জনসংখ্যা-কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে তুরস্কে

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জন্মহার হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যাওয়ার কথা। অধিক সন্তান লালনপালনের প্রশ্নে আর্থিক সংগতির বিষয়টি চলে আসে, সংগত কারণেই চলে আসে। কিন্তু অতীত ইতিহাস আর রেকর্ড ভিন্ন কথা বলে, অর্থনৈতিক অগ্রগতি আর জন্মহারের মধ্যে বিপরীতমুখী সম্পর্ক। উন্নতির পদাঙ্ক অনুসরণ করে শিক্ষাও এগিয়ে যায় বলে স্বাচ্ছন্দ্য ধরে রাখতে গিয়ে মানুষ আকৃষ্ট হয় সন্তানের সংখ্যা যথাসম্ভব কম রাখার ব্যাপারে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি উন্নত রাষ্ট্রই আজ এমন বাস্তবতার মুখোমুখি। কিন্তু সমৃদ্ধ দেশের তকমা না লাগা সত্ত্বেও যে একটি দেশ দ্রুত বার্ধক্যগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে, জলজ্যান্ত নজির হচ্ছে তুরস্ক।

তুরস্কে বুড়িয়ে যাওয়া লোকের সংখ্যা গত পাঁচ বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে ২৪ শতাংশ। বয়স এরই মধ্যে ৬৫ কিংবা ৬৫’র ঊর্ধ্বে পৌঁছে যাওয়া এমন লোকের সংখ্য ২০২১ সালে সেখানে ছিল মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২ শতাংশ। এসব তথ্য প্রকাশ করেছে তুরস্কের পরিসংখ্যান ইন্সটিটিউট (টার্কস্ট্যাট)। ২০২১ সালে এসে তুরস্কে বয়স্ক লোকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮০ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি। অথচ ২০১৬ সালে সেটি ছিল ৬০ লাখ ৬০ হাজার। বার্ধক্যে পৌঁছা মোট জনসংখ্যার বেশির ভাগই অবশ্য নারী। এর কারণটি নতুন কিছু নয়, স্বাভাবিকভাবেই সেখানকার নারীদের গড় আয়ুষ্কাল পুরুষদের চেয়ে বেশি। ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে তরুণ জনসংখ্যাবিশিষ্ট হওয়ার সুবাদে দীর্ঘদিন তুরস্কের গুণকীর্তনের শেষ ছিল না। বলা হতো, কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা তুলনামূলক-ভাবে বেশি হওয়াতে সেখানকার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। কিন্তু চলমান বাস্তবতা পুরাপুরিই ভিন্ন কথা বলছে। পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ দেশের মতো তুরস্কেও বয়স্ক লোকের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকার শঙ্কার মধ্যেই একাধিক প্রাক্কলন জানান দিচ্ছে, আগামী তিন বছরের মধ্যে সেখানে মোট জনসংখ্যায় ১১ শতাংশ হিস্যা থাকবে তাদের। ২০৪০ সালে এসে তা বেড়ে হবে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ!

টার্কস্ট্যাট অতিসম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছে যে, তুরস্কের জনসংখ্যা কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে প্রবীণ লোকদের ১০ শতাংশের সীমা অতিক্রম করে ফেলার মানেটাই হচ্ছে একটি দেশের জনসংখ্যার বার্ধক্য-গ্রস্তের সূচক। এই মুহূর্তে বলতে গেলে সে দরজায় কড়া নাড়ছে তুরস্ক, আর এমন অভিমতই ব্যক্ত করেছে সেদেশের পরিসংখ্যান ইন্সটিটিউট। তবে তারা এটিও বলেছেন, বৈশ্বিক বার্ধক্য প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলের এ দেশটির মোট জনসংখ্যায় এমন এই কাঠামোগত পরিবর্তন।

তুরস্কের জনসংখ্যা কাঠামোর বাঁক পরিবর্তনের পেছনে অনেকগুলো হেতু কাজ করছে, আর সেগুলো হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি, অপেক্ষাকৃত উন্নত জীবনমান, জনকল্যাণের মাত্রা ও গড় আয়ু বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রজনন ও মৃত্যু হারের হ্রাস। টার্কস্ট্যাটের তথ্যানুসারে প্রৌঢ় জনসংখ্যার অনুপাতের বিবেচনায় ১৬৭টি দেশের মধ্যে তুরস্কের অবস্থান ৬৮।

বয়স্ক জনসংখ্যার ভৌগোলিক বিন্যাসে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যাবলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত দশকের বেশির ভাগ সময়েই প্রবীণ লোকের সংখ্যার প্রশ্নে সিনোপ ছিল এক নম্বরে। মধ্যে সেই স্থান হারালেও প্রতিবেশী কাস্তামোনু এবং আর্তিভিন ও জিরেসানকে হারিয়ে ২০ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা নিয়ে সিনোপ তার আগের সেই শীর্ষস্থান পুনর্দখলে নয়। সিনোপ ও কাস্তামোনু আবার তুরস্কের এমন দুই প্রদেশ, যেগুলোত গত কয়েক দশক জুড়েই অভিবাসনের হার অতিউচ্চ। বিশেষত সিনোপ-এ স্থানীয় বসবাসকারীদের অবসর এবং অন্যান্য স্থানে কাজ করা লোকজন অবসরের পর জন্মস্থানে ফেরত আসাটা সেখানকার বয়স্ক লোকের সংখ্যা অতিমাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছে। তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোয় প্রবীণ লোকের সংখ্যা বরাবরই কম। এরমধ্যে সিরনাক প্রদেশের মানুষ সবচেয়ে তরুণ। ওখানে মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ লোক রয়েছে বার্ধক্যগ্রস্তের তালিকায়। এ তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে হাক্কারি ও স্যানহারফা প্রদেশ। পরিসংখ্যান বলছে, অতিরিক্ত জনসংখ্যাবিশিষ্ট প্রদেশের সংখ্যা ২০১৬ সালে মাত্র আটটি থাকলেও এখন ২২-এ পৌঁছেছে।

তুরস্কে প্রতি চারটি খানার মধ্যে অন্তত একটিতে ৬৫ কিংবা এরচেয়ে বেশি বয়সী এক জন লোক রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুসারে, তুরস্কে একাকী বসবাসকারী বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সংখ্যা ১০ লাখ ৫০ হাজারেও বেশি। এরমধ্যে বেশির ভাগই বৃদ্ধা। পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বারদারে একা বসবাস করা বয়স্ক লোকের সংখ্যা অন্য যে কোনো প্রদেশের চেয়ে বেশি। ২০২১ সালে তুরস্কে শতবর্ষী লোকের সংখ্যাটা ছিল ৫ হাজার ৮৫৯। এদের অধিকাংশের ঠিকানা রাজধানী ইস্তানবুলে।