আনন্দের দুঃখ

উপজেলার সবচেয়ে নামকরা স্কুল রাজপাড়া আদর্শ বিদ্যাপীঠ। পৌষের হাড়কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে স্কুলটিতে ভর্তি হতে এসেছে তেরো বছরের আনন্দ। পিতৃপ্রদত্ত নাম আনন্দ হলেও এ ছেলের জীবনে যেন কোনো আনন্দই নেই। আনন্দদের বাড়িতে তার বাবা-মা ছাড়াও বৃদ্ধা দাদি আর ছোট দুই বোন রয়েছে। বাবা শহরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সামান্য বেতনে চাকরি করতেন। কাজে অদক্ষতার অজুহাতে তিনি চাকরি হারিয়েছেন আরো চার মাস আগে। এর মধ্যে নতুন কোনো চাকরির বন্দোবস্ত করতে পারেননি। একদিকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির চাকরি নেই অন্যদিকে দফায় দফায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হুহু করে বেড়েই চলেছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে ঢাকার ব্যস্ত সড়কে নিয়মিত লোকাল বাসে চড়া রফিক সাহেব বুঝতে পারলেন এ শহরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খেয়েপরে থাকা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব না। কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাগপত্র গুছিয়ে সপরিবারে গ্রামে চলে এলেন। শহরে যেমন একটা চাকরি খুঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছিলেন, গ্রামেও অবস্থাটা প্রায় একই।

অর্থকষ্টে জর্জরিত রফিক সাহেব অভাব সত্ত্বেও ছেলের পড়াশোনা থামিয়ে রাখতে চাননি। তাই হয়তো সাত-পাঁচ কিছু না ভেবেই আনন্দকে নিয়ে এসেছেন স্কুলে ভর্তি করাতে। রাজপাড়া আদর্শ বিদ্যাপীঠের হেডমাস্টার নুরুল ইসলাম বিএসসি। আনন্দকে তিনি বাংলা-ইংরেজি থেকে কিছু মৌখিক প্রশ্ন করলেন। আনন্দও সবগুলো প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলো। আনন্দের মায়াভরা মুখ, সৌন্দর্যদীপ্ত চেহারা আর উত্তম বাচনভঙ্গি মুগ্ধ করেছে গণিতের কিংবদন্তি এই শিক্ষককে। রফিক সাহেব সংকোচ নিয়ে পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কথাগুলোও দয়াবান হেডমাস্টারকে জানালেন। সব শুনে হেডমাস্টার সহমর্মিতা প্রকাশ করার পাশাপাশি আনন্দের রেজাল্ট ভালো হলে তাকে বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ করে দেবেন বলেও আশ্বস্ত করেন। আনন্দ যেদিন স্কুলে ভর্তি হয়ে বাড়ি ফিরেছে তার পরদিনই তাদের বাড়িতে আরেকটা সুখবর আসে। উপজেলা শহরের এক ধনী ব্যক্তির গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন রফিক সাহেব। বেতন হয়তো খুব বেশি না। কিন্তু তা দিয়েই তো সংসার চালাতে হবে।

কয়েক মাস পরের কথা। আনন্দ এখন নিয়মিত স্কুলে যায়। বন্ধের দিন পুকুরে সাঁতার কাটে, বিকেলে পাড়ার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলে। কদিন আগেও যে ছেলে ছিল মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, কারো সঙ্গে মিশতে চাইত না, ঠিকমতো কথা বলত না, পাড়ার ছেলেরা ডাকলেও খেলতে যেত না, মুখ লুকিয়ে রাখার মধ্যেই যার ছিল স্বর্গসুখ—সে এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। ছেলেটা এখন স্কুলের সেরা ছাত্রদের একজন। খেলাধুলায়ও এর মধ্যে সে স্কুলের অন্য ছেলেদের ছাড়িয়ে গিয়েছে। আন্তঃস্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ও এখন আনন্দ।

আনন্দের এক বন্ধুর নাম নিবিড়। ছেলেটা সবসময়ই স্কুলে কোনো না কোনো ঘটনা ঘটিয়ে আলোচনাতে থাকবেই। আচমকা একদিন আনন্দকে বলে বসল—‘চল, আজকে তুই আমাদের সঙ্গে দেয়াল টপকে স্কুল পালাবি! সবসময় ক্লাসের ফার্স্ট বয় হলেই হয় না, স্কুল পালানোর অভিজ্ঞতাও তো লাগে।’

আনন্দ অবাক হলো। এর আগে কখনো সে স্কুল পালানোর কথা কল্পনাও করেনি। কিন্তু বন্ধুর প্ররোচনায় ছেলেটা ভীষণ দ্বিধাগ্রস্ত। আনন্দ বলে উঠল, ‘স্কুল পালিয়ে যাব কোথায়? স্কুল ছুটি হতে তো অনেক দেরি। আর এত আগে বাড়িতে চলে গেলে মা জিজ্ঞেস করলে তখন কী বলব?’

