মহাবিজয়ের উপাখ্যান

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। উল্লিখিত বৈষম্য অবসানের নিমিত্তে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত আরটিসি সম্মেলনে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। এতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। ফলে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়।

ছয় দফার মধ্যেই স্বাধীনতার মূল বীজ বপন করা হয়। ছয় দফা দাবির সমর্থনে, গণগ্রেফতারের প্রতিবাদে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে সমগ্র দেশ উত্তাল হয়ে উঠে। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে সার্জেন্ট জহুরুল হক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুজ্জোহা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের ফলে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিআগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয়। জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাসহ ৩৪ জন রাজবন্দিকে সম্মানের সঙ্গে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করেন ও পদত্যাগে বাধ্য হন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। ছয় দফা আন্দোলনই স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল টার্নিং পয়েন্ট বলে বিবেচিত হয়।

পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পাকিস্তান আওয়ামী লীগ মোট ১৬৭ আসন লাভ করে। পক্ষান্তরে পাকিস্তান পিপলস পার্টি মোট ৮৮ আসন পায়। পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের পার্লামেন্টারি পার্টির লিডার ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ডেপুটি লিডার নির্বাচিত করা হয়। ১৭ ডিসেম্বর, পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন পায়। প্রাদেশিক পার্লামেন্টারি বোর্ডের সভায় এম মনসুর আলীকে পূর্ব পাকিস্তান পার্লামেন্টারি পার্টির লিডার নির্বাচিত করা হয়। ’৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমান ভাবী প্রধানমন্ত্রী এবং এম মনসুর আলী পূর্ব পাকিস্তানের ভাবী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বিবেচিত হতে থাকেন।

১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জুলফিকার আলি ভুট্টো তার লারকানা হাউজে পাখি শিকারের নামে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, চিফ অব আর্মি স্টাফ লে. জেনারেল আব্দুল হামিদ খান, জেনারেল পিরজাদা ও জেনারেল ওমরকে আমন্ত্রণ জানান হয়। উক্ত বৈঠকেই ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর মূল পরিকল্পনা নির্ধারিত হয় (সূত্র: ম্যাসাকার, লেখক: রবার্ট পেইন)।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান রেডিওতে দুপুর ১:১৫ মিনিটে ৩ মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। ঢাকা স্টেডিয়ামে চলমানরত পাকিস্তান ও এমসিসি ক্রিকেট খেলা অকস্মাত্ বন্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার দর্শক, ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ৩ মার্চ পল্টনের মহাসমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। উক্ত সভায় বঙ্গবন্ধু অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বান জানান। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ পড়ন্ত বিকাল, তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দান বিশাল জনসমুদ্রে স্বাধীনতাসংগ্রামের মহানায়ক ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।

১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা মূলত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পরিচালিত হতে থাকে। ঐতিহাসিক ভাষণের পর ঢাকাসহ সমগ্র দেশ জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে রূপান্তরিত হয়। আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন নিউজ উইক ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল সংখ্যার প্রচ্ছদ স্টোরিতে বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ বলে অভিহিত করা হয়। ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাসভবন ও প্রধান বিচারপতির বাসভবনসহ দেশের প্রতিটি সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

ঢাকায় পাকিস্তান পার্লামেন্টারি পার্টির লিডার ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সমঝোতা নাটক ব্যর্থ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। ‘ঐ কালরাত্রিতে পূর্ব পাকিস্তান সামরিক প্রশাসক ও কোর কমান্ডার লে. জেনারেল টিক্কা খানের নির্দেশে জেনারেল রাওফরমান আলির নেতৃত্বে ঢাকায় এবং জেনারেল খাদিম হোসেন রাজার নেতৃত্বে বাকি ১০টি গুরুত্বপূর্ণ শহরে অপারেশনের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ঢাকার অপারেশনে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন ব্রিগেডিয়ার আরবাব। সামরিক অভিযানের কোড নেম ছিল ‘অপারেশন সার্চ লাইট’। রাত সাড়ে ১১টা থেকে ওয়্যারলেসগুলো সচল হয়ে উঠল। নির্ধারিত সময়ের আগেই খুলে গেল দোজখের দরজা। ঢাকার পিলখানা, ইপিআর হেডকোয়ার্টার, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক কোয়ার্টার, জগন্নাথ হল, তদানীন্তন ইকবাল হল—প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়’। (সূত্র: উইটনেস অব স্যারেন্ডার, লেখক: ব্রিগেডিয়ার সালেক সিদ্দিক)।

