সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা
রমজানে রোজাদারদের ডেকে তোলার কাফেলার হাঁকডাক ও গজলের প্রথা কমে যাচ্ছে। একসময় এই দুটির প্রচলন থাকলেও এখন কমে এসেছে। রমজান মাসের মধ্যরাত। সৈয়দপুরে দূর থেকে মাইকে বেজে উঠতো ‘উঠুন, উঠুন। সময় হয়েছে সেহরির। তাড়াতাড়ি উঠুন, সেহরি খান, রোজা রাখুন। ‘সেহরির সময় হয়ে গেছে, আপনারা উঠুন, আপনারা উঠুন।’ পবিত্র রমজান মাসে সৈয়দপুরে সেহরির ঘণ্টাখানেক আগে রিকশা কিংবা ভ্যানে মাইক লাগিয়ে অথবা হাতে টিনের চোঙা নিয়ে এভাবে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে সেহরির সময় হয়ে গেছে বলে সেহরির জন্য ডাক দিতো কয়েকজন যুবকের কাফেলার দল। সঙ্গে সুললিত কণ্ঠে চলতো হামদ, নাত, গজলের সুর। গলায় সুর তুলে হাঁক দিয়ে এভাবেই হেঁটে যেতো রমজানে রাত জাগানিয়ার দলের সেই কাফেলাটি।
শুধু কি শহরে, সৈয়দপুরের গ্রামাঞ্চল থেকেও কমে যাচ্ছে ইফতারের একটু আগে ছোট ছোট শিশুদের দলবেঁধে গজল পাঠের সেই মিনি কাফেলাটিও। মাথায় টুপি, ওড়না আর হাতে থলে নিয়ে শিশুরা তখন পাড়ায় পাড়ায় দল বেঁধে রমজানের উপর গজল পাঠ করতো। মানুষজন তাদের বকশিশ ও চাল, আটা দিতেন। প্রযুক্তির সুবাদে সেটিও এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। শুনা যায় না আর ইফতার ও সেহরির সময় বেজে উঠা সরকারি সাইরেনটিও। পবিত্র রমজানে কাফেলার সঙ্গে সৈয়দপুরের গভীর সম্পর্ক ছিলো একসময়। কাদেরী কাফেলা, মাদানী কাফেলী, আজমেরী কাফেলা, কাদিমী কাফেলা নামে কয়েক বছর আগেই সৈয়দপুরের ইসলামবাগ, মিস্ত্রিপাড়া, বাঁশবাড়ি, রসুলপুর, নতুন বাবুপাড়া, গোলাহাট, সাহেবপাড়াসহ বেশিরভাগ মহল্লা থেকে বের হতো সেহরির সময় হয়ে গেছে রাত জাগানিয়ার সেই কাফেলাটি। তাদের ডাকে ঘুম থেকে জেগে উঠতেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান, প্রস্তুতি নিতেন সেহরি এবং রোজার। আবার রমজানের শেষের দিকে প্রতিটি মহল্লার কাফেলা দলদের নিয়ে হতো প্রতিযোগিতার আয়োজন।
বহু মানুষের উপস্থিতিতে বিজ্ঞ বিচারকরা ১ম, ২য়, ৩য় নির্ধারণ করতেন। দেওয়া হতো ক্রেস্ট ও সম্মাননা। আবার রমজান মাস আসলে ইফতার কিংবা সেহরির সময় মসজিদে সাইরেন দেওয়া হতো। কিন্ত এখন সেগুলো যেনো অতীত। হাতে হাতে মোবাইল প্রযুক্তির ছাপ যেন সবকিছুকে বিলীন করে দিচ্ছে। এভাবে সৈয়দপুর থেকে আসতে আসতে উঠে যাচ্ছে কাফেলা ও গজলের রেওয়াজ।
কাফেলার সদস্য ইমরান জানান, আগে কাফেলা নিয়ে বের হলে পিছনে পিছনে অনেক শিশু-কিশোরের জটলা থাকতো। মানুষজন ভালো মনে অনেকে বকশিশও দিতেন। কিন্তু এখন একজনও দেখতে আসে না যে কে এলো আর কে গেলো। আমাদের কেউ পৃষ্ঠপোষকতাও করে না, যতটুকু সম্ভব নিজের খরচে সাধ্যমতো কাফেলা বের করা হয় এখনো।
কাফেলার আরেক সদস্য ইসলামবাগের নাদিম জানান, এখন তো বের হলে বিভিন্ন মহল্লায় মানুষের কথাও শুনতে হয়, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে নানা রকম কথা শুনতে হয়। অথচ কয়েক বছর আগেই এই কাফেলার আওয়াজের অপেক্ষায় থাকতো মানুষজন।