এ বিশ্ব তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। দারুণ একটা গালভরা শব্দ তৈরি হয়েছিল করোনা মহামারি শুরুর পরপর, সেটি হলো— ‘নিউ নরমাল’। এই ‘নিউ নরমাল’ ক্রমশ বিশ্বব্যাপী ‘নিউ অ্যাবনরমাল’ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। অথচ একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে মানুষ এক নতুন রঙিন ফানুসে উড়ে বেড়িয়েছিল। ইন্টারনেট! বিশ্বায়ন! নতুন বাজার! দারিদ্রের অবসান!
কী চমৎকার সব আশার ভেলা! কিন্তু কোথায় কী! উন্নতির যে রেখাগুলোকে আগে সরলরেখা বলে মনে করা হচ্ছিল, আস্তে আস্তে সেগুলো যেন ইউ-টার্ন নিতে লাগল। ২০০১-এর নয়-এগারোতে বিশ্ব তোলপাড় করা টুইন-টাওয়ার হামলার ঘটনা ঘটল। তারপর ২০০৮ সালে এসে আমরা দেখলাম বৈশ্বিক মন্দার অস্হিরতা। সেই সময় মন্দার সঙ্গে যোগ হলো নতুন সব ভূরাজনৈতিক সংকট— ধর্মীয় সংঘাত, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং তার সঙ্গে প্রযুক্তি দুনিয়ার বিপ্লব। সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী সেই সময় আকস্মিকভাবে বাজার থেকে উধাও হয়ে গেল চাকরি। তৈরি হলো অদ্ভুত অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা। বিশ্বের প্রায় সর্বত্র তার সুগভীর ছাপ পড়ল।
মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় শিকার হলো। পরিস্হিতি অল্প অল্প করে ভালো হতে না হতেই ২০২০-এর শুরুতে বিশ্বব্যাপী হানা দিল করোনাভাইরাস। আর করোনার কামড় শেষ হতে না হতেই ইউরোপে শুরু হলো নতুন অস্হিরতা, যুদ্ধ। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ। যুদ্ধ তো কেবল দুটি দেশের মধ্যে নয়। এ যেন সুনামি, শুরু হয়েছে মহাসাগরের তলদেশে, কিন্তু তার বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে উপকূলে। রুশ-ইউক্রেনের সুনামির ঢেউ তেমনি হানা দিচ্ছে বিশ্বের নানান দেশে। স্বৈরাচারী শাসকদের স্বেচ্ছাচারের বলি হচ্ছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ।
স্বেচ্ছাচারী শাসকদের নিয়ে রয়েছে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের উপন্যাস ‘অটাম অব আ পেট্রিয়ার্ক’। রাজনৈতিক স্বৈরাচারের অমরত্ব অর্জনের এক অনবদ্য রূপক এই কাহিনি—যেখানে পরিপক্ব হেমন্েত পৌঁছেও কুলপতির সার্বভৌম কর্তৃত্বের অবসান হয় না। স্বৈরতন্ত্রী সেখানে মরেও মরেন না। তাঁর মৃতু্য-সমাচার দেশময় প্রচারিত হওয়ার পরদিনই বেতারে গমগম করে তাঁর কণ্ঠস্বর। ঘাতকদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেওয়ার অকম্পিত বজ্রঘন কণ্ঠ—যা দেশবাসীকে এই বলে আশ্বস্ত করে যে, রাজা কুশলে আছেন, চক্রান্তকারীরা তাঁর কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি, অতএব দেশবাসীও অনাথ হয়নি। তাই অবশেষে একদিন যখন সত্যি-সত্যিই তাঁর নশ্বর দেহান্ত ঘটে, দেশবাসী সে-খবর বিশ্বাস করতেই চায় না। ভাবে এটাও আগের খবরগুলোর মতোই বিভ্রম সৃষ্টিকারী একটা চাল।
আমরা আরেক ঘটনা স্মরণ করতে পারি যেটা ঘটেছিল অষ্টাদশ দশকের শেষার্ধে। ক্যারিবীয় দ্বীপ হাইতি একদা ফরাসি উপনিবেশবাদীদের নির্যাতন-শিবির ছিল। অষ্টাদশ শতকের শেষাশেষি প্রজাবিদ্রোহ সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের প্রজাতন্ত্র ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শুরু হয়। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ শাসকরাও কালক্রমে তাঁদের স্বজাতীয়ের প্রতি কী ধরনের উত্পীড়ক হয়ে ওঠেন এবং পরিণামে আরো এক দফা বিদ্রোহে তাঁদের উৎখাত হতে হয়, কিউবান ঔপন্যাসিক আলেহো কার্পেন্তিঢয়র তাঁর ‘কিংডম অব দিস ওয়ার্ল্ড’ উপন্যাসে তার মর্মস্পর্শী কাহিনি বর্ণনা করেছেন।
স্বৈরতন্ত্র এভাবেই ঘুরে-ঘুরে আসে। জারের স্বৈরাচার উত্খাত করে স্তালিনের স্বৈরাচার কায়েম হয়, চিয়াং কাই শেক-এর স্বৈরাচার সরিয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির দলীয় একনায়কতন্ত্র। হাইতির স্বৈরাচারী ‘পাপা ডক’ দুভালিয়ের ও তাঁর কুখ্যাত সিক্রেট পুলিশ-রাজের অবসানে তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী ‘বেবি ডক’ দুভালিয়ের নির্মম অত্যাচারে দেশবাসীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলেন। এসবেরই সবিস্তার বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে গ্রাহাম গ্রিন-এর উপন্যাস ‘দ্য কমেডিয়ান্স’-এ।
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসসহ প্রতিটি বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক তাঁদের রূপক ও সত্যাশ্রয়ী কাহিনিতে বোঝাতে চেয়েছেন—স্বৈরাচারেরা কখনো মরেন না, তাঁরা ঘুরেফিরে অবিনশ্বর থাকেন, নব-নব রূপে নিজেকে পুনরুদ্ভাবন করান। প্রকৃতই বিশ্বজুড়ে স্বৈরতন্ত্রের অনিঃশেষ নিরবচ্ছিন্নতার দিনলিপি রচিত হয়ে চলেছে আবহমান কাল ধরে। ইতিহাসে স্বৈরাচারীর মৃতু্য বা অপসারণের দিনক্ষণ নথিভুক্ত থাকলেও জনসাধারণের অভিজ্ঞতায় স্বৈরতন্ত্র একটি অমরত্বের আখ্যান।