পড়ে থাকা মরা খালগুলো সচল হোক

খাল-বিল, নদী-নালার দেশ বাংলাদেশ—এরকম একটা পরিচিতির মধ্যে ছিল যার অবস্থান। একসময় এর খাল-বিল, নদী-নালা ছিল জলে টইটম্বুর। দৃশ্যমান ছিল সময়ের ঋতুচক্র। এই পরিচিতিটা ক্রমশ ম্লান হচ্ছে তার। স্বাভাবিকতার সুন্দর নিদর্শন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আবহাওয়ার পরিবর্তনই এর মূল কারণ। ৫০ বছর আগেও বাংলাদেশ এরকম অবস্থানে ছিল না। এক সুন্দর আবহের মধ্যে ছিল এর প্রাকৃতিক অবস্থা। দেশটি সম্পর্কে কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সুললিত উচ্চারণ ছিল এরকম—

“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,

সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি।”

আজ কবির মন স্বর্গধামেও শান্িত ও স্বস্তিতে নেই। ‘সকল দেশের সেরা’ জন্মভূমিটির বেহালদশায় কবি হতাশ। তার বৈচিত্র্যময় স্বাভাবিক আবহ যেন হারিয়ে গেছে। দেশটির জলচর প্রাণিগুলোও অনাহারক্লিষ্ট। তার খাল-বিল, নদী-নালা প্রায়ই জলশূন্য। বন্যপ্রাণির যে অভয়ারণ্য ছিল, তা-ও আজ নেই। জীবজন্তু বিলীনের পথে। দেশের আনাচেকানাচে হাজার হাজার খাল-সোঁতা মরে পড়ে আছে। কোনো প্রবাহ নেই। বসতভিটা ও আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে কোনো কোনো খাল। কিছু নষ্ট মানুষের নষ্ট চিন্তায় তা হয়েছে। জোর যার মুল্লক তার—এ রকম কিছু মানুষের করতলগত হয়েছে খালগুলো। শস্যাদি ফলনের ধরনও পালটে গেছে। বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিই বর্তমানে চাষবাসের মূল উপাদান। ঘরে ঘরে ডিপ টিউবওয়েল। শস্য ফলানোর সেচই একমাত্র ভরসা। ভূগর্ভস্থ পানিতে সয়লাব খেতখোলা। অর্থাত্, দেশব্যাপী কোটি কোটি ডিপ টিউবওয়েল পানি সরবরাহের কাজে সংযুক্ত। প্রযুক্তির বদৌলতেই এই সুবিধা। শস্যাদির কমতি নেই। দেশভর্তি মানুষ আর মানুষ। কেউ না খেয়ে নেই। কমবেশি সবাই খেয়েপরে আছে।

মুখ্য বিষয়: পানি যেভাবে ব্যবহূত হচ্ছে, তা কি আদৌ ঠিক? এই নিয়ে কথা বলা দরকার মনে করছি। প্রযুক্তি আমাদের উন্নয়নের সোপান তৈরি করে দিয়েছে। কিন্তু তা কল্যাণের আবহের মধ্যে আছে কি না, সেটা ভেবে দেখা জরুরি। কার্বন নিঃসারণের যন্ত্রগুলো আমাদের সাময়িক সুবিধা দিচ্ছে, আনন্দ দিচ্ছে। কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখলেই আঁতকে উঠতে হয়—এটা আমাদের ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে কি না। কিছুসংখ্যক বিলাসপ্রবণ মানুষের একটুখানি আরামের জন্য আবহাওয়া পরিবর্তনের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। সার্বিক কল্যাণের জন্য এটা না করলেও পারে। এই কিছুসংখ্যক মানুষই আজ গোটা বিশ্বকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ব আর বাসযোগ্য থাকছে না। কস্মিনকালেও পৃথিবী ছেড়ে যাবে না—এমনটাই ভাবে ওরা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মঙ্গলের চিন্তা ওদের মাথায় নেই।

