কবি রবীন্দ্রনাথ এক কালো মেয়ের রূপ দেখে লিখেছিলেন, ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।...কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।’ কিন্তু সভ্যতাগর্বিত পশ্চিমা দেশগুলোতে এই কৃষ্ণকলিদের ওপর কী অত্যাচার চলছে, তার একটি নমুনা দিই। নমুনাটি লন্ডনের পপুলার দৈনিক মেট্রোর ১৬ মার্চের সংখ্যা থেকে সংগৃহীত।
সংবাদটি এইরূপ— লন্ডনের এক স্কুলে উচ্চপর্যায়ের ক্লাসে মিথ্যা অভিযোগে এক কালো মেয়ের শরীরে নিষিদ্ধ মাদক দ্রব্য লুকানো আছে— এই অজুহাতে তার শরীর সার্চ করা হয়। এই সার্চের নমুনাটি আমার পাঠক ভাইয়েরা দেখুন। ‘দ্য সার্চ বাই ফিমেইল মেট্রোপলিটন পুলিশ অফিসার্স টু প্লেইস অ্যাট দ্য গার্লস স্কুল আফটার সি ওয়াজ রংলি সাসপেক্টেড অব হ্যাভিং ক্যানাবিজ। দেয়ার ওয়াজ নো আদার অ্যাডাল্ট প্রেজেন্ট। অ্যান্ড অফিসার নিউ সি ওয়াজ হ্যাভিং পিরিয়ড। সিটি অ্যান্ড হেকমি সেফ গার্ডেন চিলড্রেন পার্টনারশিপ ফাউন্ড। বাট ডিউরিং দ্য সার্চ হার ইন্টিমেইট বডি পার্টস ওয়ার এক্সপোজড। অ্যান্ড সি ওয়াজ আস্ক টু টেক অব হার সেনিটারি টাওয়েল সেইড দ্য রিভিউ।’ এর বাংলা অনুবাদ দেওয়া প্রয়োজন মনে করলাম না।
কৃষ্ণাঙ্গীকে শুধু নগ্ন করেই অফিসার ক্ষান্ত হয়নি, তাকে তার গোপন অঙ্গ থেকে আচ্ছাদন সরিয়ে ফেলতে বলা হয়। এই হলো ব্রিটিশ সভ্যতার চেহারা। ঐ কালো মেয়ে ছিল এক প্রাণবন্ত তরুণী। হাসিখুশিতে উচ্ছল মেয়ে। মিথ্যা রিপোর্টের ভিত্তিতে তার শরীর জঘন্যভাবে সার্চ করা হয়। লন্ডনের পত্রিকাটির খবরেই বলা হয়েছে, এই সার্চের পর মেয়েটির চরিত্রের সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। সে এখন কারো সঙ্গে কথা বলে না। সর্বক্ষণই বিষাদমগ্ন হয়ে বসে থাকে। আগেই বলেছি, ব্রিটিশরা একটি সভ্য জাতি বলে দাবি করা সত্ত্বেও ব্রিটেনে বর্ণবাদ এখনো প্রকট। ব্রিটেন এখন সাম্রাজ্যহারা। কিন্তু তাদের শিক্ষাব্যবস্থা এতই উন্নত যে, বিশ্বের নানা স্হান থেকে শিক্ষালাভের জন্য মানুষ আসে ব্রিটেনে। আর সেই শিক্ষিত ব্রিটেনেই কালো মানুষের এই অবস্থা। সাদা পুলিশ ছুতো পেলেই কালো মানুষের ঘরে ঢুকে গুলি ছোড়ে। কালো মানুষ তাতে মারাও যায়। তাতে পুলিশের বিচার হয় বটে, কিন্তু বৈষম্যের অবসান হয় না। মাঝে মাঝেই সাদা মানুষের কালো চেহারাটা প্রকট হয়ে ওঠে। সভ্যগর্বী ব্রিটিশ আফ্রো-এশিয়ার মানুষদের কী চোখে দেখে তার একটি বিবরণ দিই।
বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার একটা উগ্রমূর্তি আছে। ব্রিটেনে সেই উগ্রমূর্তি নেই। ব্রিটেনে বর্ণবৈষম্য রাখা হয়েছে শিষ্টাচারের চাদরের আড়ালে। হ হ হ ইরাক যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ হত্যা, শিশু-নারী হত্যায় টনি ব্লেয়ার সাহেবের দিল কাঁপেনি। এই একই বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রথম আণবিক বোমাটি ফেলা হয়েছিল। হ হ হ ইউক্রেন যুদ্ধও কোভিডের মতো বিশ্বময় ত্রাস সৃষ্টি করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম পৃথীবিতে বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে আকাশচুম্বি হয়েছে।
illustration
অবশ্য, যে প্রথাটির কথা লিখছি, প্রবল প্রতিবাদের মুখে তা এখন বাতিল হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ থেকে প্রচুর কালো ইমিগ্র্যান্ট বিলেতে আসে। এই ইমিগ্র্যান্ট নীতিতে বলা হয়েছিল, ভারত ও বাংলাদেশের যেসব মেয়ে ব্রিটেনে আসে, তাদের যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করে দেখতে হবে তারা বিবাহিত কি না। এটাকে বলা হতো ভার্জিনিটি টেস্ট বা কুমারীত্ব পরীক্ষা। ব্রিটিশ বিমানবন্দরে এই এশিয়ান তরুণীরা অবতরণ করলেই তাদের এইভাবে পরীক্ষা করা হতো। অনেক অবিবাহিত নারীদের ব্রিটেনে আসা পছন্দ করা হতো না, তাই এই পরীক্ষা। বেশ অনেক বছর আগে রাজীব গান্ধী যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, তখন এক উচ্চশিক্ষিত ভারতীয় তরুণী লন্ডনে আসছিলেন। তাকেও এই কুমারীত্ব পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। এই আত্মমর্যাদাশীল তরুণী তখনই এই ব্যবস্থার প্রতিবাদ করেন এবং সাংবাদিকদের কাছে তা প্রকাশ করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এই খবর শুনে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং ঘোষণা করেন, ভারতেও যেসব ব্রিটিশ নারী আসবেন, তাদের অনুরূপ পরীক্ষা করা হবে। এই ঘোষণার পর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিষয়টি আলোচিত হয় এবং ভারতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে ভার্জিনিটি টেস্ট বা কুমারীত্ব পরীক্ষা তুলে দেওয়া হয়। এর সুফল বাংলাদেশও পেয়েছে।