এ প্রশ্নের জবাবে নিবিড় ভর্ৎসনার সুরে বলল, ‘তা নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না।’

আনন্দ এরকম উত্তরে শতভাগ আশ্বস্ত হতে না পারলেও দেয়াল টপকে স্কুল পালানোর ঝুঁকিটা সেদিনকার মতো মেনে নিতে রাজি হয়ে গেল। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে গেল স্কুলের পেছনের দিকটায়। অনভিজ্ঞ হওয়াতে দেয়াল টপকাতে একটু ব্যথাও পেল। তারপর কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে স্কুলের সীমানা পার হয়ে গেছে আনন্দ। নিবিড়ের নেতৃত্বে বন্ধুরা মিলে তাদের গন্তব্যস্থল নির্ধারণ করে নিল। স্কুল থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে বাডিডা। সে গ্রামেই যাবে তারা। লিখন আরো একবার আনন্দকে তাচ্ছিল্য করে বলল ‘সেখানে গিয়ে ঘুরে আসতে আসতে স্কুল ছুটির সময় হয়ে যাবে আর তখন বাড়িতে ফিরলে কেউ আর সন্দেহ করবে না। বুঝেছিস হাঁদারাম?’ আনন্দ আর কিছু বলল না।

সাইকেলগুলো চলতে শুরু করল। সাইকেলগুলো যখন দক্ষিণবাগের অরণ্যের দিকটায় পৌঁছে গিয়েছে আনন্দের মনে তখন ভয় বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। তাকে স্কুল পালাতে বাধ্য করা বন্ধুদের আচরণ তার কাছে ঠিক লাগছিল না। নিবিড় তখন পকেট থেকে সিগারেট বের করে সবাইকে বিলি করছে। আনন্দকেও নিতে বলল। আনন্দ সেদিকে কর্ণপাত না করেই সাইকেল চালাচ্ছে। আনন্দ বুঝতে পারল, সে ভুল করে ফেলেছে। কাউকে না হোক অন্ততপক্ষে তার প্রিয় বন্ধু হাসিবকে তো বলে আসতে পারত! আনন্দ যখন রাজপাড়া আদর্শ বিদ্যাপীঠে একেবারে নতুন, তখন থেকেই হাসিব ছেলেটাই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। হাসিবের যেমন কোনো গোপন কথা আনন্দের কাছে গোপন থাকে না, তেমনই আনন্দের কোনো গোপন কথাও হাসিবের কাছে গোপন থাকে না। কিন্তু স্কুল পালানোর সিদ্ধান্তটা নিতে সে একবারও হাসিবের সঙ্গে আলোচনা করেনি। হাসিব সঙ্গে থাকলে হয়তো নিবিড়রা আনন্দের সঙ্গে এমন ব্যবহারের দুঃসাহস কখনোই দেখাত না।

বর্ষার মেঘমুক্ত দুপুর। রাস্তার দুপাশে গভীর অরণ্য। মাঝে মাঝে হয়তো দু-একটি বসতবাড়ি দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু সেটিও সংখ্যায় খুব বেশি নয়। বাডিডা যাওয়ার আগে ঐদিকটায় জনবসতি যেমন কম যানবাহন যেন সে তুলনায় আরো কম। গত আধা ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে আনন্দ যতগুলো গাড়ি দেখেছে তার সংখ্যা পাঁচের বেশি হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। আচমকা একটা গাড়ি আনন্দের সাইকেলের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াল। আনন্দ যেন গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা লোকটাকে দেখে বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেল। আর এদিকে নিবিড় অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে লোকটাকে তেড়ে মারতে যেতে উদ্যত হলো বলে। কিন্তু রফিক সাহেব আর আনন্দ একে অপরের দিক থেকে চোখ সরাতে পারল না।