হাজার হাজার নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালি ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, জনতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। যা ছিল বিশ্বের ইতিহাসে বর্বরোচিত গণহত্যা। ’৭১-এর ২৬ মার্চ ০০:২০ মিনিট (প্রথম প্রহর) পাকিস্তান পার্লামেন্টের মেজরিটি পার্টির লিডার আওয়ামী লীগের প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ‘ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছ, যাহার যাহা কিছু আছে, তাহাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও (অনূদিত)’—শেখ মুজিবুর রহমান। অতঃপর রাত ১:৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর তার নিজ বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। (সূত্র: উইটনেস অব স্যারেন্ডার, লেখক: ব্রিগেডিয়ার সালেক সিদ্দিক, যুদ্ধকালীন সময়ের আইএসপিআর এর পাবলিক রিলেশনস অফিসার)।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার বার্তাটি তাৎক্ষণিকভাবে মগবাজার ওয়্যারলেস স্টেশনে পাঠানো হয়। উক্ত বার্তাটি ওয়্যারলেসের ডিএইচএফ চ্যানেলে মগবাজার থেকে ভোরে চট্টগ্রামের সলিমপুর ওয়্যারলেস স্টেশনে পাঠানো হয়। স্বাধীনতার উক্ত বার্তাটি চট্টগ্রামের বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাতিসংঘের জাহাজ এমভি মিনি-লা-ট্রিয়া, গ্রিক জাহাজ এমভি সালভিস্তা ও ভারতীয় জাহাজ এমভি গিরির ভিএইচএফ চ্যানেলের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে প্রচারিত হয়। ১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারকৃত অবস্থায় ঢাকা থেকে লয়ালপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়। লয়ালপুর মার্শাল ‘ল’ কোর্টে মুজিবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে ১ ডিসেম্বর লয়ালপুর জেল থেকে মিয়ানওয়ালি জেলে স্থানান্তর করা হয়। প্রখ্যাত সাংবাদিক সায়মন ড্রিংকসই প্রথম ২৫শে মার্চের পরিকল্পিত গণহত্যার খবরটি ওয়াশিংটন পোস্টের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বকে অবহিত করেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক ম্যাসকারেনহাস ঢাকাসহ সমগ্র দেশের বর্বরোচিত গণহত্যার চিত্র ১৫ জুন ‘সানডে টাইমস’-এ প্রকাশ করেন, যা সমগ্র বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয় এবং বিশ্ববাসীকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ করে তোলে।

তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কেন্ট ব্লাড, ২৭ মার্চ ইউ এস স্টেট ডিপার্টমেন্টে একটি টেলিগ্রাম পাঠান, যার শিরোনাম ছিল ‘সিলেক্টিভ জেনোসাইড’। ৬ এপ্রিল দ্বিতীয় টেলিগ্রাম পাঠান হয়, তার শিরোনাম ছিল ‘ব্লাড’। এতে বলা হয়, ২৫ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত যে নৃশংস গণহত্যা চালান হয়, যেখানে মানবতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়। যা প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও কিসিঞ্জার শাসিত মার্কিন সরকার বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের বিশেষ অধিবেশনে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা হয়। এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ শপথ গ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল আমির আবদুল্লাহ নিয়াজির নেতৃত্বে পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সৈন্য অস্ত্রশস্ত্রসহ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা ও বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর উপপ্রধান এ কে খন্দকারের উপস্থিতিতে বিকাল ৪:৩১ মিনিটে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। উক্ত দলিলে জেনারেল অরোরা প্রতিস্বাক্ষর করেন।

৭১-এর ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের আকাশে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর, ৩০ লাখ শহিদের রক্তে রঞ্জিত সেই স্বাধীনতার সূর্যটি ১৬ই ডিসেম্বর রাহুমুক্ত হয় এবং বিশ্বের মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

লেখক: প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় চার নেতা পরিষদ।