স্বাভাবিকতা-অস্বাভাবিকতা শব্দ দুটি সুন্দর আর অসুন্দরে জড়ানো। স্বাভাবিকতা সুস্থতার লক্ষণ। সর্বক্ষেত্রে কল্যাণের আবহে তা সর্বজনগ্রাহ্য। এই যে কোটি কোটি ডিপ টিউবওয়েল ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কাজে ব্যবহূত হচ্ছে, তা কি স্বাভাবিক পর্যায়ের কাজের মধ্যে পড়ে? একদমই না। এটা নিঃসন্দেহে অস্বাভাবিকতা ও অকল্যাণকর। এতে দেশের পঙ্গুত্ব ধারণ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। এটাই অনিবার্য সত্য। ভূগর্ভস্থ পানি প্রকৃতির সুস্থতার প্রতীক। প্রকৃতিতে ‘পানিচক্র’ বলে একটা ধরাবাঁধা নিয়ম আছে। ঋতুচক্রও এই নিয়মে বাঁধা। এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে অস্বাভাবিকতা প্রকৃতিকে বিনষ্ট করে দেয়। এর অকল্যাণকর প্রভাব সমস্ত জীবজগতের ওপর পড়ে। তাই পানির যথেচ্ছ ব্যবহার অস্বাভাবিকতার পর্যায়ভুক্ত। এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে নৈসর্গিক আবহ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। এতে জীবন ধারণের পানি দুর্লভ হয়ে উঠবে। দুষ্প্রাপ্য হবে শস্য ফলানোর পানিও। সৃষ্টি হবে মহাসংকট। প্রকৃতির ধ্বংস মানে সর্বব্যাপী ধ্বংস। উন্নয়ন হবে বাধাগ্রস্ত। উন্নয়নের রসালো গল্পটা একসময় থেমে যাবে। মুখ থুবড়ে পড়বে উন্নয়ন। অস্বাভাবিক আনন্দোল্লাস স্বাভাবিকতাকে ধ্বংস করে। সঠিক সিদ্ধান্ত মাথায় থাকে না। অনুশোচনায় পড়তে হয়। কাজ কিছুই হয় না। জ্ঞানসমৃদ্ধ সিদ্ধান্তই স্বাভাবিকতায় উজ্জ্বল এবং তা-ই গুরুত্বপূর্ণ।

দেশমাতৃকার মঙ্গলের চিন্তা থেকেই আমার এত কথার অবতারণা। আমি মনে করি, জগত্জীবনের মঙ্গল চিন্তায় মানুষ এগিয়ে আসুক। আমার এই চিন্তার যদি গ্রহণযোগ্যতা থাকে, তাহলে অবিলম্বে ‘পড়ে থাকা মরা খালগুলি সচল করে দাও; পড়ে আছে যে খাল এবং জলাশয়, তার সংস্কার করো।’

দেশে অজস্র সংখ্যায় মরা খাল পড়ে আছে। নতুন করে খনন নয়, শুধু সংস্কার। যেখানে যেখানে স্লুইসগেট দরকার, তা করেই, বৃষ্টি র পানি এবং দূরবর্তী নদী থেকে পানি এনে খাল ভরে রাখা হবে বড় কাজ। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যেন স্বাভাবিকতার পর্যায়েই থাকে। যাতে পানির স্তর অধিক নিচে চলে না যায়। খাওয়ার পানি উত্তোলনে যেন কোনো অসুবিধা না হয়। দ্রুত সংস্কার তাই সময়ের দাবি। খাল আর জলাশয়ভরা পানি দিয়েই মনের সুখে কাজগুলো করা যাবে। কোটি কোটি ডিপ টিউবওয়েলের আর দরকার হবে না। এসব খাল হবে মাছ চাষেরও উপযুক্ত স্থান। সেচের পানিরও অভাব হবে না। ভূগর্ভস্থ পানিও যথেচ্ছভাবে নষ্ট হবে না আর। বিপুল মাছ চাষে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। বিশ্বে তার স্থান হবে এক নম্বরে। সুজলা-সুফলায় উজ্জ্বল হবে বাংলাদেশ। খালের দুই পাশে ফলদ বৃক্ষরোপণসহ খালে মাছ চাষ এবং দুই পাশের ক্ষেতখোলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ সেচের ব্যবস্থা স্বচ্ছন্দেই করা যাবে। খালগুলো সুখ আর আনন্দের জায়গা হয়ে উঠবে। বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যবিমোচন হবে এই খালের মাধ্যমে। গ্রামের মানুষের নিরানন্দময় দুঃখ আর থাকবে না। খালের বুক জুড়ে বইবে বাতাসের হিল্লোল। তার মধুর পরশে আনন্দ-অবগাহন মানুষের। পরিবেশবান্ধব হবে খালের কর্মপরিধি। দৃষ্টিনন্দন নৈসর্গিক পরিবেশে অর্থনৈতিক বলয় তৈরি হবে। গড়ে উঠবে উন্নয়নের সোনার বাংলাদেশ।

লেখক: সাংবাদিক