স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, বঙ্গবন্ধু এখন জগত্জোড়া খ্যাতিমান এক মহাপুরুষ। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বুধবার ফজরের নামাজের পর টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম শেখ লুত্ফর রহমান ও মাতা সায়েরা খাতুন। শেখ লুত্ফর রহমানের চাচাত ভাই, শেখ আব্দুর রশিদের ছেলে শেখ মোশারফ হোসেন জন্মের পর আজান দিয়ে বঙ্গবন্ধুর শুভাগমনের খুশির খবর সবাইকে জানান। ছোটবেলা বাবা-মা তাকে আদর করে ডাকতেন ‘খোকা’, গ্রামের স্নেহধন্যরা ডাকতেন ‘মিয়া ভাই’।
দেশের প্রবীণ মানুষজনের কাছে ছিলেন ‘শেখ সাব’। ’৬৯ সালে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। বিবিসির জরিপে শেখ মুজিব হলেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। সব নামের সঙ্গে মিশে আছে, বাংলার কৃষ্টি, সংস্কৃতি, মাটি ও মানুষের গভীর মমতা-ভালোবাসা আর হৃদয়ের শ্রদ্ধা। বিদেশিরা ও ছোট শিশু তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে চিনে বেশি। তার জীবন-ডিকসনারিতে ভয় বলে কোনো শব্দ ছিল না। তিনি ছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠ। তার সত্সাহসই আমাদেরকে বীর বাঙালি জাতি বানাতে সাহস যুগিয়েছিল। শেখ মুজিবকে চিনতে পেরেছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও তার শৈশবের শিক্ষক আব্দুল হামিদ এম এস সি।
বঙ্গবন্ধুর জীবনটা ছিল খুব দুঃখ-কষ্টের। কিশোর বয়সে তিনি অসুখ-বিসুখে মারাত্মকভাবে ভুগেছিলেন। কিশোর বয়সে তার সহপাটি আব্দুল মালেককে স্থানীয় হিন্দুরা ধরে নিয়ে মারধর করেছিল। তিনি এ ঘটনায় প্রতিবাদ করেন এবং আটক আব্দুল মালেককে মুক্ত করেন। তখন হিন্দুরা মামলা করে। ফলে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়। সাত দিন পর তিনি মুক্তি লাভ করেন। এটা ছিল তার জীবনের প্রথম জেলে যাওয়া। রাজনৈতিক জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেন। ৪ হাজার ৬৭৫ দিন কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে। মায়ের ভাষা বাংলার দাবিতে কারাগারে অনশন করেন তিনি। ১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, শ্রম ও বাণিজ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে গেলে সংবর্ধনা সভার প্রধান সেচ্ছা সেবকের দায়িত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। মিশনারি স্কুলের ছাত্র শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দীকে অভ্যর্থনা জানালেন এবং যাওয়ার পথে শেখ মুজিব কিছু ছাত্র নিয়ে শ্রমমন্ত্রীর পথ আটকে বিনয়ের সুরে বলে উঠলেন, ‘স্যার আমাদের একটি আবেদন আছে।’ সোহরাওয়ার্দী হেসে বললেন, ‘বল-বল শুনি, তোমাদের আবেদন কি?’ সাহসী বালক শেখ মুজিব বললেন, ‘স্কুলের ছাদ ফাটা, ছাদ ছুইয়ে পানি পড়ে, ক্লাস করা যায় না। আপনাকে তা মেরামত করে দিতে হবে।’ তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সাহস, কথা বলার ভঙ্গি, বিনয়ী সুর দেখে তৎক্ষণাৎ ছাদ মেরামতের জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা ঘোষণা দেন। সেদিন থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের সাহস ও নেতৃত্বের প্রশংসার সৌরভ চার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতায় ফিরে গিয়ে সোহরাওয়ার্দী শেখ মুজিবকে পত্র লেখেন এবং তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বলেন। তারপর কলকাতায় পড়াশোনার জন্য গিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বঙ্গবন্ধু। তখন থেকেই সোহরাওয়ার্দী হলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু।
১৪ বছর বয়সে শেখ মুজিবুর রহমানের পা হঠাত্ ফুলে যেতে থাকে, প্রায় তার বমি হতো, শরীরে তীব্র ব্যথা, হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যাওয়ায় ভয়ানক অসুস্থ হলেন বঙ্গবন্ধু। পড়াশোনা খেলাধুলা বন্ধ ছিল। তার পর কলকাতার ডাক্তার শিবপদ ভট্টাচার্য এবং ডাক্তার এ কে রায় চৌধুরী রোগ নির্ণয় করে ভিটামিন ইনজেকশন দিয়ে শুরু হয় তার চিকিত্সা। পরামর্শ দিলেন, ঢেঁকিছাটা চালের ভাত, ছোট মাছ, প্রচুর মটর শুটি ও শাক সবজি খেতে। চোখে ধরা পড়ে যায় গ্লুকোমা রোগ। অপারেশন করলেন কলকাতার প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. টি আহমদ। তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর। সে সময় থেকে চশমা হয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর নিত্যসঙ্গী। মেট্রিক পরীক্ষার মাত্র এক দিন আগে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর এবং মাম্স (গটগচঝ) হয়ে গলা ফুলে অসহনীয় মাথা ও চক্ষু ব্যথা নিয়ে পরীক্ষা দিতে হয় বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু তার বাল্যকাল সম্পর্কে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেন, ‘ছোট বেলায় আমি খুব দুষ্ট প্রকৃতির ছিলাম। খেলাধুলা করতাম, গান গাইতাম এবং ভালো ব্রতচারি করতাম।’ ১৯৪১ সালে তিনি কলকাতার মুসলিম ছাত্র সমাজের বিখ্যাত ছাত্র নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৪৩ সালে মুসলিম লীগের কাউন্সিলার হয়ে দিল্লি যান। মাদারিপুরে স্বদেশি আন্দোলনের কেন্দ্রে নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসুর সভা সমাবেশে যোগদান করতেন। গোটা ভারতবর্ষের স্বদেশি জনগোষ্ঠীর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।
