পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নির্মম গণহত্যা দ্বিতীয়টি ঘটেছে কি না তা প্রশ্নসাপেক্ষ। জালিওনাবাগের হত্যাকাণ্ড যেমন ইতিহাসের পাতা থেকে বারবার উদাহরণ হয়ে উঠে তেমনি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ বাংলাদেশের গণহত্যা নির্মম ঐতিহাসিক ঘটনায় আবদ্ধ। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্ববহ এই ঘটনাটির সঠিক তথ্য ও পূর্বাপর ইতিহাস পরিষ্কারভাবে বিবৃত করা এখন সময়ের দাবি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মননে ভয়াবহ সেই হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঐতিহাসিক গুরুত্বে স্থান করে দিতে হবে। কেননা স্বাধীনতা যুদ্ধের পর স্বাধীন সার্বভৌম এই বাংলাদেশের ৫০ বছর হয়ে গেলেও মধ্যখানে দীর্ঘসময় ইতিহাস বিকৃতির কয়েকটি অধ্যায় রয়েছে।
যে সময় স্বাধীনতা বিরোধীশক্তি সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে স্বাধীনতার মূল চেতনার উৎস বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল। উল্লিখিত তিনটি অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকলকে হত্যার মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে তাৎক্ষণিক ও দ্রুত; যা করেছিল পূর্বপরিকল্পিতভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে ধ্বংসের লক্ষ্য। যেমন বাংলাদেশী জাতীয়বাদের প্রচার, বাংলাদেশ বেতারকে রেডিও বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ স্লোগানের প্রচলন জয়বাংলা স্লোগানের পরিবর্তে, পাঠ্যপুস্তকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা-মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা মুছে ফেলা ইত্যাদি আরো অনেক বিষয়। ঠিক তেমনিভাবে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ ধর্মনিরপেক্ষতা এর ওপর আঘাত। যেমন সংবিধান-এ নতুন সংযোজন। আদর্শগত পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র ও নানা বিষয়। এছাড়া সংবিধানের আরেক স্তম্ভ গণতন্ত্রকে নির্বাসনে দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানকে মূল চেতনা থেকে সরিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টাগুলো জলন্ত উদাহরণ।
সঙ্গত কারণেই ৭১-এর ২৫শে মার্চ গণহত্যা ও তার স্বীকৃতি ঐতিহাসিক গুরুত্বে সুবর্ণজয়ন্তীর এই বাংলাদেশে অতীব প্রাসঙ্গিক। স্বাধীনতা পরবর্তী প্রজন্ম এবং নবপ্রজন্মের কাছে ইতিহাসে স্থান পাওয়া ঘটনাপ্রবাহ যথাযথভাবে তুলে ধরার মধ্যদিয়ে তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথের নির্দেশনা দেওয়া গুরুত্ববহ। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সঠিক ইতিহাস ও যথাযথ ঘটনা প্রবাহের ইতিবাচক প্রভাব তরুণ প্রজন্মের মন-মনন গঠনে অতীব প্রয়োজনীয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু এই তিনটি বিষয় একে অন্যের পরিপূরক এবং অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্বাপর প্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে যুক্ত করে আজকের বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাস রচিত হতে হবে। না হলে তা হবে আংশিক, অসম্পূর্ণ এবং খণ্ডিত ইতিহাস। এটা অবধারিত যে, ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চ গণহত্যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নির্মম অধ্যায়। সুতরাং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিপূর্ণ ইতিহাসে গণহত্যার এই নির্মম ইতিহাস যথাযথভাবে বিবৃত হওয়া অত্যাবশ্যক। দেশের প্রজন্মের পর প্রজন্ম গড়ে উঠবে সঠিক পরিপূর্ণ এবং যথাযথ ইতিহাস জেনে এবং মননে ধারণ করে। যদি সেটা না হয়ে ভুল তথ্যে এবং খণ্ডিত অংশে গড়ে উঠে তাদের মনন তাহলে সঙ্গতকারণেই দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশ ও জাতির তথা আপামর মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে দেশ ও জাতির উন্নয়ন অগ্রগতির আলোকে বর্তমান সময়ে দৃশ্যমান যে অবস্থা তা আরও গতিশীল ও অগ্রগামী করতে প্রয়োজন দেশপ্রেমী জনগণের ঐকান্তিক অবদান। আর এই অবদান নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন তরুণ প্রজন্ম তথা শ্রমশক্তি সম্পন্ন আপামর জনগণের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা; যা নির্ভর করে বিশেষ কয়েকটি শর্তের ওপর। এই শর্ত পরিপূরণে জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। মূলত উদ্বুদ্ধ করতে হবে আত্মনিয়োগের, ঐক্যবদ্ধতার, সর্বোপরি আত্মত্যাগের মহিমায় জাগ্রত করার।
প্রকৃত অর্থে নব প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে। আর এজন্যই প্রয়োজন এই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব, মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং বর্তমান চলমান বিষয় নিয়ে এই তিনটি অধ্যায়ের প্রতিটি ঘটনা প্রবাহের বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণমূলক উপস্থাপনার যথাযথভাবে প্রকাশ ঘটানো। যার মধ্যদিয়ে ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং স্বীকৃতি যৌক্তিকভাবে পৌঁছে যাবে তরুণ প্রজন্মের মননে। স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের আন্দোলন সংগ্রামের ঘটনা প্রবাহ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, সর্বোপরি গণজাগরণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তেমনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগসহ নির্মম ঘটনা প্রবাহ-এর যথাযথ বিবরণ ঐতিহাসিক মূল্যে প্রয়োজনীয়। আবার বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের দৃশ্যমান অগ্রগতি সেটা অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত, শিক্ষা ও উৎপাদন এবং সামগ্রিক সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আশার আলো দৃশ্যমান। আর এই সব কিছুই চেতনা এবং প্রেরণার উৎস হিসাবে প্রভাবদায়ী। যে প্রভাব তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করবে দেশপ্রেমে, যা থেকে তারা পাবে অনুসরণীয় এবং অনুকরণীয় নির্দেশনা।
অতএব ইতোমধ্যে উল্লিখিত স্বাধীনতা পরবর্তী বঙ্গবন্ধু কতৃর্ক নির্দেশিত সংবিধানের চার স্তম্ভের তিনটি—বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এবং স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বাধীনতাপূর্ব আন্দোলন সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন আত্মত্যাগসহ নির্মম ঘটনাবলী, আর বর্তমান দৃশ্যমান এবং স্বীকৃত উন্নয়ন অগ্রগতির বিস্তৃত বিশ্লেষণ ও তথ্যের উপস্থাপনাকে সমন্বয় করে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় দেশকে এগিয়ে নিতে হলে ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ গণহত্যার ঘটনা প্রবাহকে গুরুত্বের সঙ্গে সংযুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রবাহ তথা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। যে দায়িত্ব পালনে প্রতিষ্ঠানিক ভূমিকা অতীব জরুরী। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে শিক্ষা পাঠ্যক্রম, সংগঠনকেন্দ্রিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক উদ্যোগের মধ্যে লক্ষ্য থাকবে ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলোর যথাযথ সঞ্চালন। সেই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি, ব্যক্তি উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে ইতিপূর্বে উল্লিখিত প্রতিটি অধ্যায়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং পূর্ণাঙ্গ তথ্য ব্যবহার ও সংযুক্তি অত্যাবশ্যক। আর এর মধ্যদিয়েই তরুণ প্রজন্ম তথা আপামর জনগণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মহান মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক নেতৃত্বের ভূমিকা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত হবে।
লেখক: উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।