হাওরে বাঁধের মাটি ফেলার কাজ শেষ, বাকি আছে শুধু ঘাস লাগানো

নীতিমালা অনুযায়ী গত ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুনামগঞ্জের ‘হাওর রক্ষা বাঁধ’ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ করার কথা ছিল। কাজ শেষ করতে নির্ধারিত এই সময়ের পর আরো ১০ দিন সময় বাড়ায় জেলা বাঁধ নির্মাণ কমিটি। এই সময়সীমা শেষ হয়ে আরো চৌদ্দ দিন সময় অতিবাহিত হলো বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ)। তবু কাজ শেষ হয়নি।

হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা জানান, জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরের দুটি পিআইসির (প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টশন কমিটি) কাজ এখনো শেষ হয়নি। বাঁধের গোড়া থেকেই মাটি তোলা হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই সেই মাটি ধসে পড়বে। নীতিমালা অনুযায়ী বাঁধের ৫০ মিটার দূর থেকে মাটি আনতে হয়।

বাঁধ নির্মাণ কমিটির সভাপতি ও সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানিয়েছেন, সব কটি বাঁধের মাটির কাজ শেষ হয়েছে৷ ঘাস লাগানোসহ আনুষঙ্গিক কিছু কাজ কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘বাঁধে মাটির কাজ শেষ। এখন ঘাস লাগানো হচ্ছে। কাজের অগ্রগতি ৯৫ শতাংশ।'

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জ জেলার হাওরে বাঁধ নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও ক্লোজার বন্ধকরণ প্রকল্প বরাদ্দের মোট ৬৬ কোটি টাকার মধ্যে অবশিষ্ট ১৮ কোটি টাকা গত সোমবার মাঠ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে বাঁধ নির্মাণের দায়িত্বে থাকা পিআইসিদের মধ্যে কিছুটা গতি এসেছে। এই হাওর রক্ষা বাঁধের ওপর নির্ভর করছে জেলার ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর বোরো ফসল।

অন্যদিকে চৈত্র মাসের প্রচণ্ড খরতাপে হাওর রক্ষা বাঁধে লাগানো ঘাস মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাই কোনো কোনো স্থানে নদী থেকে পাম্প দিয়ে পাইপের মাধ্যমে বাঁধের ওপর লাগানো ঘাসে পানি দেওয়া হচ্ছে। এমন দৃশ্য দেখা যায় বিশ্বম্ভরপুরে বিশাল খরচার হাওর ও তাহিরপুরের মাঠিয়ান হাওরে। কোনো কোনো বাঁধে আবার জলাধারের অভাব রয়েছে। তাই বিপাকে পিআইসিরা।

তবে দীর্ঘ খরার পর বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) দুপুরের এক পশলা বৃষ্টি প্রাণ জুড়ায়। মাঠের বোরো ধানের জন্য এই বৃষ্টি আশীর্বাদ হতে পারে। এদিকে বাঁধের কাজ সম্পূর্ণ শেষ না হওয়ায় হাওরপাড়ের কৃষকেরা উদ্বিগ্ন। তারা বলেছেন, কয়েক দিন আগে তাহিরপুরের নদীতে ‘গোলা’ নেমেছে। এখন বৃষ্টির মৌসুম, যে কোনো সময় ঢল নেমে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে গিয়ে শস্যভাণ্ডার তলিয়ে যেতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাষ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূইয়া বলেন, এই সময়ে আমাদের সতর্ক থাকতেই হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেকোনো সময় এক-দুই দিনের ব্যবধানে বন্যা হয়ে সম্পদহানি হতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০১৭ সালে সিলেট, সুনামগঞ্জসহ ভাটির জনপদের ফসলহানির কথা উল্লেখ করেন।

সুনামগঞ্জ ‘হাওর বাঁচাও’ আন্দোলনের নেতারা এ নিয়ে গত শনিবার সুনামগঞ্জের ট্রাফিক পয়েন্টে বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। তারা ফসল রক্ষার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট কতৃ‌র্পক্ষকে বৃষ্টি নামার আগেই কাজ শেষ করতে আহ্বান জানান। তারা বলেন, ২০১৭ সালের মতো কোনো ধরনের গাফিলতির কারণে হাওরডুবি হলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে পাউবো ও ডিসি অফিস ঘেরাও করা হবে বলে সংগঠনের নেতারা হুঁশিয়ারি প্রদান করেন।

জেলার বৃহৎ ৩৬টি হাওরের ফসল রক্ষায় পিআইসির মাধ্যমে ৫২০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, পুননির্মাণ ও সংস্কারকাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড পাউবো। সুনামগঞ্জ জেলায় হাওর রক্ষা বাঁধ বা ডুবন্ত বেড়িবাঁধের মোট পরিমাণ ১ হাজার ৬৮০ কিলোমিটার। এবার ৭২২টি পিআইসির মাধ্যমে জেলার ১১টি উপজেলায় বাঁধের কাজ শুরু হয়।

জেলার সবচেয়ে বেশি প্রকল্প ধর্মপাশা উপজেলায়। ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মুনতাসির হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, সব সময় বাঁধের কাজে মনিটরিং ছিল। কাজের বিষয়ে ‘সন্তুষ্ট’। কিছু কাজ সামান্য বাকি রয়েছে। এর মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।