দুবাইয়ে আত্মগোপন করা ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম জিসান আহমেদ মন্টি ওরফে জিসানের নির্দেশে মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপুকে খুন করা হয়। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিক ওরফে ফ্রিডম মানিকেরও যোগসাজশ রয়েছে। ফ্রিডম মানিক বর্তমানে ভারতে আত্মগোপন করে আছেন।
মূলত মতিঝিল এলাকার টেন্ডারবাজি, মার্কেট নিয়ন্ত্রণ ও বাড়ি নির্মাণের চাঁদাবাজির পুরোটাই একক নিয়ন্ত্রণ করতেন টিপু। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, যুবলীগ নেতা খালেদ ও ঠিকাদার জি কে শামীম গ্রেফতার হওয়ার পর একক নিয়ন্ত্রণ চলে আসে টিপুর হাতে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, রেলওয়ে, কমলাপুর আইসিডি ডিপো, বিদ্যুৎ ভবন ও গণপূর্তের টেন্ডারবাজির একটি কমিশন বিদেশে আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও ফ্রিডম মানিককে দিতে হতো। গত তিন বছর ধরে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে এসব টেন্ডারবাজির কোনো কমিশন দেওয়া হয়নি। এর জের ধরে টিপুর প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হয়। ঐ শক্তিশালী গ্রুপটিকে দিয়ে জিসান ও ফ্রিডম মানিকের টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয় টিপু।
টিপু হত্যার ঘটনায় শুক্রবার তার স্ত্রী ফারজানা ইসলাম ডলি শাহজাহানপুর থানায় হত্যা মামলা করেছেন। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ‘চার-পাঁচ দিন আগে অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারী মোবাইল ফোনে টিপুকে হত্যার হুমকি দেয়। আমার স্বামী মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন। তার মতিঝিল কাঁচাবাজার এলাকায় একটি রেস্টুরেন্ট আছে। ১০ বছর ধরে বৃহত্তর মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন দলীয় কোন্দল ছিল।’
২০১৩ সালের ২৯ জুলাই রাতে গুলশান-১ নম্বরে সপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনে ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিলকীকে (৪৩) সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করে। ঐ ঘটনায় মিলকীর ছোট ভাই মেজর রাশেদুল হক খান মিলকীর দায়ের করা মামলায় জাহিদুল ইসলাম টিপু আসামি ছিলেন। র্যাবের হাতে টিপু গ্রেফতার হয়ে কয়েক মাস জেলেও ছিলেন। পরবর্তী সময়ে র্যাবের দেওয়া চার্জশিটে টিপুর নাম বাদ দেওয়া হয়। মিলকী হত্যার পর টিপুর সঙ্গে যুবলীগের খালেদের প্রকাশ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ২০১৬ সালে মতিঝিল এলাকায় যুবলীগ নেতা রিজভী হাসান বাবু ওরফে বোচা বাবু খুন হয়। বোচা বাবুর বাবা টিপুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বোচা বাবু হত্যা মামলায় ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক, মিলকী হত্যা মামলার আসামি সুমনসহ ১০-১২ জন সবাই যুবলীগের নেতাকর্মী। এই মামলায় ওমর ফারুকসহ সবাই চার্জশিটভুক্ত আসামি। সম্প্রতি একজন মন্ত্রীকে দিয়ে ওমর ফারুক ঐ মামলা থেকে তার নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করান। কিন্তু বাদ সাধেন টিপু। বিষয়টি নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান-ফ্রিডম মানিক-মোল্লা মাসুদ-ইখতিয়ার গ্রুপের কাছে যায়। এই শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপের পক্ষ থেকে টিপুর সঙ্গে একাধিকবার কথোপকথন হয়। টিপুকে অনুরোধ করা হয় যে প্রয়োজনে মামলাটি তুলে নেওয়ার জন্য বোচা বাবুর বাবাকে নির্দেশ দেন। টিপু সেই অনুরোধ রাখেননি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ২০১৩ সালে মতিঝিল এজিবি কলোনির একটি সংযোগ সড়কের দুই পাশে অবৈধভাবে নির্মাণ করা টিনশেড মার্কেটটি সিটি করপোরেশন ভেঙে দেয়। মার্কেটটি সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মির্জা খোকন দেখভাল করতেন। ২০১৯ সালের পর টিপু সেখানে মার্কেট স্থাপন করে প্রায় ১০০ দোকান ভাড়া দেন। ঐ মার্কেটে টিপুর একটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার গাড়িচালক মনির হোসেন মুন্না মাইক্রোবাস নিয়ে রেস্টুরেন্টের উদ্দেশে রওনা হন। মতিঝিল এজিবি কলোনিতে গ্রান্ড সুলতান নামে রেস্টুরেন্টে কাজ শেষে বাসায় যাওয়ার পথে রাত সোয়া ১০টার দিকে মানামা ভবনস্থ বাটার দোকানের সামনে মাইক্রোবাসটি থামে। এ সময় রাস্তার বিপরীত পাশে মোটরসাইকেলে দুই জন অপেক্ষা করছিল। হেলমেট পরিহিত এক মোটরসাইকেল আরোহী থেমে থাকা মাইক্রোবাসের বামপাশে গিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। গুলিতে গাড়ির গ্লাস ভেঙে যায়।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ সূত্র জানায়, নিহত টিপুর গলার ডান পাশে, বুকের বাম পাশে, নাভির নিচে, বাম কাঁধের ওপরে, পিঠের বাম পাশের মাঝামাঝি, পিঠের বাম পাশের কোমর বরাবর ও পিঠের ডান পাশের কোমরের ওপরসহ একাধিক স্থানে গুলির চিহ্ন রয়েছে। ময়নাতদন্তকালে তার শরীরে সাতটি গুলির অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
ওদিকে এলোপাতাড়ি গুলিতে আহত হন গাড়ির পাশে রিকশায় থাকা কলেজছাত্রী প্রীতি। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী তার শরীরে একটি গুলি ঢুকে অপরদিক দিয়ে বের হয়ে গেছে। এতে তিনি নিহত হন।
রাজধানীর কাওরান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, বেশকিছু মোটিভ পাওয়া গেছে। সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। র্যাব ছাড়াও অন্যান্য বাহিনী কাজ করছে।
পুলিশের মতিঝিলি বিভাগের উপ-কমিশনার এমএ আহাদ গতকাল এই প্রতিবেদকের কাছে বলেন, নিহত টিপুর স্ত্রী ফারজানা ইসলাম ডলি যে অভিযোগ করেছেন—তা পুলিশকে জানানো হয়নি। এমনকি তার স্বামীকে হত্যার হুমকির বিষয়ে থানায় পর্যন্ত কোনো জিডি করেননি। তারপরও আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি। যে মোবাইল ফোন নম্বর থেকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল- সেটি বন্ধ আছে। আমরা যাচাই-বাছাই করছি।
গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাদ আসর এজিবি কলোনি মসজিদে টিপুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে লাশ দাফনের জন্য ফেনীতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।