আনন্দের ঈদ, নিরানন্দের ঈদ

বছর তিন আগে আমার এক ভাগনে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপনের এক বুক স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে। সে বছর আমাদের সবার ঈদ আনন্দ নিমেষেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, সেই দুর্ঘটনার ফলে ওর পরিবারে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা আজও পূরণ হয়নি, কোনো দিন হয়তো হবেও না। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনার ফলে যারা স্বজন হারায়, তাদের সবার পরিবারেই এ ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং তারাই কেবল বুঝতে পারে, এ যন্ত্রণার ভার বহন করা কতটা কঠিন। তার পরও প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার বলি হচ্ছে অসংখ্য তাজা প্রাণ, আহত বা পঙ্গুত্ব বরণ করছে হাজারো মানুষ। পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে কোনো না কোনো সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ খবর। দুর্ঘটনাবিহীন একটি দিনও যেন আমরা কল্পনা করতে ভুলে গেছি। প্রতিটি মুহূর্ত কাটে এক অজানা শঙ্কায়— না জানি সড়ক দুর্ঘটনায় কোন মায়ের বুক খালি হয়, নিমেষেই ধ্বংস হয় সাজানো স্বপ্ন, সংসার। কখন কে সড়ক দুর্ঘটনার বলি হয় কেউ বলতে পারে না। সড়ক দুর্ঘটনার এ শঙ্কা যেন সব সময় তাড়া করে ফেরে। তবে তা বহু গুণে বেড়ে যায় যখন বাঙালির জীবনে ঈদ বা অন্য কোনো ধর্মীয়, সামাজিক উত্সব আসে। তখন ওত পেতে থাকা সড়ক দুর্ঘটনা নামের এ যমদূত যেন দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়, সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। যে কারণে ঈদ যেমন একদিকে আনন্দের, সুখের বার্তা নিয়ে আসে, ঠিক তেমনি বিষাদ, নিরানন্দের কারণ হয়েও দেখা দেয় কারো জীবনে বা পরিবারে।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, প্রতি বছর যে পরিমাণ সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় তার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঘটে মুসলমানদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উত্সব— ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায়। যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, গত বছর ঈদুল আজহার ১৩ দিনে ২৩৭টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়, যাতে অন্তত ২৫৯ জন মৃত্যুবরণ করে এবং ৯৬০ জন আহত হয়। অন্যদিকে ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩৯ জন মৃত্যুবরণ করে এবং ১ হাজার ২৬৫ জন আহত হয়, যা ঈদুল আজহার সংখ্যার তুলনায় বেশি। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে মানুষের শহরমুখী প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। গ্রাম ছেড়ে জীবিকার তাগিদে বা নানা প্রয়োজনে বিভিন্ন শহরে মানুষ ছড়িয়ে  পড়ছে। এ ক্ষেত্রে কেউ একা বা পরিবার নিয়ে শহরে বসবাস করলেও শিকড় রয়ে গেছে গ্রামেই বা জন্মস্থলে। যে কারণে ঈদ বা অন্য কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উত্সব এলেই মানুষ পরিবারের সঙ্গে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে শিকড়ের টানে ছুটে যায় গ্রামের বাড়িতে। সারা বছর যেহেতু নগরজীবনের প্রচণ্ড ব্যস্ততা জীবনকে অনেকটাই দুর্বিষহ করে তোলে, তা থেকে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে কিংবা পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনটাকে কিছুটা ঝালাই করতে শুধু মুসলমান নয়, বরং অন্য ধর্মাবলম্বীরাও ঈদের সময়টাকে উপযুক্ত বিবেচনা করে। তাই তো পথের চরম ভোগান্তি, দুর্ঘটনার শঙ্কা মাথায় নিয়ে স্রোতের মতো অসংখ্য মানুষ শহর ছাড়ে। জানা যায়, প্রতি বছর  শুধু ঈদ উপলক্ষে প্রায় ৮০ লক্ষ মানুষ ঢাকা ছেড়ে শিকড়ের টানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যায় আবার ফিরে আসে। আর রেল ও নৌপরিবহন ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় এসব মানুষের বেশিরভাগ যাতায়াতের জন্য সড়ক পরিবহনকেই বেছে নিতে বাধ্য হয়। ফলে সড়কের ওপর যেমন বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয় তেমনি সৃষ্টি হয় সড়ক দুর্ঘটনার বাড়তি ঝুঁকি।

