্নয়ন দর্শনের স্রষ্ঠা। যা সমসাময়িক উন্নয়ন অগ্রগতির ধারায় প্রবাহিত। তরুণ প্রজন্মের মন-মননে যে বিষয়গুলোর আধিক্য এবং আকর্ষণীয় সেসব বিষয় বঙ্গবন্ধুর আজীবন কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত। বঙ্গবন্ধু ৫২-এর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ার অবৈধ বহিষ্কার আদেশের কাছে নতিস্বীকার না করার মানসিকতা, মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিয়ে দলের দায়িত্বগ্রহণ, ৬ দফা দিয়ে দূরদর্শী চিন্তার বাস্তবায়ন, ৬৯ সালের গণঅভু্যত্থানের মধ্যদিয়ে আপামর জনগণের মধ্যে নেতৃত্বের আস্থা স্হাপন, ৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর আস্থার মধ্যদিয়ে সুদূর প্রসারী নেতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ, ৭১-এ ৭ মার্চ রাজনৈতিক স্বাধীনতা ঘোষণা, ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্যদিয়ে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনন্য বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, স্বাধীনতাপরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে প্রতিটি ক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তরুণ প্রজন্ম সব সময় তার মন-মননে সাহসী, আধুনিক, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। আর এর সঙ্গে যুক্ত করে সততা, মানবিকতা, বিজ্ঞানমনষ্কতা, তরুণ প্রজন্মের কাছে অ্যাচিভমেন্ট যেমন আকর্ষণীয় তেমনি রয়েছে আবেগ ভালোবাসার প্রাধান্য।
সুতরাং তরুণ প্রজন্ম নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায় আবেগ ভালোবাসায় জড়িয়ে সাহসী, দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটিয়ে। সঙ্গতকারণেই আপাত এই ক্ষেত্রগুলোর সমন্বয়ধর্মী একক উদাহরণ অবচেতন মনে স্থান দেয়, খুঁজতে থাকে মহত অনুকরণীয়, অনুসরণীয় বিশাল হূদয়ের ব্যক্তিত্বকে। যা হতে পারে আবেগ ভালোবাসার মহানায়ক এবং অনুসরণীয় রোলমডেল। এমন একক ও সমন্বিত উদাহরণ বিরল। যা হাজার বছরেও পাওয়া যায় না। বাঙালি জাতির কাছে সেই বিরল ও হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তি ঘটেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাওয়ার মধ্যদিয়ে। আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। যা বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে তরুণ প্রজন্মের হাতে। সুতরাং এখন থেকে তাদের সব বিষয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের গুণাবলি অনুকরণে নিজেদের বিকশিত করার দায়িত্ব নিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে নীতি-নৈতিকতা, সততা, মানবিক মূল্যবোধ সৃজনের পাশাপাশি তাদের জানতে হবে বঙ্গবন্ধুকে। তরুণ প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধু এবং স্বাধীনতার ইতিহাস জানতেই হবে। কেননা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মহান স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে আপামর জনগণ ‘মহানায়ক’-এ অধিষ্ঠিত করেছে তাদের হূদয়ে। আর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শনকে ‘রোলমডেল’ হিসেবে অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় করেছে মন-মননে। অতএব বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেমের চেতনা জাগ্রত করতে বঙ্গবন্ধুকে একাধারে মহানায়ক অন্যদিকে রোলমডেল হিসেবে অনুসরণ অত্যাবশ্যক।
লেখক :উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যাল