১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমরা বাঙালি, যেদিন আমি বাঙালি ভুলে যাব, সেদিনই আমি শেষ হয়ে যাব। বাংলার মাটিতে আমি মরব, বাংলা আমার সভ্যতা।’ তাই তিনি ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেস্বর জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়ে পৃথিবীতে নজিরবিহীন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। তার এ ভাষণটি অনুবাদ করেছিলেন লন্ডন ডেপুটি হাই কমিশনার ফারুক চৌধুরী। ভাষণের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুলপঠিত জাতিসংঘের ‘ডেলিগেট বুলেটিন’ বঙ্গবন্ধুকে কিংবদন্িতর নায়ক মুজিব বলে আখ্যায়িত করেছিল। জাতিসংঘের মহাসচিব ড. কুটওয়ার্ল্ড হেইম বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় আমি আনন্দিত ও গর্বিত।’ ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস কালাহান বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিত্ব আমাকে মুগ্ধ করেছে।’
পিতা শেখ লুত্ফুর রহমানের পত্রিকা পাঠের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সচেতনতার প্রথম অধ্যায় শুরু হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাপ্তাহিক ‘মিল্লাত’ পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে লেখা সংগ্রহ, এমনকি হকারের মতো পত্রিকা বিক্রিতে নিজেকে যুক্ত করে নিজ কর্মের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। ১৯৪৩ সালে বাংলায় দুর্ভিক্ষের সময় বিহারে দুর্ভিক্ষ কমিটি নিয়ে গিয়ে, দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। কলকাতায় যখন দাঙ্গা হয়, তখন ভবতোষ দত্ত নামের বঙ্গবন্ধুর এক শিক্ষক ও লেখক, তিনি শেখ মুজিব সম্পর্কে লিখেন, ‘আমরা যখন জীবনের নিরাপত্তা খুঁজছি, তখন তরুণ শেখ মুজিব হিন্দুসমাজকে নিরাপদ এলাকায় পৌঁছে দিয়ে আসতেন। ১৯৫০ সালের পর বঙ্গবন্ধু মরিয়া হয়ে উঠলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছাড়া কোনো উপায় নেই। বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা পেশ করে বাঙালিকে স্বাধিকার আন্দোলনের মন্ত্র শেখালেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামী লীগ বিজয় অর্জন করলেও বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে দমন-পীড়ন নীতি অনুসরণ করে পাকিস্তানিরা। ৭ মার্চের ১৮ মিনিটের দুনিয়া কাঁপানো বিস্ময়কর ভাষণে সব কথাই বললেন বঙ্গবন্ধু, ‘আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের মতে, ‘শেখ মুজিব চাতুর্যের সঙ্গে অসাধারণ একটি ভাষণই দিলেন না, স্বাধীনতার ঘোষণাও কৌশলে করলেন। সেদিন আকাশে শোভিত হেলিকপ্টার, বাইরে কামান, বন্দুক সব তাক করানো ছিল। শেখ মুজিব যদি শুধু ঘোষণা করতেন, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন, তাহলেই কামানগুলো গর্জে উঠত। কিন্তু তিনি সেদিকে না গিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বাঙালিকে প্রস্তুত করে ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। শুরু হয় অপারেশন সার্চলাইট। পাকিস্তানের কারাগারে থাকাবস্থায় নিজের কবর খোড়া দেখে হেসে বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মুসলমান, মুসলমান একবারই মরে। আমার লাশটা আমার বাঙালির কাছে পাঠিয়ে দিও।’
মহান নেতা বঙ্গবন্ধু তিনি শুধু বাংলাদেশের নন, বিশ্বের নির্যাতিত, নিপীরিত মানুষের এক পথ প্রদর্শক। তার এত ত্যাগ, কর্ম, যে কারণে বাংলাদেশের ইতিহাস বিশ্বে খুবই বড়। এমন ইতিহাস বিশ্বে কোনো নেতা তৈরি করতে পারেননি। তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটি ছিল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ এর স্লোগানধারী একজন জঙ্গিকর্মী হিসেবে। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্থপতি হয়ে উঠা তার নিজস্ব সাধনার ফল ও কৃতিত্বও বটে। ইতিহাস তাকে তৈরি করেনি। বঙ্গবন্ধুর কর্মেই ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। দেশ ও কালের গণ্ডির মধ্যে থেকেও তিনি ছিলেন অনেক যুগের মহানায়ক। নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশকে জানতে গেলেই খুঁজে পাবে মহান নেতা বঙ্গবন্ধুকে।
লেখক :কলামিস্ট ও সমাজ বিশ্লেষক