সড়কে বাড়তি মানুষের এই চাপ পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের জন্য যেন সুখের বার্তা বয়ে আনে, তারা পকেট ভারী করার এটাই মোক্ষম সময় মনে করে। যে কারণে তারা শুধু টিকিটের দাম বাড়িয়েই ক্ষান্ত হয় না, বরং নানা ফন্দিফিকির ও কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকে। যাত্রীদের সীমাহীন চাপের তুলনায় যেহেতু যানবাহনের সংখ্যা কম, সেহেতু মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কড়-ঝক্কড়, ছালবাকল ওঠা ফিটনেসবিহীন ও ত্রুটিযুক্ত গাড়ি রংচং করে রাস্তায় নামিয়ে গাড়ির সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব গাড়ি চালায় অপেশাদার চালক বা হেলপার, কন্ডাক্টর। এ সময় দূরপাল্লার বাসের অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলো এসব বাসের যাত্রী হয়ে গাদাগাদি করে বাড়ি বা কর্মস্থলে ফিরতে চরমভাবে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ে। তা ছাড়া ড্রাইভাররাও এ সময় বেশি ট্রিপ দিয়ে বেশি উপার্জনের এ সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। যে কারণে তারা সময় বাঁচানোর জন্য বেপরোয়াভাবে, দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে চায়, যা দুর্ঘটনার প্রধান একটি কারণ। বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী একজন মোটরযান শ্রমিকের কেউ দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারবে না। অথচ পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ তা মানে না। বেশি লাভের আশায় তারা অতিরিক্ত সময় কাজ করেন আর ঈদের সময় তা বহুগুণে বেড়ে যায়। অন্যদিকে মাসিক বেতন না থাকায় কিংবা ট্রিপভিত্তিক বেতন নির্ধারিত হওয়ায় চালকেরা আট ঘণ্টার বদলে ১৫-২০ ঘণ্টা বিশ্রামবিহীন, নির্ঘুম গাড়ি চালাতে বাধ্য হয়। আর এ সবই একজন ড্রাইভার বা পরিবহন শ্রমিকের শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক  অবস্থার ওপর চরম বিরূপ প্রভাব ফেলে।

আমাদের সড়কপথের এ মৃত্যুফাঁদ এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যা ঈদের মৌসুমগুলোতে প্রকট আকার ধারণ করে। কাজেই ঈদকেন্দ্রিক জোড়াতালি দিয়ে সমাধানের পদক্ষেপ নিলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ঈদে যেহেতু সড়কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়, সেজন্য এ বাড়তি চাপ কমাতে রেল ও নৌপথের যাতায়াত ব্যবস্থাকে উন্নত, আধুনিক ও সহজলভ্য করার বিকল্প নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সড়ক নিরাপত্তায় যে ছয়টি নির্দেশনা দিয়েছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দূরপাল্লার চালকদের যাতে একটানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালাতে না হয়, সেজন্য বিকল্প চালক রাখার ব্যবস্থা করা। এজন্য গাড়ির সংখ্যা অনুপাতে দক্ষ, পেশাদার ড্রাইভার তৈরি করতে হবে এবং অদক্ষ, অবৈধ লাইসেন্সধারী হেলপার, কন্ডাক্টর যাতে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামতে না পারে, সেজন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সাধারণভাবে সড়ক দুর্ঘটনার সিংহভাগ দায় বর্তায় ড্রাইভারের ওপর। ড্রাইভাররা দক্ষ, সাবধান ও সতর্ক হলে দুর্ঘটনা বহুলাংশে এড়ানো যায়। ঈদ উপলক্ষে কোনোভাবেই যাতে ফিটনেসবিহীন ত্রুটিযুক্ত যান রাস্তায় নামতে না পারে সেজন্য মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। মহাসড়কে সব ধরনের অটোরিকশা ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে সড়কে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও তত্পর থাকতে হবে। সর্বোপরি, যাত্রীদের সতর্ক থাকতে হবে সবচেয়ে বেশি। ঈদের আনন্দ উপভোগের আশায় নিজের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা কোনোভাবেই সমীচীন হবে না। এবারের ঈদ সবার জন্য নিরাপদ হোক, সুন্দর হোক— এটাই কাম্য।

n লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়