বর্তমানে সারা বিশ্বে বর্ণবিদ্বেশ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই চলছে। এই লড়াইয়ের পাশাপাশি এশিয়ার কোনো কোনো দেশে যেমন ভারত ও বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা উগ্রমূর্তি ধারণ করেছে। বর্ণবৈষম্য ও সাম্প্রদায়িতা একই কথা। ভারত ও বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার একটা উগ্রমূর্তি আছে। ব্রিটেনে সেই উগ্রমূর্তি নেই। ব্রিটেনে বর্ণবৈষম্য রাখা হয়েছে শিষ্টাচারের চাদরের আড়ালে। টনি ব্লেয়ার যতই বলুন, তিনি একজন উদারনৈতিক নেতা, গালফ যুদ্ধটি যদি ইউরোপে হতো, তাহলে ঐ যুদ্ধে তিনি নামতেন না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে বোমা মারলে বাদামি মানুষ মারা যাবে কিংবা আফ্রিকায় যুদ্ধ চালালে কালো মানুষ মারা যাবে, তাতে ব্লেয়ার সাহেবের কী? সাদা মানুষ তো আর মরবে না! সুতরাং ইরাক যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ হত্যা, শিশু-নারী হত্যায় টনি ব্লেয়ার সাহেবের দিল কাঁপেনি। এই একই বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রথম আণবিক বোমাটি ফেলা হয়েছিল। জাপান সাদা সাহেবদের দেশ নয়, সুতরাং তার মানুষের ওপর প্রথম আণবিক বোমা ফেলে তার সাফল্য কতটা তা নিরিখ করা হলো। তাতে সাদা কেউ মরল না, এটাই নাকি ছিল তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সাহেবের মনের গোপন আনন্দ।
পৃথিবী আজ মহাসংকটের সম্মুখীন। বিশ্ব জুড়ে কোভিড-১৯-এর নানা প্রক্রিয়ার অত্যাচার চলছে। অনেকে সন্দেহ করেন, কোভিডের জোর শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ব্রিটিশ ও মার্কিন ওষুধ কোম্পানিগুলো কৃত্রিম উপায়ে তার নানা দুর্বল সংস্করণ বের করে তাদের ওষুধ বিক্রির বিরাট মুনাফা অর্জনের সঙ্গে বিরাট বাজার গড়ে তুলছে। এই বিরাট বাজারটিও এখন এশিয়া-আফ্রিকাতেই সম্প্রসারিত হয়েছে বেশি। ইউরোপ এখন করোনামুক্ত। এমনকি করোনামুক্ত হয়ে ইউক্রেনে যুদ্ধ চালাতে পারছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন কোভিডের নব নব সংস্করণের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ না করে সেই শক্তি নিয়োগ করেছেন ইউক্রেনে। এই ইউক্রেন যুদ্ধও কোভিডের মতো বিশ্বময় ত্রাস সৃষ্টি করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম পৃথীবিতে বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে আকাশচুম্বি হয়েছে। ইউরোপ তার তেলের সংকট মেটাতে চাইছে চীন, সৈদি আরব থেকে উচ্চ দামে তেল কিনে।
কিন্তু এশিয়া আর আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোর অবস্থা কী হবে? তারা কি আবার কোরোসিনের জ্বালানো বাতির যুগে ফিরে যাবে? পৃথিবীর আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত বিপদেও বৃহত্ দেশ আমেরিকা ক্ষুদ্র দেশের স্বার্থ সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে অনিচ্ছুক। এই ক্ষুদ্র দেশগুলোর একটি বড় অংশই হচ্ছে অসেতাঙ্গ, যাদের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আজ উচ্চকণ্ঠ। আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত যে ক্ষতি অনেক দেশের হবে, তা সামাল দেওয়ার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে শেখ হাসিনা আজ ‘মাদার অব দ্য আর্থ’ উপাধি পেয়েছেন। এই মুহূর্তে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন, কোভিড-১৯-এর নব নব সংস্করণগুলো প্রতিরোধের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবৈষম্যকে প্রতিরোধ করার বিশ্বব্যাপী ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম প্রয়োজন। তা না হলে রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলিদের ওপর অত্যাচারের কখনোই অবসান হবে না। লন্ডনের স্কুলে যে কৃষ্ণকলির প্রতি জঘন্য অপরাধ করা হয়েছে, তার কোনো প্রতিকারও হবে না।
লন্ডন, ১৮ মার্চ ২০২২